রাইটটার্ন
ঘোলা পানিতে মাছ শিকার ঠেকাতে পানি পরিষ্কার রাখুন
মোহাম্মদ গোলাম নবী
মোহাম্মদ গোলাম নবী
প্রকাশ: ০৮ অক্টোবর ২০২৬ | ০৭:৪৮
| প্রিন্ট সংস্করণ
বাংলা ভাষায় প্রচলিত প্রবাদ: ঘোলা পানিতে মাছ শিকার। কোনো বিষয়ে তথ্যের অস্পষ্টতা থাকলে পক্ষ ও বিপক্ষ সুবিধামতো বক্তব্য হাজির করে। মানুষ বুঝতে পারেন না, কোনটি বিশ্বাস করবেন। অথচ অনেক ক্ষেত্রে সরকারি প্রতিষ্ঠান প্রয়োজনীয় তথ্য প্রকাশ করলেই এই বিভ্রান্তির অবসান ঘটতে পারে।
দেশে স্যাটেলাইট টেলিভিশনের পাশাপাশি সামাজিক মাধ্যম মানুষের কাছে পৌঁছানোর বড় মাধ্যম হয়ে উঠেছে। সংবাদ, বক্তব্য ও মতামত প্রচারের সুযোগ হয়েছে বহুগুণ। আগে যে আলোচনা কয়েকজনের বৈঠক কিংবা পত্রিকার পাতায় সীমাবদ্ধ থাকত, এখন তা মুহূর্তে অসংখ্য মানুষের সামনে হাজির হয়। এই সুযোগ জনসচেতনতা ও জবাবদিহি বাড়াতে পারে। আবার তথ্যের ঘাটতি থাকলে বিভ্রান্তি ছড়ানোর হাতিয়ারও হয়ে ওঠে।
আমাদের মতো বহুধাবিভক্ত সমাজে অনেকেই বক্তব্যের সত্যতা বিচার করার আগে দেখেন– সেটা নিজের পছন্দের কিনা। সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জনপ্রিয়তা অর্জনের প্রতিযোগিতা। কোন বক্তব্য কত বেশি ছড়াল, সেটিই যেন মানের মাপকাঠি। চটকদার শিরোনাম, রহস্যের আভাস এবং উত্তেজনাপূর্ণ অভিযোগের ভিড়ে তথ্যের নির্ভুলতা পেছনে পড়ে যায়।
এর মূল্য দিতে হয় সমাজকে। মানুষ এমন তর্কে সময় ও শ্রম ব্যয় করেন। একজনের ১০ মিনিট, আরেকজনের আধঘণ্টা; এভাবে বিপুলসংখ্যক মানুষের এই সময় একত্র করলে অপচয়ের ব্যাপকতা বোঝা যায়। তথ্য সহজলভ্য হলে সেই আলোচনা দেশের প্রকৃত সমস্যা ও করণীয়ের দিকে ঘুরতে পারত।
বাংলাদেশ বিমানের জন্য বোয়িংয়ের উড়োজাহাজ কেনার আলোচনা এখানে প্রাসঙ্গিক। উড়োজাহাজ কেনা তাৎক্ষণিক কোনো সিদ্ধান্ত নয়। প্রয়োজন নির্ধারণ, বহর পরিকল্পনা, যাত্রী ও গন্তব্য বিশ্লেষণ, রক্ষণাবেক্ষণ, অর্থায়ন, দরকষাকষি এবং সরবরাহের সময় বিবেচনা করতে হয়। শুধু চুক্তি কিংবা উড়োজাহাজ গ্রহণের ছবি দেখলে এই দীর্ঘ প্রক্রিয়া বোঝা যায় না। যেমন– আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে বিমানের বহরে যুক্ত হওয়া কয়েকটি বোয়িং উড়োজাহাজের ক্রয় চুক্তি হয়েছিল ওয়ান ইলেভেন সরকারের আমলে।
বিমান বহর সম্প্রসারণের সাম্প্রতিক পরিকল্পনাও হঠাৎ তৈরি হয়নি। ২০৩১ সালের মধ্যে মোট বহর ৪৫টি উড়োজাহাজে উন্নীত করার পরিকল্পনা ২০২২ সালেই আলোচনায় আসে। ২০২৪ সালের জুনে বিমানের তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক জানান, ২০৩৪ সালের মধ্যে বহর ৪৭টিতে নিতে কেনা অথবা ইজারার মাধ্যমে ৩২টি নতুন উড়োজাহাজ সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে। বিদ্যমান ২১টির মধ্যে ছয়টি সরিয়ে নেওয়ার হিসাবও সেখানে ছিল। তখনই এয়ারবাসের সঙ্গে আলোচনা এবং বোয়িংয়ের প্রস্তাব বিবেচনায় ছিল।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে এই প্রক্রিয়া আরও এগিয়েছে; ২০২৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর বিমানের পর্ষদ ১৪টি বোয়িং কেনার নীতিগত অনুমোদন দেয়। এরপর বিএনপি সরকারের সময়ে ২০২৬ সালের ৩০ এপ্রিল ১৪টি এবং ২৩ সেপ্টেম্বর আরও ১১টি উড়োজাহাজের ক্রয় চুক্তির ঘোষণা আসে। সমালোচনা শুরু হয়– এটা আমেরিকার প্রতি নতজানু পররাষ্ট্রনীতির প্রমাণ। কিন্তু ক্রয় সিদ্ধান্তের পুরো সময়টা জানলে সেটা এড়ানো যেত।

দীর্ঘদিনের পরিকল্পনা থাকলেই অবশ্য কোনো ক্রয় প্রক্রিয়া যৌক্তিক হয়ে যায় না। কতটি উড়োজাহাজ প্রয়োজন, বিকল্প প্রস্তাব কী ছিল, অর্থায়নের খরচ কত এবং আয় দিয়ে দায় পরিশোধের পরিকল্পনা কী– এসব প্রশ্ন জরুরি। স্বচ্ছতা এসব প্রশ্নের উত্তর দেবে। আলোচনা তখন কৃতিত্ব ভাগাভাগি কিংবা দায় ঠেলাঠেলিতে আটকে থাকবে না; দেশের লাভ, খরচ ও ঝুঁকি বিচারের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
প্রসঙ্গক্রমে যমুনা সেতুর নির্মাণ শুরু হয় ১৯৯৪ সালে; উদ্বোধন হয় ১৯৯৮ সালে। মাঝখানে সরকার বদলেছে। পদ্মা সেতুর সম্ভাব্যতা সমীক্ষার চূড়ান্ত প্রতিবেদন জাইকা প্রকাশ করেছিল ২০০৫ সালের মার্চে; উদ্বোধন হয়েছে বহু বছর পর। প্রস্তুতি, অর্থায়ন, নির্মাণ ও উদ্বোধন রাষ্ট্রীয় কাজের ধারাবাহিক অংশ। শুধু উদ্বোধনের তারিখ দিয়ে প্রকল্পের ইতিহাস লেখা যায় না।
শিক্ষায় পাঠ্যক্রম বা মূল্যায়ন পদ্ধতি পরিবর্তনের কথাও ধরা যাক। কোন শ্রেণিতে কী বদলাবে; পরীক্ষা কীভাবে হবে; শিক্ষক বা অভিভাবকের করণীয় কী– স্পষ্টভাবে না জানালে উদ্বেগ বাড়ে। ঢালাও অভিযোগ ওঠে; ব্যাখ্যার বদলে বিরোধিতাকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য বলে উড়িয়ে দেওয়া হয়। অথচ সিদ্ধান্তের কারণ, সংশ্লিষ্ট পাঠ ও প্রয়োগের নির্দেশনা একই সঙ্গে প্রকাশ করলে গোড়াতেই বিভ্রান্তি কমত। স্বাস্থ্য খাতে একই প্রয়োজন রয়েছে। সরকারি হাসপাতালে কোনো ওষুধ না পেলে রোগীর মনে প্রশ্ন জাগে: বরাদ্দ হয়নি, কেনা হয়নি, নাকি রোগীর কাছে পৌঁছাচ্ছে না? বরাদ্দ, সরবরাহ ও মজুতের তথ্য নিয়মিত প্রকাশ করলে এটা ঘটত না। একই কথা টিকাদান কর্মসূচির ক্ষেত্রেও সত্য। মানুষের প্রশ্নের জায়গা খালি রাখলে অনুমান ও গুজব সেখানে ঢুকে পড়ে।
আমাদের রাজনীতিতে কৃতিত্ব নেওয়ার প্রবণতা প্রবল। উদ্বোধনের মঞ্চ যত দৃশ্যমান, প্রস্তুতির নথি তত আড়ালে থাকে। অথচ প্রকল্প জনগণের অর্থে হয়; ঋণও জনগণকে শোধ করতে হয়। জনগণের জানার সুযোগ কোনো সরকারের অনুগ্রহ হতে পারে না।
প্রতিটি বড় ক্রয়, প্রকল্প ও জনসেবার সিদ্ধান্তের জন্য সহজ বাংলায় হালনাগাদ তথ্যবিবরণী প্রকাশ করা দরকার। যেহেতু মানুষের মধ্যে যোগাযোগ বাড়ছে, সেই কারণে সরকারের তথ্য দপ্তরের আকারও বাড়ানো দরকার; সেখান থেকে সরকারি উদ্যোগের সময়, সমীক্ষা, অনুমোদন, চুক্তি, ব্যয়, অর্থায়ন, অগ্রগতি ও পরিবর্তনের কারণ নিয়মিত তুলে ধরা হবে। মূল নথি দেখার ব্যবস্থাও থাকবে। ভুল তথ্য ছড়ানোর পরে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়ার চেয়ে আগেই নির্ভরযোগ্য তথ্য সামনে রাখা বেশি কার্যকর।
স্বচ্ছতা সব অপপ্রচার বন্ধ করবে না। ইচ্ছাকৃত মিথ্যাচার থাকবেই। কিন্তু তথ্যের শূন্যতা পূরণ হলে মিথ্যা শনাক্ত করা সহজ হবে। সরকারকে বুঝতে হবে– মানুষের প্রশ্ন সমস্যা নয়; উত্তর আড়াল করাই সন্দেহ বাড়ায়। ঘোলা পানিতে মাছ শিকার ঠেকানোর কার্যকর পথ হলো পানিটাই পরিষ্কার রাখা।
মোহাম্মদ গোলাম নবী: কলাম লেখক; প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক, রাইট টার্ন
- বিষয় :
- মোহাম্মদ গোলাম নবী