অন্যদৃষ্টি
কিশোরদের সুন্দর জীবন দিন
এসকে মজিদ মুকুল
প্রকাশ: ১৪ অক্টোবর ২০২৬ | ০৭:৩৭
| প্রিন্ট সংস্করণ
ভাবতে কষ্ট হয়, যে শিশু-কিশোররা মায়া-মমতার প্রতিচ্ছবি, সেই মায়া-মমতার প্রতিচ্ছবিদের এখন আতঙ্ক হিসেবে দেখা হচ্ছে। শুধু আতঙ্কের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ‘গ্যাং’ শব্দ। পত্রিকার বিভিন্ন প্রতিবেদনমতে, ঢাকায় ১৬১, চট্টগ্রামে ১৩০টিসহ অন্যান্য অঞ্চলে ৪৫৩টি কিশোর গ্যাং সারাদেশে তৎপরতা চালাচ্ছে। দিন দিন জনবল ও অস্ত্রবলে তারা বলীয়ান। তারা নামে-বেনামে সামাজিক মাধ্যমে পেজ খুলে তাদের অপরাধকর্ম ছড়িয়ে দিচ্ছে। এতে নিরপরাধ কিশোররা প্ররোচিত-প্রভাবিত হচ্ছে। যারা অপরাধকর্মের হোতা, তাদের নির্দেশনায় বিশৃঙ্খলা তৈরি করে ভয়াবহ অপতৎপরতা চালাচ্ছে।
১৮ বছরের নিচে হওয়ায় ভয়াবহ অপরাধ করেও এরা শিশু আইনের সুযোগে পার পেয়ে যায় ও যাচ্ছে। আর এই কিশোররাই প্রভাবশালীদের লাঠিয়াল বাহিনী হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। ফলে দিন দিন কিশোররা বেপরোয়া হয়ে উঠছে।
এ ছাড়া বেপরোয়া করা বা হওয়ার উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালনকারী সামাজিক মাধ্যমের অপব্যবহার অব্যাহত। বিজ্ঞানসম্মত কর্মমুখী শিক্ষাসহ সব পর্যায়ের নারী-পুরুষ, শিশু-কিশোর, তরুণ-তরুণী, যুবশক্তিকে কর্মক্ষম করে তোলার জন্য বক্তৃতা-বিবৃতি যতটা হচ্ছে, বাস্তবে ততটা কার্যকর পদক্ষেপ নেই।
কার্যকর পদক্ষেপ নেই শ্রমজীবী-কর্মজীবী-মেহনতি-গরিব-সর্বহারা মানুষের জন্য জাতীয়ভাবে বাজারদরের সঙ্গে সংগতি রেখে নিম্নতম মজুরি চাহিদা অনুযায়ী কর্মসংস্থান করার। যেটুকু আছে, তা বৈষম্য। অথচ এসব মানুষের বেশি সংখ্যক ৬৯, ৭১ ও ৯০ এবং চব্বিশের জুলাই গণঅভ্যুত্থান সফল করতে জীবন দিয়েছে।
সব মিলে নৈতিক শিক্ষা, পর্যাপ্ত মাঠসহ খেলাধুলা, সাহিত্য, সংস্কৃতিচর্চার ব্যবস্থা না থাকা; অপরাধ-অপকর্মের বিচারহীনতা ও অভিভাবকের অসচেতনায় সমাজে বিস্তার লাভ করছে অপরাধকর্ম। তার মূলেও মাদক সামগ্রী কেনাবেচা ও তার অপব্যবহার যত্রতত্র, টিকটক ও কিশোর গ্যাং– তিন সামাজিক ব্যাধিতে বিপর্যস্ত নতুন প্রজন্ম এবং সমাজ। সর্বত্রই এসবের জন্য নিরাপত্তাহীনতা জেঁকে বসেছে। এমনকি শিক্ষার্থীদেরও একটা অংশ জড়িয়ে পড়ছে এই গর্হিত কাজে। একদিকে নেশা, অন্যদিকে মাদক ব্যবসায়ীদের মাদক সামগ্রী এক স্থান থেকে আরেক স্থানে পৌঁছে দিলেই টাকার ছড়াছড়ি। এভাবেই মাদকের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে তারা।
অপরদিকে আইনের সীমাবদ্ধতায় কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা পুলিশি অভিযানে মুচলেকার মাধ্যমে ছাড়া পাচ্ছে। ভদ্র-শিক্ষিত প্রভাবশালী পরিবারের কিশোরদের প্রতি শ্রেণিগত কারণে বা ক্ষমতার দাপটে তারা পার পেয়ে যাচ্ছে।
অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বেশ আগে র্যাবের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের পরিচালকের বক্তব্য উদ্বৃত করে লিখেছিলেন– ‘সব অপরাধের মূলে মাদক। মাদককে কেন্দ্র করেই কিশোর গ্যাং এবং টিকটক লাইক গ্রুপ তৈরি হয়েছে। সমাজজীবনের বিভিন্ন পর্যায়ের এক শ্রেণির লোকই তৈরি হয়েছে, যারা সব ধরনের অপরাধে জড়িত।’
তাই রাজনীতিবিদদের জন্য এখনই সময় দেশের স্বার্থে ভয়ংকর এই সামাজিক অবক্ষয় থেকে দেশের শান্তিপ্রিয় মানুষের জীবনে স্বস্তি ফিরিয়ে দেওয়ার সামন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করার। প্রতিটি পরিবারকে কিশোররা কার সঙ্গে মিশছে, কোথায় যাচ্ছে, মোবাইল-ইন্টারনেটে কী করছে, কী দেখছে তা অত্যাবশ্যকীয় ‘শর্ত’ হিসেবে তদারক করতে হবে। এ জন্য পরিবার, সমাজ, রাজনীতিবিদ, রাষ্ট্র তথা প্রশাসনের সমন্বিতভাবে পদক্ষেপ গ্রহন করা জরুরি।
মনে রাখতে হবে– শ্রেণি বৈষম্যের সমাজ ব্যবস্থায় পুলিশি অভিযান ও শাস্তিতে ভয়াবহ এই চক্র নির্মূল হবে না। বরং উপরোক্ত বর্ণনার পাশাপাশি দরিদ্রতা, ক্ষুধার যন্ত্রণা, অবিচার, অবহেলাসহ সামাজিক অবক্ষয় রোধ করতে হবে। যাতে এহেন দুঃখ-কষ্ট-যন্ত্রণা কিশোরদের অপরাধ জগতের দিকে ঠেলে না দেয়। কারণ একমুঠো ভাত একটু মিষ্টি কথার আদর, কটা টাকা আর একটু খাবার দিয়ে অসহায় কিশোরদের ভেড়ানো হচ্ছে অপরাধ চক্রে। সেহেতু ক্ষুধা ও দরিদ্রতামুক্ত সমাজব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে নতুন সমাজের গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠন করতে হবে।
এসকে মজিদ মুকুল: মুক্তিযোদ্ধা ও কলাম লেখক
[email protected]
- বিষয় :
- অন্যদৃষ্টি