রাজধানী
পুরো শহরটাই যেভাবে বাজার হয়ে গেল!
সামছুর রহমান আদিল
সামছুর রহমান আদিল
প্রকাশ: ০৮ অক্টোবর ২০২৬ | ০৭:৪২ | আপডেট: ০৮ অক্টোবর ২০২৬ | ১১:৩৪
| প্রিন্ট সংস্করণ
রাজধানীর আগারগাঁওয়ে এখন সরকারি গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন দপ্তরের অবস্থান। গত কয়েক বছরে এই এলাকায় বড় বড় সরকারি ভবন গড়ে উঠেছে। ফলে একসময়ের বস্তি ও অবহেলিত আগারগাঁওয়ের সড়কগুলো এখন প্রশস্ত ও পিচঢালাই। তবে আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ পাবলিক সার্ভিস কমিশন (বিপিএসসি) ও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) মতো গুরুত্বপূর্ণ সরকারি প্রতিষ্ঠানের সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় মনে হয় না, এটি রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ সড়ক। সড়কের একপাশজুড়ে বসেছে বাজার। আগে ছিল ভ্রাম্যমাণ বাজার। এখন এটি স্থায়ী রূপ নিয়েছে। মাছ, মাংস, সবজি, ফল; সবই পাওয়া যাচ্ছে সেখানে।
মিরপুর-১ নম্বরের টোলারবাগে একই দৃশ্য। ডেল্টা মেডিকেল এবং সরকারি কর্মকর্তাদের কোয়ার্টারের সামনের সড়কে স্থায়ী রূপ নিয়েছে বাজার। আগারগাঁও-মিরপুরে সড়ক দখল করে অবৈধ বাজারের এই চিত্র কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় এখন এমন দৃশ্য দেখা যায়। কোথাও ফুটপাত দখল করে বাজার; কোথাও ভ্যানগাড়িতে গলির রাস্তা আটকে বিক্রি হচ্ছে মাছ, সবজি; আবার কোথাও মূল সড়কের একাংশই চলে গেছে বাজারের দখলে। একসময় বাজার ছিল নির্দিষ্ট জায়গায়। তারপর ফুটপাত, এরপর অলিগলি। এখন বাজার এসে উঠেছে মূল সড়কে। এর সবচেয়ে বড় ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে পথচলতি মানুষকে।
সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনে অনুমোদিত কাঁচাবাজার আছে ৬৪টি। এর বাইরে বাজার বসানোর অনুমতি নেই। কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন। রাজধানীর বিভিন্ন মোড়, ফুটপাত, সড়কের পাশ, সরকারি জায়গা কিংবা আবাসিক এলাকার গলিতে গড়ে উঠেছে অসংখ্য বাজার। ঢাকার বেসরকারি বাজারগুলোর বড় একটি অংশও চলছে সিটি করপোরেশনের লাইসেন্স ছাড়া। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের তালিকাভুক্ত ১০৮টি বেসরকারি বাজারের মধ্যে লাইসেন্স পেয়েছে মাত্র ১২টি। এর মধ্যে লাইসেন্স নবায়ন আছে তিনটির। অর্থাৎ বর্তমানে কার্যকর লাইসেন্স রয়েছে মাত্র তিনটি বাজারের। বাকি ১০৫টি বাজারই চলছে লাইসেন্স ছাড়া।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন বেসরকারি বাজার প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনার জন্য ২০২২ সালে প্রবিধানমালা করে। বাজারগুলোকে লাইসেন্সের আওতায় আনতে নোটিশ, গণবিজ্ঞপ্তি ও জরিমানার সতর্কতাও দেওয়া হয়েছে। এমনকি বিদ্যুৎ ও পানির সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার নির্দেশও দেওয়া হয়েছিল। তারপরও অধিকাংশ বাজারকে লাইসেন্সের আওতায় আনা যায়নি। এখানে শুধু সরকারের রাজস্ব হারানোর বিষয় জড়িত না। লাইসেন্সের সঙ্গে বাজারের অবকাঠামো, অগ্নি নিরাপত্তা ও অন্যান্য নিরাপত্তাও জড়িত।
এই বাজারগুলোর সঙ্গে আরেকটি বিষয় জড়িয়ে আছে– চাঁদাবাজি। বিভিন্ন সময়ের সংবাদ প্রতিবেদন ও গবেষণায় ফুটপাতের হকার ও ভাসমান ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে নিয়মিত টাকা আদায়ের অভিযোগ উঠে এসেছে। ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের ২০১৬ সালের এক গবেষণায় বলা হয়েছিল, ঢাকার প্রায় ৪৩০ কিলোমিটার ফুটপাতে আড়াই লাখের বেশি হকার ব্যবসা করেন। এলাকাভেদে একজন হকারকে প্রতিদিন ৫০ থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত গুনতে হয় বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছিল। সেই হিসাবে বছরে চাঁদার পরিমাণ প্রায় ১ হাজার ৮২৫ কোটি টাকা।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কার্যালয়ের সামনের সড়কেও বাজার বসছে। কলেজগেটে রেসিডেনসিয়াল মডেল কলেজের দেয়াল ঘেঁষেও বসে কাঁচাবাজার। এই বাজারের ঠিক বিপরীত পাশে ঢাকা মহানগর পুলিশের তেজগাঁও ট্রাফিক জোনের কার্যালয়। ফলে প্রশ্ন উঠতেই পারে, প্রতিদিন বসা এই বাজার কি সংশ্লিষ্টদের চোখ এড়িয়ে যায়?
কাজের অভাব, স্বল্প পুঁজি এবং শহরে বাড়তে থাকা মানুষের চাপের কারণে অনেকে ভ্রাম্যমাণ ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ও জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১ হাজার ৭০০ মানুষ ঢাকায় যুক্ত হচ্ছে। নতুন মানুষের সঙ্গে বাড়ছে খাবার ও নিত্যপণ্যের চাহিদাও। সেই চাহিদা মেটাতে ব্যবসা বাড়বেই। তার মানে এই নয়, সড়ক আর ফুটপাতই হবে ব্যবসার জায়গা।
এ সমস্যা শুধু ঢাকার নয়। দেশের বিভিন্ন মহাসড়ক ও আঞ্চলিক সড়কের পাশেও গড়ে উঠছে বাজার। কোথাও সড়কের পাশে, কোথাও মূল সড়কের একাংশ দখল করে বসছে দোকান। এতে যান চলাচল ব্যাহত হচ্ছে; বাড়ছে দুর্ঘটনার ঝুঁকি।
তবে ঢাকার সমস্যা আরও প্রকট। কারণ এখানে যানবাহন ও মানুষের চাপ এমনিতেই বেশি।
কয়েক বছর আগে বিশ্বব্যাংকের এক জরিপে বলা হয়েছিল, যানজটের কারণে ঢাকায় প্রতিদিন ৩২ লাখ কর্মঘণ্টা নষ্ট হয়। এরপর শহরে মানুষ ও যানবাহন দুটোই বেড়েছে। এর মধ্যে সড়কের জায়গা যদি বাজারের দখলে যায়, তাহলে ভোগান্তি আরও বাড়বে; এটাই স্বাভাবিক।
ঢাকার ফুটপাত অনেক দিন ধরে মানুষের পা থেকে উঠে গেছে। এখন মূল সড়কের বিভিন্ন অংশও সেই পথে যাচ্ছে। বাজারের প্রয়োজন আছে। ব্যবসায়ীরও ব্যবসা করার প্রয়োজন আছে। কিন্তু বাজারের জন্য সড়ক ছেড়ে দিলে একসময় শহরের মানুষের চলাচলের জায়গাই থাকবে না। এমন পরিস্থিতি চলতে থাকলে কিছুদিন পর ফুটপাতের মতো সড়কও পুরোপুরি বাজারের দখলে চলে যাবে।
আমাদের মানসিকতায়ও বদল আনা প্রয়োজন। ঘর থেকে দুই পা ফেলে আমরা কিছুটা দূরের বাজারে কেনাকাটা করতে যেতে রাজি না। বাসার কাছাকাছি সড়কে বসা অবৈধ দোকান থেকেই কেনাকাটা করতে চাই। এ কারণেই ঢাকায় এখন আর বাজার খুঁজতে আলাদা করে কোথাও যেতে হয় না।
সিটি করপোরেশন মাঝেমধ্যে উচ্ছেদ অভিযান চালায়। দোকান সরানোর পর কিছুদিনের জন্য সড়ক ফাঁকা হয়। তারপর আবার আগের জায়গায় দোকান বসে। এ যেন এক ধরনের ইঁদুর-বিড়াল খেলা। তাই শুধু উচ্ছেদ করে এ সমস্যার সমাধান হবে না। কোথায় বাজার হবে; কোথায় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা বসবেন; বেসরকারি বাজার কীভাবে লাইসেন্স পাবে এবং বাজারে নিরাপত্তা কীভাবে নিশ্চিত হবে– এসবের একটি পরিকল্পনা দরকার।
সামছুর রহমান আদিল: সাংবাদিক ও যোগাযোগবিদ
[email protected]
- বিষয় :
- রাজধানী