ঢাকা রোববার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬

অন্যদৃষ্টি

গাইড বইয়ের বিকল্প সম্ভব

গাইড বইয়ের বিকল্প সম্ভব
×
×

জাহাঙ্গীর হোসেন

প্রকাশ: ১১ অক্টোবর ২০২৬ | ০৭:১৮

| প্রিন্ট সংস্করণ

প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষাস্তরে পাঠ্যপুস্তকের বাইরে গাইড বা সহায়ক বই শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের কাছে যেন একটা অনিবার্য উপাদান। কোনোক্রমে যেন শিক্ষার্থীরা গাইড বই ব্যতিরেকে পাঠ চুকাতে পারছে না। ফলে বাজারে বিভিন্ন প্রকাশনীর গাইড বইয়ের ব্যবসা বেশ রমরমা। এ কারণে প্রকাশনীর নানাবিধ কৌশলের বেড়াজালে আটকে আছে দেশের কোটি কোটি শিক্ষার্থী। অথচ শিক্ষা কার্যক্রম যাতে গাইড বইনির্ভর না হয় তার জন্য সরকারের নির্দেশনা রয়েছে। এর বাইরে গাইড বইয়ের ব্যাপারে রয়েছে অনেক সমালোচনা। গাইড বই তো বাংলাবাজার কিংবা দেশের কোনো না কোনো এলাকায় প্রকাশ পাচ্ছে। এ ঘটনা তো গোপন নয়। তাহলে গাইড বই প্রকাশ অবধারিত করতে কারা গোপনে কড়া নাড়ছে?

সহায়ক বই বিক্রিতে শুধু প্রকাশনীসহ খুচরা বিক্রেতারা যে লাভবান হচ্ছে, তা কিন্তু নয়। এর সঙ্গে সম্পৃক্ত আছেন শিক্ষকরা। তারা তাদের প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীর সংখ্যা হারে প্রকাশনী কিংবা লাইব্রেরির মাধ্যমে উপঢৌকন নিচ্ছেন। এর একটি অংশ শিক্ষক-কর্মচারীরা পাচ্ছেন, আরেকটি অংশ প্রধান শিক্ষক এবং ক্ষেত্রবিশেষে ম্যানেজিং কমিটির সদস্যরাও পেয়ে থাকেন। 

পাঠ্যপুস্তকে সৃজনশীল প্রশ্ন ও কিছু বহু নির্বাচনী প্রশ্নের নমুনা দেওয়া থাকে। শিক্ষার্থীরা প্রথমেই এসব প্রশ্নের সমাধান করে থাকে এবং এগুলোকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করে। সে কারণে এই নমুনা প্রশ্ন কিছু বাড়িয়ে দেওয়া দরকার। পরীক্ষায় পাঠ্যপুস্তকের নমুনা প্রশ্ন না দেওয়াই উচিত। কারণ প্রশ্নের ধরন বুঝতে এবং সমাধানের সক্ষমতা অর্জনে নমুনা প্রশ্ন পাঠ্যপুস্তকের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকুক। আমরা হামেশাই দেখে থাকি, বিদ্যালয়ের অর্ধবার্ষিক এবং বার্ষিক পরীক্ষার প্রশ্নপত্রে বাজারের গাইড বই থেকে হুবহু উদ্দীপকসহ নমুনা প্রশ্ন দেওয়া হচ্ছে। তাই শিক্ষার্থীরা বরাবরই গাইড বইয়ের অসংখ্য প্রশ্নের উত্তর মুখস্থ করতে সময় দিচ্ছে। এতে সৃজনশীল মেধা বিকাশ ব্যাহত হচ্ছে। ফলে শিখনের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জন হচ্ছে না। এর থেকে উত্তরণের পথ হলো পাঠ্যপুস্তকে প্রশ্নের সমাধানসহ ও সমাধানবিহীন অন্তত ১৫টি প্রশ্ন অধ্যায়ভিত্তিক যুক্ত করে দেওয়া।

সরকার প্রদত্ত বাংলা ও ইংরেজি ব্যাকরণ বইয়ে পর্যাপ্ত রসদ না থাকায় এ দুটোর প্রাসঙ্গিক বই বাজার থেকে কিনতে হচ্ছে। বিশেষ করে ইংরেজি গ্রামারে যেসব উপাদান দেওয়া হচ্ছে, তা খুবই অপ্রতুল। এ সমস্যা সমাধানে অনুশীলন পর্যাপ্ত করার রসদ দিতে হবে এবং ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত ইংরেজির বাংলা অনুবাদ করে দিলে শিক্ষার্থীদের পাঠোদ্ধার করতে সুবিধা হবে। পাশাপাশি ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত  ইংরেজি প্রথম পত্রের পেসেজগুলোর বাংলা অনুবাদও জরুরি। প্রসঙ্গক্রমে বলতে হয়, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা ও ভারতেও মূল বইয়ের বাইরে সহায়ক বই শ্রেণিকক্ষে যুক্ত করে শিখন-শেখানো কাজ সুগঠিত করা হচ্ছে। এগুলোকে স্টাডি বুক হিসেবে ধরা হয়। 

এখানে আলোচনা প্রয়োজন, বাংলাদেশের মতো একটি গরিব রাষ্ট্রের অধিকাংশ মানুষ গরিব। শিক্ষার ব্যয়ভার নির্বাহ করতে খাদ্য জোগান দিতে ব্যাপক হিমশিম খেতে হচ্ছে। দেশের গরিব শিক্ষার্থীরা মাধ্যমিক পর্যায়ের গাইড বই তিন হাজার থেকে পাঁচ হাজার টাকা দিয়ে চড়া মূল্যে কিনে রীতিমতো সর্বস্বান্ত হচ্ছে। অনেক শিক্ষার্থী বই কিনতে না পেরে লেখাপড়া থেকে বিচ্যুত হচ্ছে। বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়ছে কোমলমতি শিক্ষার্থীরা। তাহলে প্রতিবছর রাষ্ট্রের হাজার কোটি টাকার বেশি খরচ করা অনর্থক নয় কি? সরকারের এমন সরল উদ্দেশ্য কেবল বেহাত হচ্ছে না, গোটা শিক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংসের একটা অন্যতম উপলক্ষ বটে। সরকার কর্তৃক গাইড বইয়ের অভাব দূর করতে হবে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণের মধ্য দিয়ে। উপরোক্ত যে প্রস্তাব করা হলো, এর চেয়ে আরও জুতসই পদক্ষেপ গ্রহণ করলে অবশ্যই সাধুবাদ জানাব। 

জাহাঙ্গীর হোসেন: সভাপতি, বাংলাদেশ মাধ্যমিক সহকারী শিক্ষক সমিতি, কেন্দ্রীয় কমিটি

আরও পড়ুন

×