ঢাকা রোববার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬

সাম্প্রতিক প্রসঙ্গ

মধ্যপ্রাচ্যে ক্ষমতার রাজনীতি নতুন রূপ নিতে পারে

মধ্যপ্রাচ্যে ক্ষমতার রাজনীতি নতুন রূপ নিতে পারে
×
×

এম হুমায়ুন কবির

এম হুমায়ুন কবির

প্রকাশ: ১৭ অক্টোবর ২০২৬ | ০৭:২৭ | আপডেট: ১৭ অক্টোবর ২০২৬ | ১১:০৫

| প্রিন্ট সংস্করণ

মধ্যপ্রাচ্য এক অভূতপূর্ব অস্থিরতা ও সংঘাতময় পরিস্থিতির মুখোমুখি। সাম্প্রতিক সময়ে ইয়েমেনে সৌদি হামলার জবাবে সেখানকার হুতি বিদ্রোহীরা সৌদি আরবে উপর্যুপরি ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। এতে শুধু রিয়াদের কিং খালিদ বিমানবন্দরসহ বহু স্থাপনা ধ্বংস হয়নি, অনেক মানুষও হতাহত হয়েছেন–যেখানে একাধিক বাংলাদেশিও আছেন। এই লড়াইকে হঠাৎ তীব্র হয়ে ওঠা কোনো সামরিক সংঘাত মনে হতে পারে কিন্তু ইতিহাসের পাতা ও ভূরাজনীতির সমীকরণ বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায়–এই দ্বন্দ্বে জড়িয়ে রয়েছে বহুমাত্রিক টানাপোড়েন, প্রভাব বিস্তারের লড়াই এবং আঞ্চলিক কর্তৃত্বের নতুন হিসাবনিকাশ।

সৌদি আরব ও ইয়েমেনের মধ্যে সীমান্ত সংঘর্ষ কিংবা ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে সৌদি প্রভাব তৈরির চেষ্টা বহু বছরের পুরোনো। এক দশক ধরে ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, ক্ষমতার বিভাজন এবং সর্বোপরি হুতিদের আত্মপ্রকাশের পেছনে সৌদি আরবের প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপ ও প্রভাব বিস্তারের ভূমিকা স্পষ্ট। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেনের যে সরকার, তা রিয়াদের প্রত্যক্ষ সমর্থনপুষ্ট। অন্যদিকে সেই সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলে ইয়েমেনের ভূখণ্ডে নিজেদের শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে হুতি বিদ্রোহীরা। ফলে সৌদি সমর্থিত সরকারের সঙ্গে হুতিদের এই লড়াই শুধু ইয়েমেনের ভৌগোলিক সীমানায় সীমাবদ্ধ থাকেনি; তা সৌদি আরবের ভূখণ্ডেও ছড়িয়ে পড়েছে। 

অনেকে এই সংঘাতকে শুধু ধর্মীয় বা শিয়া-সুন্নি মেরূকরণের ফল হিসেবে চিত্রিত করতে চান। কিন্তু এর পেছনের আসল চালিকাশক্তি পুরোপুরি ভূরাজনৈতিক ও ক্ষমতার আধিপত্য বিস্তার। ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তির ব্যবহারে হুতিরা নিজেদের সামরিক সক্ষমতা যতগুণ বাড়িয়েছে, তা কেবল সামরিক কৌশলে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি পুরো মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক সমীকরণকে নতুন এক মাত্রায় নিয়ে গেছে।

বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্য মূলত তিনটি সমান্তরাল অথচ পরস্পর সংযুক্ত সংঘাতের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।

প্রথমত, ফিলিস্তিন ও ইসরায়েলের দীর্ঘদিনের ঐতিহাসিক যুদ্ধাবস্থা। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর গাজা ও হামাসের ওপর ইসরায়েলি আগ্রাসনের মধ্য দিয়ে যে নতুন সহিংসতার সূচনা হয়েছিল, তা গাজায় নজিরবিহীন গণহত্যা ও মানবিক বিপর্যয় ডেকে এনেছে। বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক নানা উদ্যোগ সত্ত্বেও সেখানে স্থায়ী শান্তির সম্ভাবনা এখনও সুদূরপরাহত।

দ্বিতীয়ত, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল এবং ইরানের মধ্যকার বহুপক্ষীয় সংঘাত। ১৯৭৯ সালের ইরানি ইসলামি বিপ্লবের পর থেকে ওয়াশিংটন, তেল আবিব এবং রিয়াদ যৌথভাবে তেহরানকে আঞ্চলিক হুমকি হিসেবে দেখে এসেছে। গত কয়েক দশকে ইরানকে দমন ও কাবু করতে যুক্তরাষ্ট্র একের পর এক অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, কূটনৈতিক অবরুদ্ধকরণ ও সর্বোচ্চ সামরিক চাপ প্রয়োগ করেছে। তা সত্ত্বেও ইরানি শাসকগোষ্ঠী ও তাদের আঞ্চলিক প্রভাবকে পুরোপুরি গুঁড়িয়ে দেওয়া সম্ভব হয়নি।

তৃতীয়ত, সৌদি আরব ও ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের সংঘাত। আপাতদৃষ্টিতে এই তিনটি সংঘাতকে আলাদা মনে হলেও প্রকৃত অর্থে প্রতিটি সূত্রই একে অন্যের সঙ্গে আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা। মধ্যপ্রাচ্যের এই উত্তপ্ত মানচিত্রে ইরান একটি কেন্দ্রীয় অক্ষ হিসেবে কাজ করছে, যার সঙ্গে যুক্ত রয়েছে হুতি, হিজবুল্লাহর মতো আঞ্চলিক শক্তিগুলো।

এই দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের টানাপোড়েন শুধু মধ্যপ্রাচ্যে সীমিত থাকছে না, এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়ছে পশ্চিমাদের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও অর্থনীতিতেও। বিশেষ করে মার্কিন রাজনীতিতে এর প্রভাব অত্যন্ত স্পষ্ট। মধ্যপ্রাচ্যে অঘোষিত ও দীর্ঘায়িত যুদ্ধ এবং ইসরায়েলকে দেওয়া অবিরাম সমর্থনের কারণে মার্কিন অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি ও বাজার গুরুতর চাপের মুখোমুখি। মূল্যস্ফীতি, জ্বালানির চড়া দাম এবং যুদ্ধসংক্রান্ত ব্যয় সাধারণ মার্কিন নাগরিকদের মধ্যে অসন্তোষ বাড়াচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র বা পশ্চিমা দেশগুলোর মধ্যবর্তী কিংবা জাতীয় নির্বাচনে এই যুদ্ধনীতির ব্যর্থতা ও অজনপ্রিয়তা বড় ধরনের ক্ষমতার রদবদল ঘটাতে পারে। ওয়াশিংটনের নীতিতে যদি কোনো পরিবর্তন আসে বা সেখানে ডেমোক্র্যাট বা অন্য কোনো শক্তির রাজনৈতিক প্রভাব পুনর্বিন্যস্ত হয়, তবে তেহরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের বরফ গলতেও দেখা যেতে পারে।

যদি ইরান এই প্রবল চাপ ও সামরিক হুমকি অতিক্রম করে নিজের রাজনৈতিক ও সামরিক অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে পারে, তবে মধ্যপ্রাচ্যের সার্বিক ক্ষমতার রাজনীতি নতুন এক রূপ নেবে। যুক্তরাষ্ট্র যদি তীব্র সংঘাতের পথ ছেড়ে কূটনৈতিক সমঝোতায় ফিরতে বাধ্য হয়, তবে ইরানকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা অক্ষের রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা ও দরকষাকষির শক্তি বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে। তখন মধ্যপ্রাচ্যের বাকি দেশগুলোর সঙ্গে ইরানের সম্পর্ক কিংবা পাশ্চাত্যের সঙ্গে রিয়াদ ও তার মিত্রদের কূটনৈতিক সুর–সবই এক নতুন মেরূকরণের মধ্য দিয়ে যাবে।

এর সরাসরি প্রভাব পড়বে ইয়েমেন ও হুতিদের ওপর। রিয়াদ যখন অনুধাবন করবে যে সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে ইয়েমেনের নিয়ন্ত্রণ বা হুতিদের নিস্তেজ করা অসম্ভব, তখন সামরিক অ্যাডজাস্টমেন্ট বা রাজনৈতিক চুক্তির পথ খোঁজা ছাড়া সৌদি আরবের সামনে আর কোনো বিকল্প থাকবে না। অন্যদিকে গাজায় ইসরায়েলি অভিযানের ফলে বিশ্বমঞ্চে ইসরায়েল যে নৈতিক ভিত্তি ও আন্তর্জাতিক সমর্থন হারিয়েছে, তাতে ফিলিস্তিন ইস্যুটিও আবার নতুন করে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অগ্রাধিকার তালিকায় ফিরতে পারে। দ্বি-রাষ্ট্র নীতির ভিত্তিতে একটি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের উদ্যোগ যদি রূপ লাভ করে, তবেই কেবল মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘমেয়াদি শান্তির পথ সুগম হওয়া সম্ভব।

বর্তমান প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ বা বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলোর জন্য এই ভূরাজনীতি অত্যন্ত স্পর্শকাতর। মধ্যপ্রাচ্যের কোনো সংঘাতে বাংলাদেশ সরাসরি বড় রাজনৈতিক খেলোয়াড় নয়; বরং জ্বালানি নিরাপত্তা, রেমিট্যান্স ও প্রবাসী শ্রমিকদের দিক থেকে আমরা এই অঞ্চলের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। তাই মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত ও অস্থিরতার প্রতিটি ঢেউ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে আমাদের অর্থনীতিতেও বড় ধরনের প্রভাব ফেলে।

উপসংহারে বলা যায়, মধ্যপ্রাচ্য আজ এক মহাভূরাজনৈতিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সৌদি-হুতি সংঘাত কিংবা গাজার সংকট–এগুলো নিছক আঞ্চলিক কোনো ছোট সংঘাত নয়; বরং এটি বিশ্ব রাজনীতি ও আঞ্চলিক পরাশক্তিগুলোর প্রভাবের নতুন ভারসাম্যের বহিঃপ্রকাশ। এই সংঘাতের চূড়ান্ত পরিণতির ওপরই নির্ভর করছে ভবিষ্যতের মধ্যপ্রাচ্যে কার কর্তৃত্ব বজায় থাকবে এবং বিশ্বরাজনীতি কোন অভিমুখে পরিচালিত হবে।

এম হুমায়ুন কবির: যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত

আরও পড়ুন

×