উচ্চশিক্ষা
দেশে প্রযুক্তি গবেষণা কতটা হয়?
মাহবুবুর রাজ্জাক
মাহবুবুর রাজ্জাক
প্রকাশ: ১৭ অক্টোবর ২০২৬ | ০৭:২৫ | আপডেট: ১৭ অক্টোবর ২০২৬ | ১১:০৫
| প্রিন্ট সংস্করণ
একটি দেশের গবেষণার প্রকৃত অবস্থা বুঝতে আন্তর্জাতিকভাবে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক ব্যবহার করা হয়। যেমন–জিডিপির কত শতাংশ গবেষণায় ব্যয় হয়, প্রতি ১০ লাখে গবেষকের সংখ্যা কত, গবেষণাপত্র ও পেটেন্টের সংখ্যা, গবেষণা থেকে নতুন পণ্য বা প্রক্রিয়া, শিল্পপ্রতিষ্ঠানের গবেষণা ব্যয় ইত্যাদি। ইউনেস্কোর পরিসংখ্যান ইনস্টিটিউট এসব সূচক সংগ্রহ করে। ইউনেস্কোর ২০২৬-এর চিত্রে বাংলাদেশের সর্বশেষ গবেষণা ব্যয় ও গবেষক সংখ্যার নির্দিষ্ট তথ্য-উপাত্ত পাওয়া যায়নি। বাংলাদেশের প্রধান দুর্বলতা শুধু গবেষণার পরিমাণ নয়; বরং গবেষণার ধারাবাহিকতা, অর্থায়ন এবং গবেষণাকে প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনে রূপান্তর করার সক্ষমতা। এখানে গবেষণামুখী কর্মপরিবেশের অভাব রয়েছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে নিজস্ব প্রযুক্তি উদ্ভাবনের পরিবর্তে বিদেশি প্রযুক্তি আমদানি ও ব্যবহারকে উৎসাহিত করা হয়।
গবেষক হতে হলে কোনো সমস্যা সমাধানের সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়ে কাজ করে যেতে হয়। শত শত পেপার ছাপিয়ে যদি কোনো তত্ত্বগত বা প্রযুক্তিগত সমস্যার সমাধানে অবদান রাখা না যায়, তবে আর যাই হোক, সেটিকে গবেষণা বলা যায় না। সাহিত্য, সমাজ, ধর্ম, বাণিজ্য, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ইত্যাদি যে কোনো বিষয় নিয়ে গবেষণা হতে পারে। তবে আমার চারণক্ষেত্র বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি। তাই এখানে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি গবেষণা নিয়ে আলোচনা করতে চাই। বৈজ্ঞানিক গবেষণা হলো কোনো ঘটনা, সমস্যা, ধারণা বা প্রাকৃতিক ও সামাজিক বিষয় সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য জ্ঞান অর্জনের উদ্দেশ্যে পরিকল্পিত, পদ্ধতিগত, যুক্তিনির্ভর এবং প্রমাণভিত্তিক অনুসন্ধান প্রক্রিয়া। সহজ ভাষায়, কোনো প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে পর্যবেক্ষণ, তথ্য সংগ্রহ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা, বিশ্লেষণ ও যুক্তির সাহায্যে সত্য যাচাই করার প্রক্রিয়া বৈজ্ঞানিক গবেষণা। এর লক্ষ্য শুধু নতুন কিছু আবিষ্কার করা নয়, বিদ্যমান ধারণা যাচাই করা এবং বাস্তব সমস্যার সমাধান খুঁজে বের করাও।
অন্যদিকে প্রযুক্তি গবেষণা হলো–বিজ্ঞান, প্রকৌশল, কম্পিউটিং ও অন্যান্য প্রযুক্তিগত জ্ঞান ব্যবহার করে নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবন, বিদ্যমান প্রযুক্তির উন্নয়ন, প্রযুক্তিগত সমস্যার সমাধান এবং কোনো প্রযুক্তির কার্যকারিতা, দক্ষতা, নিরাপত্তা ও ব্যবহারযোগ্যতা যাচাই করার উদ্দেশ্যে পরিচালিত পদ্ধতিগত অনুসন্ধান। সহজ ভাষায়, মানুষের কোনো সমস্যা সমাধান করতে, কাজকে সহজ করতে, উৎপাদনশীলতা বাড়াতে অথবা নতুন প্রযুক্তিগত সক্ষমতা অর্জন করতে প্রযুক্তি নিয়ে যে পরিকল্পিত ও প্রমাণভিত্তিক গবেষণা করা হয়, তাকে প্রযুক্তি গবেষণা বলা যায়। যেমন–কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থা ব্যবহার করে শিক্ষার্থীদের শেখার দক্ষতা বাড়ানো যায় কিনা, তা পরীক্ষা করে দেখা শিক্ষা-প্রযুক্তি গবেষণার একটি বিষয় হতে পারে। কোনো যন্ত্র বা প্লান্টের নকশা পরিবর্তন করে এনার্জি খরচ কমানো এবং উৎপাদনক্ষমতা বাড়ানোর উপায় অনুসন্ধান করা নিয়ে প্রকৌশল প্রযুক্তি গবেষণা হতে পারে। তেমনি সেন্সর, ড্রোন ও স্বয়ংক্রিয় সেচব্যবস্থা ব্যবহার করে পানির অপচয় কমানো এবং ফসলের উৎপাদন বাড়ানো যায় কিনা, তা নিয়ে নিয়ে গবেষণা হলে তাকে কৃষিপ্রযুক্তি গবেষণা বলা যায়।
বৈজ্ঞানিক গবেষণার বিবেচ্য বিষয় হলো প্রকৃতি, ঘটনা ও বিভিন্ন প্রক্রিয়া সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন। কোন ঘটনা কেন এবং কীভাবে ঘটে তার কারণ অনুসন্ধান। এতে নতুন তত্ত্ব বা নীতি ও নতুন জ্ঞান তৈরি হয়। অন্যদিকে প্রযুক্তি গবেষণার প্রধান লক্ষ্য প্রযুক্তিগত জ্ঞান সৃষ্টি, উন্নয়ন বা প্রয়োগ। এখানে মূল প্রশ্নটি হলো, কীভাবে কোনো সমস্যার প্রযুক্তিগত সমাধান করা যায়? ফলাফল হিসেবে বাজারে বিভিন্ন ধরনের নতুন নতুন যন্ত্র, সফটওয়্যার, প্রক্রিয়া, নকশা বা উন্নত প্রযুক্তি দেখতে পাওয়া যায়। এগুলোর কার্যকারিতা, দক্ষতা, ব্যয়, নিরাপত্তা ও ব্যবহারযোগ্যতা নিয়ে কাজকেও প্রযুক্তি গবেষণা বলা যায়। তবে এই দুই ধরনের গবেষণার মধ্যে কঠোর বিভাজন নেই। প্রযুক্তি গবেষণায় বৈজ্ঞানিক গবেষণা ব্যবহৃত হয় এবং প্রযুক্তি গবেষণা থেকেও নতুন বৈজ্ঞানিক জ্ঞান সৃষ্টি হতে পারে।
বৈজ্ঞানিক গবেষণা ব্যয়সাপেক্ষ। এর ফল বাজারে আসতে অনেক সময়ের দরকার হয়। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে প্রযুক্তি গবেষণার গুরুত্বই বেশি। বাংলাদেশের শিল্পায়ন, কৃষির আধুনিকীকরণ, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, পরিবহন, জ্বালানি ও তথ্যপ্রযুক্তির উন্নয়নে প্রযুক্তি গবেষণা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বিশেষ করে দেশীয় সমস্যার উপযোগী প্রযুক্তি উদ্ভাবন, আমদানিনির্ভরতা কমানো, স্থানীয় শিল্পের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং দক্ষ মানবসম্পদ তৈরিতে এর অবদান রয়েছে। বাংলাদেশে প্রযুক্তি গবেষণা হচ্ছে, তবে এর পরিসর ও গবেষণার ফল বাস্তবে প্রয়োগের ক্ষেত্রে আরও উন্নতির সুযোগ রয়েছে। দেশে বিশ্ববিদ্যালয়, সরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান, প্রকৌশল গবেষণাগার, বেসরকারি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ও স্টার্টআপগুলো বিভিন্ন ক্ষেত্রে সীমিত পরিসরে গবেষণা করছে।
প্রযুক্তি গবেষণা বাড়াতে দেশে গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। সরকারি অর্থায়নের পাশাপাশি বেসরকারি শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে গবেষণায় বিনিয়োগে উৎসাহিত করতে হবে। শিল্প ক্ষেত্রের বাস্তব সমস্যাকে কেন্দ্র করে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে যৌথ গবেষণাগার, গবেষণা প্রকল্প ও ইন্টার্নশিপ গড়ে তুলতে হবে। প্রোটোটাইপ ও উদ্ভাবনে সহায়তা এবং গবেষকের দক্ষতা ও স্বাধীনতা বাড়াতে হবে। আধুনিক গবেষণা পদ্ধতি, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, মেধাস্বত্ব সুরক্ষা এবং যোগ্যতার ভিত্তিতে গবেষণা অনুদান নিশ্চিত করতে হবে। গবেষণার ফল পরিমাপে শুধু প্রকাশিত গবেষণাপত্র নয়; উদ্ভাবিত প্রযুক্তি, পেটেন্ট, শিল্পে ব্যবহার, উৎপাদনশীলতা ও সামাজিক প্রভাবও মূল্যায়ন করতে হবে।
বাংলাদেশে প্রযুক্তি গবেষণার ভিত্তি রয়েছে, বিশেষ করে কৃষি গবেষণা, তথ্যপ্রযুক্তি এবং কিছু বিজ্ঞান ও প্রকৌশল ক্ষেত্রে। দেশকে প্রযুক্তি ব্যবহারকারী থেকে প্রযুক্তি উদ্ভাবনকারী দেশে রূপান্তর করতে হলে গবেষণার পরিমাণের পাশাপাশি গবেষণার মান, অর্থায়ন, শিল্পের সঙ্গে সংযোগ এবং উদ্ভাবনের বাস্তব প্রয়োগ বাড়াতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো: বাংলাদেশ গবেষণায় কত টাকা ব্যয় করছে এবং সেই বিনিয়োগের বিনিময়ে কত নতুন প্রযুক্তি, পণ্য, শিল্প প্রক্রিয়া ও অর্থনৈতিক মূল্য সৃষ্টি হচ্ছে? এই দুটি দিক একসঙ্গে বিবেচনা করলে দেশের প্রযুক্তি গবেষণার প্রকৃত অগ্রগতি বোঝা যাবে।
ড. মাহবুবুর রাজ্জাক: অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, যন্ত্রকৌশল বিভাগ, বুয়েট
- বিষয় :
- মাহবুবুর রাজ্জাক