অন্যদৃষ্টি
শিক্ষার্থীর মূল্যবোধ
মো. হারুনার রশিদ
প্রকাশ: ০৭ অক্টোবর ২০২৬ | ০৭:২২
| প্রিন্ট সংস্করণ
একটি শিশু যখন পৃথিবীতে আসে, তার মধ্যে থাকে সরলতা। সে মিথ্যা, প্রতারণা, হিংসা কিংবা অন্যের ক্ষতি করার কৌশল নিয়ে জন্মায় না। পরিবার, পরিবেশ, শিক্ষা ও সামাজিক অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়েই ধীরে ধীরে তার স্বভাব ও চরিত্র গড়ে ওঠে। তাই আজ যদি আমাদের শিক্ষার্থীদের একটি অংশের মধ্যে নীতি-নৈতিকতা, আদর্শ ও মূল্যবোধের ঘাটতি দেখা যায়, তাহলে শুধু তাদের দোষারোপ করে সমস্যার সমাধান হবে না। বরং প্রশ্ন করতে হবে– কোথায় আমরা তাদের স্বাভাবিক মানবিক স্বভাব থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছি এবং কীভাবে তাদের সেই স্বাভাবিকতা ফিরিয়ে আনা যায়?
মাধ্যমিক পর্যায় এ ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কৈশোরে একজন শিক্ষার্থীর ব্যক্তিত্ব, চিন্তা, আচরণ ও জীবনদর্শনের ভিত তৈরি হয়। এই বয়সে সে পরিবারকে যেমন দেখে, শিক্ষককে যেমন দেখে, বন্ধুমহলে যে আচরণ দেখে এবং সমাজে যে বাস্তবতা প্রত্যক্ষ করে, সেগুলো তার ওপর গভীর প্রভাব ফেলে।
প্রথম কাজটি হতে পারে শিক্ষার্থীর সঙ্গে সম্পর্কের ধরন পরিবর্তন করা। আমরা অনেক সময় ভালো আচরণ চাই, কিন্তু ভালো আচরণের কারণটি বুঝিয়ে বলি না। শুধু ‘এটা করো’, ‘ওটা করো না’ বলে নৈতিক মানুষ তৈরি করা যায় না। তাকে বুঝতে হবে– সত্য বলা কেন জরুরি; অন্যকে সম্মান করলে সমাজ কেন সুন্দর হয়; নিজের দায়িত্ব পালন না করলে অন্যের ওপর কী প্রভাব পড়ে; আর অন্যায়কে প্রশ্রয় দিলে শেষ পর্যন্ত ক্ষতি কার হয়।
নৈতিকতা শেখানোর সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি হলো চর্চা ও অনুকরণ। একজন শিক্ষক যদি শিক্ষার্থীর সঙ্গে সম্মানজনক আচরণ করেন; ভুল করলে নিজের ভুল স্বীকার করেন; পক্ষপাত না করেন এবং ন্যায়সংগত সিদ্ধান্ত নেন, তাহলে শিক্ষার্থীরা তা চোখের সামনে দেখে শেখে। একইভাবে বাবা-মা যদি সত্যবাদিতা, শৃঙ্খলা ও মানবিকতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন; সন্তানও সেই আচরণ অনুসরণ করার সুযোগ পায়।
বিদ্যালয়ে নৈতিক শিক্ষাকে আলাদা কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তৃতায় সীমাবদ্ধ না রেখে দৈনন্দিন বিদ্যালয়-সংস্কৃতির অংশ করা প্রয়োজন। সততার চর্চা, দায়িত্ব ভাগ করে দেওয়া, সহপাঠীকে সহযোগিতা, ছোটদের স্নেহ ও বড়দের সম্মান, নিজের ভুল স্বীকার এবং অন্যের মতামতকে শ্রদ্ধা করা– এগুলোকে বিদ্যালয়ের নিয়মিত চর্চায় পরিণত করতে হবে। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সামাজিক দায়িত্বের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের যুক্ত করা। বৃক্ষরোপণ, বিদ্যালয় পরিচ্ছন্ন রাখা, অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো, বয়স্কদের সহযোগিতা, পথশিশু বা সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জন্য সহায়তা সংগ্রহ– এ ধরনের কাজে শিক্ষার্থীদের সম্পৃক্ত করলে মানবিকতা বইয়ের পাতা থেকে বাস্তব জীবনে চলে আসবে। যে শিক্ষার্থী নিজ হাতে অন্যের উপকার করার আনন্দ অনুভব করবে, তার মধ্যে সহমর্মিতা ও দায়িত্ববোধ স্বাভাবিকভাবেই শক্তিশালী হবে।
প্রযুক্তির যুগে ডিজিটাল আচরণও নৈতিক শিক্ষার অংশ হওয়া প্রয়োজন। মোবাইল বা সামাজিক মাধ্যম কেড়ে নেওয়া নয়, বরং এগুলোর দায়িত্বশীল ব্যবহার শেখাতে হবে। গুজব না ছড়ানো, অন্যকে অপমান না করা, ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তা রক্ষা করা, অশালীন কনটেন্ট এড়িয়ে চলা এবং কোনো তথ্য শেয়ার করার আগে তার সত্যতা যাচাই করার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। শিক্ষার লক্ষ্য শুধু মেধাবী শিক্ষার্থী তৈরি করা নয়; এমন মানুষ তৈরি করা, যে নিজের সাফল্যের পাশাপাশি অন্যের অধিকার ও কল্যাণের কথাও ভাববে।
মো. হারুনার রশিদ: সিনিয়র শিক্ষক, আলহাজ এম এ আজিজ
হাই স্কুল, ফরিদপুর
[email protected]
- বিষয় :
- অন্যদৃষ্টি