সমকালীন প্রসঙ্গ
ফ্রান্সের শিক্ষার্থীদের আন্দোলন যে বার্তা দিচ্ছে
মঞ্জুরে খোদা
মঞ্জুরে খোদা
প্রকাশ: ০৯ অক্টোবর ২০২৬ | ০৮:১৭ | আপডেট: ০৯ অক্টোবর ২০২৬ | ১০:৪৫
| প্রিন্ট সংস্করণ
ফ্রান্সে চলমান ছাত্র আন্দোলনকে যদি কেবল কয়েকশ বিদ্যালয় বন্ধ হয়ে যাওয়া, পুলিশের সঙ্গে কিশোরদের সংঘর্ষ কিংবা ‘উগ্র বামপন্থিদের উস্কানি’ হিসেবে দেখা হয়, তাহলে আন্দোলনটির রাজনৈতিক তাৎপর্য গুরুত্ব হারায়। গত ২১ সেপ্টেম্বর প্যারিসের উপকণ্ঠের ক্রেতেইয়ের একটি উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষক সংকটের প্রতিবাদে শুরু হওয়া বিক্ষোভ মাত্র তিন সপ্তাহে জাতীয় আন্দোলনে রূপ নেয়। এখন পর্যন্ত তিন হাজার ৭০০ উচ্চ বিদ্যালয়ের মধ্যে এক হাজার ৮০০টি পুরোপুরি ও আংশিক বন্ধ, ৫৭টি বিশ্ববিদ্যালয় অবরুদ্ধের কথা বলা হচ্ছে। ২০০ শিক্ষার্থী আহত হয়েছেন। এর মধ্যে অর্ধশতাধিক শিক্ষকও আছেন এবং প্রায় ছয় হাজার ছাত্র গ্রেপ্তার হয়েছেন।
প্যারিসের দরিদ্র শহরতলির শিক্ষার্থীরা মনে করছেন, দেশের শিক্ষার এই সংকট সবার ওপর সমানভাবে পড়ছে না। মধ্যবিত্ত, উচ্চবিত্ত ও অভিজাত এলাকার শিক্ষার্থীরা অধিক শিক্ষক, ভালো অবকাঠামো ও সুযোগ পাচ্ছে। সেখানে দরিদ্র এলাকার বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষকস্বল্পতা ও দুর্বল অবকাঠামো বিদ্যমান। এর চেয়েও যে প্রশ্নটি আজ সামনে এসেছে, ফরাসি রাষ্ট্র কি তার তরুণদের সমান সুযোগ দেওয়ার সক্ষমতা হারাচ্ছে?
২০২৭ সালের খসড়া বাজেটে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বেড়েছে মাত্র ১.৭ শতাংশ, যা মূল্যস্ফীতির তুলনায় কম। বাস্তবে এটি ব্যয় সংকোচনের নামান্তর। ফলে ফ্রান্সের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো শিক্ষা আর বাজেটের বৃহত্তম খাত থাকছে না। একদিকে ঋণের সুদ পরিশোধে চাপ; ইউক্রেন যুদ্ধের অর্থ জোগান; সামারিক খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি, অন্যদিকে রাস্তার ক্ষোভ। এই সংকট পরিস্থিতিকে জটিল করছে।
বর্তমান আন্দোলনের বিশেষত্ব হলো, এটি রাষ্ট্রের একটি মৌলিক জনসেবা, শিক্ষার দুর্বলতার বিরুদ্ধে ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ। শুরুতে এ আন্দোলনে কোনো রাজনৈতিক দল বা বড় ছাত্র সংগঠনের প্রত্যক্ষ নেতৃত্ব ছিল না। এক পর্যায়ে বামপন্থি লা ফ্রঁস ইনসুমিজ (এলএফআই) আন্দোলনকে প্রকাশ্য সমর্থন করে। এলএফআইর নেতারা বিক্ষোভে উপস্থিত হয়ে শিক্ষার্থীদের দাবির প্রতি সমর্থন জানান। তারা সহিংসতার পরিবর্তে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের আহ্বান জানান। অতঃপর বিভিন্ন বামপন্থি ও শ্রমিক সংগঠন আন্দোলনে সমর্থন জানায়। শুধু তাই নয়, শিক্ষক ও সরকারি কর্মচারী সংগঠনগুলোও আন্দোলনে যুক্ত হয়। ফলে আন্দোলনটি ছাত্রদের প্রতিবাদ থেকে বৃহত্তর সামাজিক আন্দোলনে রূপ নেয়।
সরকার ছাত্রদের শিক্ষা সমস্যাভিত্তিক এ আন্দোলনের সমাধান না করে পুলিশ দিয়ে তা দমন করতে গেলে ব্যাপক আকার ধারণ করে। সরকার এ আন্দোলনকে উগ্র বামপন্থিদের বলে প্রচার করে। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, বামপন্থিরা এ আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা রাখছে। তার মানে এই নয়, তারা এ আন্দোলন সৃষ্টি করেছে।
শুরুতে এটি কোনো রাজনৈতিক আন্দোলন ছিল না। এটি ছিল একটি সামাজিক আন্দোলন। কিন্তু পরিবর্তিত বাস্তবতায় একে আলাদা করা কঠিন। এর উৎপত্তি মূলত আর্থসামাজিক ও শিক্ষা সংকটভিত্তিক হলেও এর বিস্তার রাজনৈতিক। কেননা, শিক্ষক নেই– এটি শিক্ষা- সংক্রান্ত দাবি। কিন্তু কেন শিক্ষক নেই; রাষ্ট্র কেন পর্যাপ্ত অর্থ দিচ্ছে না; বাজেটের অগ্রাধিকার কী হবে– এসব বিষয় সরাসরি রাজনৈতিক।
এটি কোনো সরকার পতনের আন্দোলন নয়। আগামী বছর এপ্রিল-মে মাসে দেশটিতে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। বর্তমান প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ তৃতীয় মেয়াদের নির্বাচন করতে পারবেন না। সুতরাং তাঁকে ক্ষমতা থেকে সরানোর চেয়ে মাখোঁ-পরবর্তী ফ্রান্স কেমন হবে, তার রাজনৈতিক লড়াইয়ের প্রাথমিক মঞ্চ হয়ে উঠছে এই আন্দোলন। বামপন্থিরা রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ, জনসেবা ও সামাজিক ব্যয়ের প্রশ্ন সামনে আনছেন। অন্যদিকে ডানপন্থিরা আইনশৃঙ্খলা, রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব ও জাতীয়তার প্রশ্নটি সামনে আনছেন। দুই মেরুর মাঝখানে মাখোঁপন্থি মধ্যপন্থা ক্রমশ কঠিন রাজনৈতিক পরিস্থিতির মুখোমুখি।
এখানে ডানপন্থি ও অতি ডানপন্থি শক্তির অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ। তারা আন্দোলনের শিক্ষা-সংক্রান্ত মূল দাবির বদলে সহিংসতা, পুলিশ, রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব এবং বামপন্থি রাজনৈতিক প্রভাবের প্রশ্নকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। ফলে একই আন্দোলন ফরাসি রাজনীতির দুই মেরুকে দুই ধরনের রাজনৈতিক বার্তা দিচ্ছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়তো বিদ্যালয় বন্ধ হওয়া নয়। বরং রাষ্ট্র, তরুণ প্রজন্ম ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে আস্থার সংকটের প্রশ্ন সামনে চলে আসে। এই মুহূর্তে ফ্রান্সের সামনে দুটি সংকট– (১) শিক্ষার সংকট, (২) রাজনৈতিক সংকট। প্রথমটির সমাধানে প্রয়োজন অর্থ, শিক্ষক ও দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার এবং দ্বিতীয়টির সমাধানে প্রয়োজন রাজনৈতিক আস্থা ও সংলাপ। ফরাসি রাষ্ট্রের শিক্ষাব্যবস্থা, সামাজিক বৈষম্য, সরকারি ব্যয়, পুলিশি ক্ষমতা ও বাম-ডান রাজনৈতিক মেরূকরণের একসঙ্গে মুখোমুখি হওয়ার মুহূর্ত। সরকার চায় শান্তিপূর্ণ দাবি ও সহিংসতাকে আলাদা করে প্রথমটির সঙ্গে সংলাপ করতে, দ্বিতীয়টিকে দমন করতে। ছাত্রদের ওপর ব্যাটন-টিয়ার গ্যাসের ছবি সরকারের নৈতিক অবস্থানকে ক্ষয় করে। আবার স্কুলের আগুন ও আহত শিক্ষক আন্দোলনের নৈতিক ভিত দুর্বল করে।
২০২৭ সালের রাজনৈতিক লড়াইয়ের আগে এ আন্দোলন যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে তার সবচেয়ে বড় উত্তরাধিকার হয়তো কোনো একটি সরকারের পতন নয়; বরং ফ্রান্সের তরুণ প্রজন্ম রাষ্ট্রের কাছে কী প্রত্যাশা করে এবং রাষ্ট্র সেই প্রত্যাশার কতটা পূরণ করতে পারে– সেই প্রশ্নকে জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রস্থলে নিয়ে আসবে। ফ্রান্সের এই বিদ্রোহের শিক্ষা একটাই– যখন ঋণের সুদ শিক্ষার চেয়ে বড় বাজেট খাত হয়ে ওঠে, তখন সামাজিক চুক্তি টলে। এটি শুধু ফ্রান্সের নয়, বহু উন্নয়নশীল ও উন্নত দেশের জন্যও সতর্কবার্তা। আন্দোলনকে ‘বীরত্ব’ বা ‘বিশৃঙ্খলা’– যে কোনো একটি ছাঁচে ফেলার চেয়ে এর কাঠামোগত কারণ বোঝা খুব জরুরি। কারণ স্কুলের ভাঙা দেয়াল আর সরকারি হিসাবের খাতা; দুটোই আজ একই সংকটের দুই পিঠ।
ড. মঞ্জুরে খোদা: লেখক-গবেষক ও
রাজনৈতিক বিশ্লেষক
- বিষয় :
- মঞ্জুরে খোদা