ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

টার্গেট ডিসেম্বর

রাজপথে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছে ঐক্যফ্রন্ট

রাজপথে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছে ঐক্যফ্রন্ট
×

লোটন একরাম

প্রকাশ: ৩১ অক্টোবর ২০১৯ | ১৩:৩৭

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের এক বছর পূর্তিকে সামনে রেখে রাজপথে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। নির্বাচন অনুষ্ঠানের দিনকে 'গণতন্ত্র হত্যা দিবস' হিসেবে পালন করবে তারা। বর্তমান সরকারের পদত্যাগ ও 'জাতীয় সরকারের' অধীনে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ পুনর্নির্বাচনের দাবিতে আন্দোলনের কর্মসূচি দেবে এ জোট। 'ভোট কারচুপির দিন' আখ্যা দিয়ে ৩০ ডিসেম্বর ঢাকায় বড় ধরনের প্রতিবাদ সমাবেশ করবে তারা।

এ প্রতিবাদ সমাবেশের জন্য অনুমতি চেয়ে না পেলে ঐক্যফ্রন্ট প্রয়োজনে প্রশাসনকে উপেক্ষা করবে। প্রশাসনের অনুমতির জন্য অপেক্ষা না করে রাজপথেই সমাবেশ করবে। এর আগে তারা দাবির সপক্ষে জনমত তৈরি করতে ও কেন্দ্রীয় প্রতিবাদ সমাবেশকে সফল করতে নভেম্বর থেকে বিভাগীয় শহরগুলোয় সমাবেশ করবে। এ প্রসঙ্গে ঐক্যফ্রন্টের স্টিয়ারিং কমিটির সদস্য ডা. জাফরুল্লাহ্‌ চৌধুরী সমকালকে জানান, কারচুপির নির্বাচন বাতিল করে জাতীয় সরকারের অধীনে নতুন নির্বাচনের দাবিতে তারা রাজপথে নামবেন। ডিসেম্বরে ঢাকায় সমাবেশ করতে সরকারের অনুমতির অপেক্ষায় থাকবেন না তারা।

পরিবর্তন আসছে স্টিয়ারিং কমিটিতে :আন্দোলনের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে ঐক্যফ্রন্ট তাদের জাতীয় স্টিয়ারিং কমিটির কাঠামোয় পরিবর্তন আনছে। ঐক্যফ্রন্টের পাশাপাশি শরিক দলগুলোর বিভিন্ন স্তরের কমিটিও পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দলগুলোর কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত পুনর্গঠন করা হচ্ছে। ঐক্যফ্রন্টের সঙ্গে বিএনপি নেতাকর্মীদের 'দূরত্ব' কমাতে শিগগির কারাবন্দি খালেদা জিয়াকে দেখতেও হাসপাতালে যাবেন ফ্রন্টের শীর্ষ নেতারা।

নাম প্রকাশ না করে বিএনপির একজন শীর্ষ নেতা জানান, ঐক্যফ্রন্টকে শক্তিশালী ও গতিশীল করতে স্টিয়ারিং কমিটিতে বিএনপির দুই শীর্ষস্থানীয় নেতা স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন ও ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদকে যুক্ত করে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে।

শীর্ষ নেতারা বৈঠকে বসছেন :চলমান দুর্নীতিবিরোধী অভিযানে ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের গ্রেপ্তার ইস্যুটিকে সামনে এনে সামগ্রিক ব্যর্থতার দায়ে সরকারের পদত্যাগের এবং বর্তমান রাজনৈতিক সংকট মোকাবিলায় জাতীয় সরকার গঠনের দাবিকে আরও জোরালো করতে চাইছে ঐক্যফ্রন্ট। আন্দোলনের 'রোডম্যাপ' তৈরি করতে আগামী দু-একদিনের মধ্যেই জোটের স্টিয়ারিং কমিটি বৈঠকে বসবে। বৈঠকে আগামী দিনের কর্মসূচি চূড়ান্ত করা হবে।

বৈঠকে ইস্যুভিত্তিক বিভিন্ন কর্মসূচিও নেওয়া হবে। বিশেষ করে বুয়েট শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ হত্যার প্রতিবাদে 'রক্তে লেখা' দেড় কিলোমিটার দীর্ঘ একটি জাতীয় পতাকায় সারাদেশ থেকে স্বাক্ষর সংগ্রহ করা হবে। দাবির পক্ষে স্বাক্ষরযুক্ত পতাকাটি ঢাকার রাজপথে প্রদর্শন করে কর্মসূচি পালন করা হবে। জনস্বার্থবিরোধী ইস্যুগুলোতেও কর্মসূচি দিয়ে মাঠে সরব থাকার চেষ্টা করবে এ জোট।

বৈঠকে কারাবন্দি বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে হাসপাতালে দেখতে জোটের শীর্ষ নেতাদের কে কে যাবেন- তাও চূড়ান্ত করা হবে। এ সাক্ষাতের ব্যাপারে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল জোটের নেতাদের ইতিবাচক সাড়া দিলেও এখনও কারা কর্তৃপক্ষের অনুমতি মেলেনি। গণফোরাম সভাপতি ও ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ নেতা ড. কামাল হোসেন খালেদা জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন কি-না, তা নিয়েও সংশয় তৈরি হয়েছে। তবে জোটের নেতারা ড. কামালের নেতৃত্বেই খালেদা জিয়াকে দেখতে যেতে চান। তাদের মতে, এতে সারাদেশে জোটের নেতাকর্মীরা চাঙ্গা হবেন। রাজনীতিতেও নতুন আবহ তৈরি হবে।

এ প্রসঙ্গে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও ঐক্যফ্রন্টের স্টিয়ারিং কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, বিএনপি মহাসচিব দেশের বাইরে থাকায় ঐক্যফ্রন্টের অনেক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত আটকে ছিল। এখন শিগগির তারা বৈঠক করে পরবর্তী করণীয় ঠিক করবেন।

ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষস্থানীয় নেতা ও নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না সমকালকে বলেন, আগামী দিনের কর্মসূচি নির্ধারণে শিগগির বৈঠকে বসবেন তারা। বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি বুঝেশুনেই পরবর্তী কর্মসূচি নির্ধারণ করা হবে।

নেতৃত্বে থাকবে ঐক্যফ্রন্ট :আগামীতে নতুন নির্বাচন ও খালেদা জিয়ার মুক্তিসহ বিভিন্ন দাবিতে সব আন্দোলনই হবে ঐক্যফ্রন্টের নেতৃত্বে। বিএনপি বড় রাজনৈতিক দল হলেও ঐক্যফ্রন্টের ব্যানারেই আন্দোলন করবে তারা। দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া কারাগারে এবং ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান লন্ডনে থাকায় জোটের শীর্ষ নেতাদের সমন্বয়ে আন্দোলন-সংগ্রামের বন্ধুর পথ পাড়ি দিতে চায় তারা। তাই জোটকে আরও সুদৃঢ় করার উদ্যোগ নিচ্ছেন তারা।

কে কী ভাবছেন :ঐক্যফ্রন্টের আগামী আন্দোলন ও কর্মসূচি প্রসঙ্গে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সমকালকে বলেন, গণতন্ত্র হরণ করে বিনা ভোটে নির্বাচিত সরকারের আর একমুহূর্ত ক্ষমতায় থাকার অধিকার নেই। লোক দেখানো দুর্নীতিবিরোধী অভিযান পরিচালনা না করে গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনতে দ্রুত নতুন নির্বাচন দরকার। গণতান্ত্রিক সরকার ছাড়া দেশে স্বাভাবিক পরিস্থিতি ফিরে আসবে না। আরেক প্রশ্নের জবাবে মির্জা ফখরুল বলেন, বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তি, নির্দলীয় ও নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের দাবিতে তারা আন্দোলনের মধ্যেই আছেন।

জেএসডি সভাপতি আ স ম আবদুর রব বলেন, জনগণের মৌলিক অধিকার হরণকারী সরকারকে হটিয়ে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে হবে। দেশবাসীকে সঙ্গে নিয়ে তারা ভোটাধিকার ফিরিয়ে আনার আন্দোলনকে আগামীতে আরও বেগবান করবেন।

গণফোরামের নির্বাহী সভাপতি অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী বলেন, বিনা ভোটে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকার গণতন্ত্র চর্চার কোনো ধারই ধারছেন না। এ পরিস্থিতিতে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার করতে নভেম্বর থেকেই তারা রাজপথের বিভিন্ন কর্মসূচি শুরু করবেন।

২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর একাদশ সংসদ নির্বাচনে অভাবনীয় বিপর্যয় ঘটে ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থীদের। অবশ্য নির্বাচনে ভোট কারচুপি ও অনিয়মের অভিযোগ করলেও প্রতিবাদে রাজপথে বড় ধরনের কোনো আন্দোলনে নামেনি ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। শীর্ষ নেতাদের মতে, বিএনপিসহ শরিক দলগুলোর সাংগঠনিক দুর্বলতার কারণে এবং নেতাকর্মীদের আকস্মিকভাবে মামলা-হামলা ও নির্যাতনের মুখে ঠেলে না দিতেই মূলত এ কৌশল নেওয়া হয়।

তবে 'কারচুপির নির্বাচন' বলে ফল প্রত্যাখ্যান করলেও শেষ পর্যন্ত কৌশলগত সংসদে গেছে বিএনপিসহ ঐক্যফ্রন্টের সাংসদরা। অভাবনীয় এ ফল বিপর্যয়কে কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছেন না জোটের নেতাকর্মীরা। কিন্তু সাংগঠনিক দুর্বলতার কারণে গত এক বছরেও বড় কোনো আন্দোলন গড়ে তুলতে পারেনি এ জোট। নানা ইস্যুতে দূরত্ব সৃষ্টি হওয়ায় জোটের ব্যাপারে বিএনপি নেতাকর্মীরাও অনেকটা অনাগ্রহী দেখা যায়। তবে বিএনপি এককভাবে বিভাগীয় শহরগুলোতে সমাবেশ করেও দেশবাসীর দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারেনি। সার্বিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে আগামীতে ঐক্যফ্রন্টের ব্যানারেই আন্দোলনের কর্মসূচি পালনের নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে এ দল।

আরও পড়ুন

×