অন্যদৃষ্টি
কর্মসংস্থান ও নারীর আত্মবিশ্বাস
মাহজাবিন আলমগীর
প্রকাশ: ১৩ অক্টোবর ২০২৬ | ০৭:২১
| প্রিন্ট সংস্করণ
আইএলওর প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশে উচ্চশিক্ষিত নারীদের মাত্র ৫ শতাংশ কর্মজীবী। যেখানে দেখা যাচ্ছে কেবল নারীদের অংশগ্রহণই কম নয়; একই ধরনের কাজে পুরুষদের তুলনায় নারীরা ২২ থেকে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত কম মজুরি পান। সব ক্ষেত্রে নারীদের সমান বলা হলেও গৃহস্থালি আর সন্তানের দেখাশোনার মতো গুরুদায়িত্ব পালন করতে গিয়ে অনেক নারী উচ্চশিক্ষিত হয়েও কর্মজীবনে প্রবেশের সুযোগ পান না। আগের দিনে ভাবা হতো, নারীরা শিক্ষিত হলেই যথেষ্ট। আজকের প্রতিযোগিতামূলক বাজারে নারীদের কর্মজীবনে প্রবেশ করা শুধু প্রয়োজন নয়, যুগের প্রয়োজনে অনেকটাই জরুরি। কারণ একজন নারী অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়া একমাত্র কর্মজীবনে প্রবেশের মাধ্যমেই সম্ভব। সে জন্য প্রয়োজন নারীদের কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি ও তার যথার্থ সদ্ব্যবহার। অথচ আমাদের আশপাশে এমন অনেক উচ্চশিক্ষিত নারীকে আমরা দেখতে পাই, যারা শুধু পরিবারের যথাযথ সমর্থনের অভাবে কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করতে পারছেন না।
তা ছাড়া কর্মক্ষেত্রে নানা প্রকার হয়রানি, যাতায়াতের ভালো সুযোগের অভাব, গণপরিবহনের ভোগান্তি ইত্যাদি বিষয় নারীদের কর্মক্ষেত্রে প্রবেশের সুযোগকে সীমিত করে। আবার সামাজিক কিছু রক্ষণশীলতার কারণে চিকিৎসক, শিক্ষিকা, সেবিকা কিংবা উদ্যোক্তা ছাড়া পুরুষদের মতো বহুমুখী পেশায় নারীদের অংশগ্রহণের সুযোগ কম।
গবেষণায় দেখা গেছে, ব্যবস্থাপনা খাতে নারীদের অংশগ্রহণ খুবই কম।
আবার মজুরির ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের বৈষম্য সুস্পষ্ট। নিম্ন মজুরির কাজগুলোতে নারীদের অংশগ্রহণের প্রধান কারণ সাংসারিক বহুমুখী কাজের চাপ। গৃহস্থালি কাজের দায়িত্ব পুরুষরা সাধারণত নিতেই চায় না। নারী-পুরুষের মজুরির ব্যবধানের পেছনেও অনেকটা সমাজের কাঠামোগত ও প্রাতিষ্ঠানিক কারণগুলো দায়ী। একই কাজ করে নারী ও পুরুষ সমান মজুরি পাচ্ছেন না।
নারীদের অর্থনৈতিক স্বাধীনতা ও মজুরির সমতা নিশ্চিতকরণে কর্মক্ষেত্রে নারীর জন্য হয়রানিমুক্ত পরিবেশ তৈরি করা জরুরি। পাশাপাশি নারীরা যেন অবাধে কর্মজীবনে প্রবেশ করতে পারেন, সে জন্য শহরাঞ্চলে ডে-কেয়ার সেন্টারের সংখ্যা বাড়ানো দরকার। কেননা, যৌথ পরিবার ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় শহরাঞ্চলে কর্মজীবী নারীরা শিশুসন্তানের দেখভাল নিয়ে দুশ্চিন্তায় ভোগেন। এ কারণে অনেক উচ্চশিক্ষিত নারীও কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করতে দ্বিধাগ্রস্ত হন। দেখা গেছে নানা প্রতিকূলতার কারণে গত বছর নারীদের কর্মক্ষেত্রে অংশগ্রহণ কমেছে।
২০২৫ সালের মে মাসে ইউএন জেন্ডারভিত্তিক অংশগ্রহণের দৃষ্টিকোণ থেকে এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, গত অর্থবছরে (জুলাই-ডিসেম্বর) প্রায় ২১ লাখ মানুষ চাকরিচ্যুত হয়, যার ভেতর ১৮ লাখই কর্মজীবী নারী।
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ডা. ফওজিয়া মোসলেম বলেন, পুরুষতান্ত্রিক মনোভাব, কর্মক্ষেত্রে হয়রানি বৃদ্ধি আর দুর্বল আইনি কাঠামোর কারণে কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ সীমিত হয়ে পড়েছে। পারিবারিক সহিংসতা বা ডোমেস্টিক ভায়োলেন্স আজকের যুগে যখন একটি প্রধান সামাজিক সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে, তখন নারীদের কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ জরুরি হয়ে উঠেছে। নারী যখন নিজস্ব উপার্জনে স্বাবলম্বী হয় সে তখন আর কেবল স্বামীর উপার্জনে নির্ভরশীল নয়; বরং যে কোনো পারিবারিক অন্যায়ের বিরুদ্ধে সে প্রতিবাদী হতে শেখে; পরিপূর্ণ আত্মমর্যাদা নিয়ে বাঁচতে শেখে; সংগ্রাম করতে পিছপা হয় না। নারীদের কর্মক্ষেত্র অনেক সময় তার ঘর-গৃহস্থালির বাইরে একটি নিঃশ্বাস নেওয়ার জায়গা হয়ে ওঠে। তাকে আত্মবিশ্বাসী করে তোলে এই ভেবে– ঘরে ও বাইরে সে সমান দক্ষতায় চলতে জানে।
তাই আজ সময় এসেছে পরিবর্তনের। ঘর-সংসারের দোহাই দিয়ে শিক্ষিত নারীদের কর্মজীবনে প্রবেশ থেকে যেন বঞ্চিত না করা হয়। তারাও নিজের মেধা ও ব্যক্তিত্বের বিকাশ ঘটিয়ে কর্মক্ষেত্রে সফলতা অর্জনের সুযোগ পাক, এ ব্যাপারে পরিবারের সদস্যদের পূর্ণ সমর্থন চাই। চাই নারীদের কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি।
মাহজাবিন আলমগীর: শিক্ষক
- বিষয় :
- অন্যদৃষ্টি