অন্যদৃষ্টি
সড়কে প্রাণহানির দায়
এস এম আজাদ হোসেন
প্রকাশ: ১২ অক্টোবর ২০২৬ | ১০:৩১
সড়কের নকশা ত্রুটিপূর্ণ হলে, বিপজ্জনক স্থান দীর্ঘদিন সংস্কারহীন থাকলে, গণপরিবহনের চালককে অতিরিক্ত কর্মঘণ্টায় গাড়ি চালাতে হলে কিংবা পথচারীর নিরাপদ পারাপারের সুযোগ না থাকলে তার দায় নির্ধারণ হবে কীভাবে? বিদ্যমান আইন কি এসব ক্ষেত্রে যথেষ্ট স্পষ্ট দায়িত্ব ও জবাবদিহি নিশ্চিত করে?
এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার মধ্যেই বাংলাদেশের জন্য পৃথক ও সমন্বিত সড়ক নিরাপত্তা আইন প্রণয়নের যৌক্তিকতা নিহিত। নতুন আইন প্রয়োজন কিনা– সেই সিদ্ধান্ত কেবল বিদ্যমান আইনের নাম বা সংখ্যা দেখে নেওয়া যাবে না। দেখতে হবে নাগরিকের জীবন রক্ষায় রাষ্ট্র ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়িত্ব কতটা সুস্পষ্ট, দুর্ঘটনা প্রতিরোধের বাধ্যবাধকতা কতটা কার্যকর এবং দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলে জবাবদিহির ব্যবস্থা কতটা বাস্তব।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশে সাত হাজার ৫৮৪টি সড়ক দুর্ঘটনায় সাত হাজার ৩৫৯ জন নিহত এবং ১৬ হাজার ৪৭৬ জন আহত হয়েছেন। ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরের চিত্রও উদ্বেগজনক। রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের হিসাবে, ওই মাসে ৪৪২টি দুর্ঘটনায় ৪২৩ জন নিহত এবং ৬৭৪ জন আহত হয়েছেন। এই পরিসংখ্যানের তাৎপর্য শুধু মৃত্যুর সংখ্যা নয়। নিয়ন্ত্রণ হারানো, পথচারীকে ধাক্কা দেওয়া কিংবা মুখোমুখি সংঘর্ষের মতো ঘটনাগুলোর পেছনে গতি, সড়কের নকশা, দৃশ্যমানতা, যানবাহনের অবস্থা, চালকের ক্লান্তি এবং ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার ভূমিকা থাকতে পারে। প্রতিটি দুর্ঘটনার কারণ আলাদাভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন। বাংলাদেশে সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮ রয়েছে। চালকের লাইসেন্স, যানবাহন পরিচালনা, বিভিন্ন অপরাধ ও শাস্তির বিধানও রয়েছে। পাশাপাশি সড়ক নির্মাণ, রক্ষণাবেক্ষণ, যানবাহনের কারিগরি মান, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা ও জরুরি চিকিৎসার সঙ্গে সম্পর্কিত একাধিক আইন, বিধি ও নীতিমালা কার্যকর। ফলে সমস্যাটিকে শুধু আইন নেই বলে ব্যাখ্যা করা যাবে না।
প্রকৃত প্রশ্ন হলো, এসব আইন ও প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সড়ক নিরাপত্তার সামগ্রিক লক্ষ্য কতটা সমন্বিত এবং প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব কতটা পরিমাপযোগ্য। কোনো বিপজ্জনক মোড় বারবার দুর্ঘটনার কারণ হলে সেটি শনাক্ত ও সংশোধনের চূড়ান্ত দায়িত্ব কার? নতুন সড়ক চালুর আগে নিরাপত্তা নিরীক্ষা না হলে তার দায় কার? গণপরিবহনের চালক নির্ধারিত কর্মঘণ্টার বাইরে কাজ করলে চালক ছাড়াও মালিক বা পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব কী? আহত ব্যক্তিকে দ্রুত উদ্ধার ও চিকিৎসা দেওয়ার ক্ষেত্রে কোন প্রতিষ্ঠানের কী বাধ্যবাধকতা থাকবে? এসব প্রশ্নের উত্তর বিচ্ছিন্ন বিধানের ওপর ছেড়ে না দিয়ে একটি সমন্বিত কাঠামোয় স্পষ্ট করা প্রয়োজন।
নতুন সড়ক চালুর আগে নিরাপত্তা নিরীক্ষা, ঝুঁকিপূর্ণ স্থান নিয়মিত পর্যালোচনা এবং শনাক্ত ত্রুটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সংশোধনের বিধান থাকতে হবে। দুর্ঘটনাপ্রবণ স্থানে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কিনা, তা যাচাইয়েরও নিয়ম থাকতে হবে। যানবাহনের প্রকৃত ফিটনেস, নিরাপত্তা বৈশিষ্ট্য, চালকের প্রশিক্ষণ, কর্মঘণ্টা ও বিশ্রাম নিশ্চিত করতে হবে। চালক অপরাধ করলে তার বিচার হবে; তবে প্রমাণ থাকলে মালিক বা পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানের অবহেলাও তদন্তের আওতায় আসতে হবে। পুলিশ, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ, হাসপাতাল, ফায়ার সার্ভিস, সড়ক নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণকারী সংস্থা এবং স্থানীয় সরকারের তথ্য সমন্বিত করার জন্য কার্যকর জাতীয় তথ্যভান্ডার প্রয়োজন। জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা সেলকে যথাযথ ক্ষমতা, অর্থায়ন, জনবল ও জবাবদিহি দিয়ে শক্তিশালী করতে হবে। নতুন কর্তৃপক্ষ গঠনের আগে কাঠামোর ঘাটতি মূল্যায়ন জরুরি।
জরুরি সাড়াদানের দায়িত্ব, উদ্ধারসেবার সমন্বয়, হাসপাতালে পৌঁছানোর সময় এবং আহত ব্যক্তির চিকিৎসা পাওয়ার পথে বিলম্ব কমানোর বিষয়গুলোও আইনি কাঠামোয় আনতে হবে।
এস এম আজাদ হোসেন: নিরাপদ সড়ক চাই-এর সাবেক মহাসচিব
- বিষয় :
- অন্যদৃষ্টি