অন্যদৃষ্টি
নিরাপদ জীবন মানে কী
আব্দুল কাদের জীবন
প্রকাশ: ০৬ অক্টোবর ২০২৬ | ০৭:৩১
| প্রিন্ট সংস্করণ
বাংলাদেশ যেন এক অদ্ভুত ব্যবস্থার ভেতর দিয়ে চলছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে মানুষের উদ্বেগ দিন দিন বাড়ছে। একদিকে চাঁদাবাজি, দখলদারিত্ব, ছিনতাই; অন্যদিকে খুন, ধর্ষণসহ নানা অপরাধের খবর নিয়মিত সামনে আসছে। অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা দেখা যায়। প্রশ্ন হলো, অপরাধ সংঘটিত হওয়ার আগেই কি তাদের প্রতিরোধ করার সক্ষমতা ও উদ্যোগ যথেষ্ট?
আগেকার বাংলা সিনেমায় প্রায়ই দেখা যেত, অপরাধ ঘটে যাওয়ার পর পুলিশ ঘটনাস্থলে আসে। বর্তমানে ঘটে যাওয়া কিছু ঘটনাও সেই দৃশ্য মনে করিয়ে দেয়।
সম্প্রতি মিরপুরের একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্র ভেঙে ফেলা হয়েছে এবং ঘটনাটি ঘটেছে জমি দখলকে কেন্দ্র করে। কয়েক ঘণ্টা ধরে ভাঙচুর চলার পর পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিষয়টি তদন্তে একটি কমিটিও গঠন করা হয়েছে।
কোনো জায়গা দখলের চেষ্টা যদি দীর্ঘদিন ধরে চলে, তাহলে প্রশাসন কি আগে বিষয়টি জানতে পারে না? দখলদাররা যদি শত শত লোক নিয়ে একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলা চালানোর সাহস পায়, তাহলে স্থানীয় পর্যায়ে গোয়েন্দা তথ্য ও আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। একই সঙ্গে এটিও সত্য, জনসেবামূলক একটি প্রতিষ্ঠান দখল বা ধ্বংসের ঘটনায় প্রশাসনের প্রতিরোধমূলক ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠলে তার জবাবদিহি থাকা জরুরি।
চাঁদাবাজি ও দখলদারিত্বের সমস্যা শুধু একটি জায়গা বা একটি গোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি অর্থনীতি, জননিরাপত্তা এবং সামাজিক পরিবেশ– তিন ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলে। একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী যদি প্রতিদিন চাঁদার আতঙ্কে থাকেন; একজন গাড়িচালক যদি বিভিন্ন পয়েন্টে অবৈধ অর্থ দিতে বাধ্য হন, তাহলে তার প্রভাব শেষ পর্যন্ত সাধারণ ভোক্তার ওপর পড়ে। পরিবহন ব্যয় ও পণ্যের দাম বাড়ে। অর্থাৎ চাঁদাবাজির বোঝা শেষ পর্যন্ত জনগণের ঘাড়ে গিয়ে পড়ে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার। সম্প্রতি কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকের সন্তান অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের পর কিশোর গ্যাং ও মাদক নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। পুলিশ এ ঘটনায় একজন তরুণ ও দুই কিশোরকে গ্রেপ্তারের কথা জানিয়েছে। ঘটনাটির পর কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনের আরও কঠোর পদক্ষেপের দাবি উঠেছে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, অনেক সময় অপরাধের সঙ্গে জড়িত চুনোপুঁটিরা গ্রেপ্তার হলেও পেছনের অদৃশ্য সন্ত্রাসী মহল ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়। ফলে একই চক্র নতুন লোক দিয়ে আবার সক্রিয় হয়ে ওঠে। এই জায়গাটিতে প্রশাসনের সক্ষমতার সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নত করতে সরকারের সবচেয়ে বড় শক্তি হওয়া উচিত আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ। অপরাধীর পরিচয় রাজনৈতিক, সামাজিক কিংবা অর্থনৈতিক; যা-ই হোক; অপরাধ প্রমাণিত হলে তাকে আইনের মুখোমুখি হতে হবে। কোনো দলের পরিচয় যেন কারও জন্য ঢাল না হয়।
জনগণের জানমালের নিরাপত্তা রাষ্ট্রের প্রথম দায়িত্ব। একজন ব্যবসায়ী যেন চাঁদার ভয়ে ব্যবসা বন্ধ না করেন; একজন গাড়িচালক যেন অবৈধ অর্থ দিতে বাধ্য না হন; একজন জমির মালিক যেন দখলের আতঙ্কে না থাকেন এবং কোনো কিশোর যেন অপরাধী চক্রের হাতিয়ার না হয়–এটাই হওয়া উচিত আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার লক্ষ্য। অন্যদিকে প্রশাসনের ঘুম ভাঙানোর অর্থ কেবল অভিযান নয়; বরং এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করা, যেখানে অপরাধ সংঘটিত হওয়ার আগে তার পূর্বাভাস পাওয়া যাবে। অপরাধী চক্রের শিকড় শনাক্ত হবে এবং রাজনৈতিক বা অন্য কোনো প্রভাব ছাড়া আইন তার নিজস্ব গতিতে চলবে। কারণ জনগণের নিরাপত্তা ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব।
আব্দুল কাদের জীবন: শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা
বিভাগ, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়
- বিষয় :
- অন্যদৃষ্টি