অন্যদৃষ্টি
ঘোড়ার মাংস বিক্রি করছে কারা?
বিভূতি ভূষণ মিত্র
প্রকাশ: ১০ অক্টোবর ২০২৬ | ০৭:৩৬
| প্রিন্ট সংস্করণ
বাংলাদেশে বাণিজ্যিকভাবে ঘোড়ার মাংস বিক্রি আইনত নিষিদ্ধ। ২০১১ সালের ‘পশু জবাই ও মাংস মান নিয়ন্ত্রণ আইন’ অনুযায়ী যে কোনো পশুর স্বাস্থ্য পরীক্ষা, উপযুক্ত সনদ এবং সরকারের নির্দিষ্ট কসাইখানা বা কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ছাড়া বাণিজ্যিকভাবে পশু জবাই ও মাংস বিক্রি করা দণ্ডনীয়। তবে ঘোড়া জবাইয়ের ক্ষেত্রে এই ধরনের সরকারি অনুমোদন দেওয়া হয় না।
নিষিদ্ধ হওয়ার পরও বাংলাদেশের বেশ কিছু জায়গায় ঘোড়া জবাইয়ের খবর দেখা গেছে। গত সেপ্টেম্বর মাসে মানিকগঞ্জে ১৩টি ঘোড়া জবাই করে মাংস প্রক্রিয়াজাত করার অপরাধে ৯ জনকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
সম্প্রতি শেরপুরের ঝিনাইগাতীতে মধ্যরাতে তিনটি ঘোড়া জবাই করে মাংস বিক্রির অভিযোগ উঠেছে। গত আগস্ট মাসের ঘটনা এটি। স্থানীয়রা পুলিশকে খবর দেয়। তাদের অভিযোগ, গুতামিয়া নামের এক ব্যক্তিসহ একটি চক্র ঘোড়াগুলো জবাই করে মাংস বিক্রির প্রস্তুতি নিচ্ছিল। পরে পুলিশ ঘোড়ার মাংসের নমুনাসহ বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ করে।
গত এপ্রিল মাসে দিনাজপুরে ৬টি ঘোড়া জবাই করার ঘটনা ঘটেছে। এই ঘটনায় নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট তিনজনকে এক বছরের কারাদণ্ড দেয়। একই মাসে মুন্সীগঞ্জের গজারিয়ায় একটি পরিত্যক্ত ঘরে ১৩টি ঘোড়া জবাইয়ের ঘটনা ঘটে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, প্রায় ৬ মাস ধরে এলাকায় এই ধরনের রহস্যময় কাজ চলছিল।
যুক্তরাষ্ট্রসহ বেশ কয়েকটি দেশে ঘোড়া জবাই ও এর মাংস প্রক্রিয়াজাতকরণ আইনত নিষিদ্ধ। ঘোড়াকে তারা গৃহপালিত বা সঙ্গী প্রাণী হিসেবে বিবেচনা করে। তবে জাপানসহ বেশ কিছু দেশে এবং ইউরোপের কিছু নির্দিষ্ট অঞ্চলে ঘোড়ার মাংসের প্রচলন রয়েছে। এসব দেশে রপ্তানিও হয়।
আমেরিকায় ঘোড়ার মাংস বিক্রি নিষিদ্ধ। এখানকার কসাইখানাগুলোতে কঠোরভাবে এই নিয়ম পালন করতে দেখা যায়। কেননা আমেরিকায় ঘোড়াকে গরু, ছাগল বা ভেড়ার মতো সাধারণ গবাদি পশু হিসেবে দেখা হয় না। তারা এটিকে প্রিয় প্রাণী হিসেবে দেখে। প্রিয় বিড়াল বা প্রিয় কুকুরের মতো ঘোড়াকে তারা বিশ্বস্ত ও সহচর প্রাণী হিসেবে দেখে। শ্রদ্ধাবোধের জায়গা থেকে ঘোড়ার মাংস খাওয়ার বিষয়কে সামাজিকভাবে অত্যন্ত ঘৃণিত কাজ হিসেবে ধরা হয়। আরেকটি কারণ হচ্ছে, ঘোড়াকে লালনপালন করার সময় তারা বেশ কিছু শক্তিশালী ওষুধ যেমন পেইন কিলার ফিনাইলবিউটাজোন এবং উচ্চমাত্রার অ্যান্টিবায়োটিক দেন। এটি মানুষের শরীরে গেলে স্বাস্থ্যের ওপর অত্যন্ত ক্ষতিকর ও গুরুতর প্রভাব ফেলতে পারে। এছাড়া প্রাণী অধিকার সংগঠনগুলো ঘোড়া জবাইয়ের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিতে বলেছে। আমেরিকায় সর্বশেষ ঘোড়ার কসাইখানা দেখা গেছে ২০০৭ সালে। পরে মার্কিন কংগ্রেসে এমন আইন প্রণয়ন করা হয় যে সেখানকার কোথাও সরকারি পরিদর্শন ছাড়া বাণিজ্যিকভাবে কোনো মাংস বিক্রি করা অসম্ভব।
বাংলাদেশে ‘পশু জবাই ও মাংসের মান নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১১’ অনুযায়ী যত্রতত্র বা উন্মুক্ত স্থানে পশু জবাই করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। সরকার বা স্থানীয় কর্তৃপক্ষের অনুমোদিত কসাইখানা ছাড়া কোনো পশু জবাই করা যাবে না। ভেটেরিনারি সার্জন বা দক্ষ পরিদর্শক দ্বারা জবাইয়ের আগে স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা বাধ্যতামূলক। কেননা জবাই করা পশুটি রোগাক্রান্ত কিনা, এটি মানব স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ কিনা এবং প্রাণীটি গর্ভবতী কিনা এটা দেখা দরকার। মাংস কাটার স্থান, ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি ও সংরক্ষণ প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ স্বাস্থ্যসম্পন্ন ও জীবাণুমুক্ত হতে হবে। এই আইন বা বিধিমালা লঙ্ঘন করলে জরিমানা, জেল বা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে। আইন থাকার পরও বিভিন্ন জায়গায় ঘোড়া জবাইয়ের মতো ঘটনা প্রায়ই ঘটছে। এসব উদ্বেগজনক। সরকার ও স্থানীয় প্রশাসনকে এসব ব্যাপারে আরও সোচ্চার হওয়া জরুরি।
ড. বিভূতি ভূষণ মিত্র: পরিবেশ বিষয়ক লেখক
- বিষয় :
- অন্যদৃষ্টি