ঢাকা মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬

উন্নয়ন

অর্থনীতির সংযোগ, প্রস্তুতির ঘাটতি

অর্থনীতির সংযোগ, প্রস্তুতির ঘাটতি
×
×

হোসেন জিল্লুর রহমান

হোসেন জিল্লুর রহমান

প্রকাশ: ০৯ অক্টোবর ২০২৬ | ০৮:১৯ | আপডেট: ০৯ অক্টোবর ২০২৬ | ১০:৪৫

| প্রিন্ট সংস্করণ

বর্তমান বিশ্বে অর্থনৈতিক উন্নয়ন, বাণিজ্য সম্প্রসারণ ও বিনিয়োগ আকর্ষণের ক্ষেত্রে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সংযোগের গুরুত্ব ক্রমেই বাড়ছে। তবে কেবল ভৌগোলিক সংযোগ বা অবকাঠামো গড়ে তুললেই কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া সম্ভব নয়। এ জন্য প্রয়োজন দক্ষ প্রশাসন, কার্যকর প্রতিষ্ঠান, সক্ষম মানবসম্পদ ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ। বিশেষ করে তরুণদের সম্ভাবনাকে কাজে লাগানো এবং দেশীয় উদ্যোক্তাদের শক্তিশালী করার মধ্য দিয়েই একটি দেশের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বাড়ানো সম্ভব। সম্প্রতি সিজিএস আয়োজিত বে অব বেঙ্গল কনভারসেশনে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেছি। সংগত কারণেই আমি আমাদের প্রস্তুতিতে জোর দিয়েছি। এখানে রাষ্ট্র ও তার অঙ্গ প্রতিষ্ঠানগুলোকে সচল করার পাশাপাশি দক্ষ ও জনগণের চাহিদামুখী করে তোলার বিকল্প নেই। মার্কেটই সব সমস্যার সমাধান দেবে– সেই দিন এখন পার হয়ে গেছে; বাজার একা সব সমস্যার সমাধান করতে পারে না। সে জন্য রাষ্ট্র, মার্কেট, সমাজ সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে এবং লক্ষ্য অর্জনে নিজেদের দক্ষতা বাড়াতে হবে।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বলতে গেলে আমরা অতীতে গড়ে ওঠা কিছু প্রশাসনিক কাঠামোর এখনও যথেষ্ট সংস্কার করতে পারিনি। আমলাতন্ত্র নিজেও বেশ বড় ও জটিল ব্যবস্থা। আমাদের দেশে অন্যতম প্রধান সমস্যা হলো সময়ের সদ্ব্যবহারের অভাব। ব্যবসায়ী বা সাধারণ মানুষের কাছেও সময়ের মূল্য রয়েছে। কিন্তু আমাদের দেশে আমলাতন্ত্রের মনোভাব এমন– সময় যেন এক অসীম সম্পদ! সিদ্ধান্ত আজ না হলেও কাল হবে। কাল না হলে পরশু হলে যেন সমস্যা নেই। অথচ একজন ব্যবসায়ী, সাধারণ মানুষ বা সেবাগ্রহীতা নাগরিকের আজই সমাধান প্রয়োজন। দ্রুততম সময়ে সমাধান দেওয়ার এই মানসিকতার বড্ড অভাব।

আমাদের তরুণ প্রজন্ম অত্যন্ত উদ্যমী এবং তৃণমূল পর্যায়ে তাদের উদ্ভাবনী শক্তি প্রতিনিয়ত বিকশিত হচ্ছে। কিন্তু প্রশাসনিক দীর্ঘসূত্রতার কারণে তারা থমকে যায়। হয়রানিই আমাদের নিত্যদিনের অভিজ্ঞতা। তার মানে, আপনি যা প্রত্যাশা করছেন, সেই কাঙ্ক্ষিত ফল পাচ্ছেন না।

বিশ্ববিদ্যালয় থেকে চার বছরের পড়াশোনা শেষ করা শিক্ষিত তরুণরা উপযুক্ত চাকরি পাচ্ছে না। এখানে সমস্যা কেবল তরুণদের একার নয়; কর্মসংস্থান সৃষ্টির দায়িত্ব উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীদেরও। আমাদের তরুণদের মধ্যে কিছু দক্ষতার ঘাটতি নিশ্চয় রয়েছে। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা অনেকটা মুখস্থ বিদ্যার ওপর নির্ভর করে গড়ে উঠেছে এবং বাস্তব বিশ্বের সঙ্গে এর সংযোগ কম। মার্কেট কীভাবে পরিচালিত হয়, সে সম্পর্কে অনেক শিক্ষার্থীরই স্পষ্ট ধারণা থাকে না।

তবে আমাদের তরুণরা জন্মগতভাবেই অত্যন্ত মেধাবী। আমরা সে জন্য ইতিবাচক উদাহরণও সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছি। করোনাকালে যখন সবাইকে পড়াশোনা ও যোগাযোগের জন্য ইন্টারনেটের ওপর নির্ভর করতে হয়েছিল, তখন আমাদের তরুণরা ফ্রিল্যান্সিংয়ের মতো সুযোগকে দ্রুত আঁকড়ে ধরেছিল। বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে বসেও একজন তরুণ অস্ট্রেলিয়ার কোনো প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইট ডিজাইন করে আয় করছে। এভাবে আজ দেশে বিশাল এক ফ্রিল্যান্সার গোষ্ঠী গড়ে উঠেছে। তরুণদের এগিয়ে যাওয়ার মানসিকতা রয়েছে; কিন্তু অনুমোদন প্রক্রিয়া, প্রশাসনিক জটিলতা ও আমলাতান্ত্রিক ধীরগতির কারণে তারা বাধাগ্রস্ত হয়। এ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন ও পরিবর্তন অত্যন্ত জরুরি।

কমনওয়েলথভিত্তিক কানেক্টিভিটি, কমার্স অ্যান্ড কম্পিটিশনের ক্ষেত্রে আমি চারটি পরামর্শ দিতে চাই। প্রথম পরামর্শ, দয়া করে নস্টালজিয়া বা অতীতের স্মৃতি কিংবা মোহের প্রতি মুগ্ধতা ছাড়ুন এবং আপনার জন্য নতুন লক্ষ্য বা মিশন খুঁজে বের করুন। দ্বিতীয়টি হলো, তরুণদের ওপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করুন। বিশ্বজুড়ে এমন তরুণ প্ল্যাটফর্ম তৈরি করুন যেখানে তারা নিজেদের সংযুক্ত করতে পারে, নিজস্ব মেধার প্রকাশ ও দক্ষতার বিকাশ ঘটাতে পারে।

তৃতীয় পরামর্শটি বিশ্ব পরিস্থিতি নিয়ে। আমরা সারাবিশ্বে এক ধরনের নৈতিক অবক্ষয় বা পতন লক্ষ্য করছি। আমার মনে হয়, কমনওয়েলথ বিশ্বজুড়ে নীতি ও নৈতিক অবস্থানের গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হিসেবে নিজেকে নতুন করে পুনর্গঠন করতে পারে। আর চতুর্থ পরামর্শটি হলো, ইন্টারএকশন ও এক্সচেঞ্জ বাড়ানো। ব্যবসা বাণিজ্যের ক্ষেত্রে এটি জরুরি। কমনওয়েলথ দেশগুলোর মধ্যে একটি সাধারণ বিষয় আছে। তা হলো ইংরেজি ভাষা। তাই আমি আমাদের রাষ্ট্রপ্রধানদের কেবল ব্যবসায়িক মিথস্ক্রিয়াই নয়, বরং পেশাজীবীদের মধ্যেও পারস্পরিক আদান-প্রদান সহজ করার পরামর্শ দেব। এখানে স্থপতি হতে পারে। পাশাপাশি আইনজীবী, চিকিৎসক, হিসাবরক্ষকসহ আরও অনেক ধরনের পেশাজীবী রয়েছেন। দেখা যায়, যখনই আমরা যোগাযোগের (কানেক্টিভিটি) কথা বলি; বাণিজ্যের কথা তুলে ধরি। কিন্তু আজকের বিশ্বে পেশাজীবীদের অবাধ যাতায়াত এবং আত্মউন্নয়নের সক্ষমতা তৈরিতে এমন জরুরি খাত চরমভাবে উপেক্ষিত রয়ে গেছে। রাষ্ট্রপ্রধানরা এ বিষয়টির ওপর বিশেষভাবে জোর দিতে পারেন।
পাশাপাশি বিনিয়োগের কথা বলা দরকার। আমরা বিদেশি বিনিয়োগ আনতে নানা কিছু করছি। কিন্তু আমার মনে হয়, দেশীয় বিনিয়োগকারীদের ওপর সবচেয়ে বেশি জোর দেওয়া উচিত। কারণ তারাই বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছে সঠিক বার্তা পৌঁছে দিতে পারেন। সরকার সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগকারীদের বার্তা দিলে তা খুব একটা কাজে দিচ্ছে না। অথচ দেশীয় বিনিয়োগকারীরা অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে তাদের কাছে পরিস্থিতি তুলে ধরতে পারেন। তাই আমার পরামর্শ– প্রথমে দেশীয় বিনিয়োগকারীদের ওপর নজর দিন এবং তাদের মাধ্যমে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করুন। কারণ দেশীয় উদ্যোক্তাদের আন্তর্জাতিক যোগাযোগ রয়েছে এবং তারা বহির্বিশ্বের কাছে অনেক বেশি নির্ভরযোগ্য বার্তা দিতে পারবেন। দেশীয় বিনিয়োগকারীদের আস্থায় আনলে বিদেশিরাও আসবে। 

সব মিলিয়ে অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য শুধু আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সংযোগ বাড়ানোই যথেষ্ট নয়; সেই সংযোগকে কার্যকরভাবে কাজে লাগানোর মতো অভ্যন্তরীণ সক্ষমতাও তৈরি করতে হবে। প্রশাসনিক সংস্কার, সিদ্ধান্ত গ্রহণে গতি, তরুণদের দক্ষতা ও উদ্ভাবনী শক্তির বিকাশ, পেশাজীবীদের আন্তর্জাতিক যোগাযোগ এবং দেশীয় বিনিয়োগকারীদের আস্থা– সবকিছুর সমন্বয়েই তৈরি হতে পারে একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক পরিবেশ। আর সেই পরিবেশ তৈরি হলে আঞ্চলিক সংযোগ কেবল যোগাযোগের পথ নয়, বরং বাণিজ্য, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির কার্যকর সেতুতে পরিণত হবে।

ড. হোসেন জিল্লুর রহমান: অর্থনীতিবিদ; এক্সিকিউটিভ চেয়ারম্যান, পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি)

আরও পড়ুন

×