ঢাকা শনিবার, ২০ জুন ২০২৬

কেমন ছিল আওয়ামী লীগের গত ২০ সম্মেলন

কেমন ছিল আওয়ামী লীগের গত ২০ সম্মেলন
×

সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ২০ ডিসেম্বর ২০১৯ | ০০:২৪

অপেক্ষার পালা শেষ। উপমহাদেশের অন্যতম প্রাচীন রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের দু'দিনব্যাপী ২১তম জাতীয় সম্মেলন আজ শুক্রবার শুরু হচ্ছে। রাজধানীর ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে দু'দিনব্যাপী এ সম্মেলনে আগামীর পথরেখা নির্ধারণ করবে টানা তিনবার রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকা এ দলটি।

ঘটনাবহুল এবং দুর্গম, দীর্ঘ বন্ধুর পথ পাড়ি দিয়ে আওয়ামী লীগ পৌঁছেছে আজকের এই মাহেন্দ্রক্ষণে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে নেতৃত্ব দানকারী দলটির নতুন নেতৃত্ব নির্বাচনের এ আয়োজন নিয়ে সব মহলেই কৌতূহল ও উচ্ছ্বাস রয়েছে। অনুসন্ধানে দেখা যায়, আগের ২০টি সম্মেলন নিয়েও আলোচনার কমতি ছিল না।

১৯৪৯ সালের ২৩ ও ২৪ জুন ঢাকার কেএম দাশ লেনের রোজ গার্ডেনে প্রথম সম্মেলনের মধ্য দিয়েই যাত্রা শুরু আওয়ামী লীগের। 'পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ' নামে ওই সম্মেলনে দলটির আত্মপ্রকাশ ঘটে। প্রথম সম্মেলনে মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী সভাপতি ও শামসুল হক সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। তৎকালীন তরুণ নেতা শেখ মুজিবুর রহমান কারান্তরীণ অবস্থায় প্রথম কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। সেই কমিটি ছিল ৪০ সদস্যবিশিষ্ট।

১৯৫৩ সালের ৩ থেকে ৫ জুন ঢাকার মুকুল সিনেমা হলে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় সম্মেলনে মওলানা ভাসানী সভাপতি পদে পুনর্নির্বাচিত হন। সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন শেখ মুজিবুর রহমান। ওই সম্মেলনেই নির্ধারিত হয় দলের গঠনতন্ত্র ও ঘোষণাপত্র।

১৯৫৫ সালের ২১-২৫ অক্টোবর ঢাকার রূপমহল সিনেমা হলে অনুষ্ঠিত তৃতীয় সম্মেলনে মওলানা ভাসানী সভাপতি এবং শেখ মুজিবুর রহমান সাধারণ সম্পাদক পদে পুনর্নির্বাচিত হন। ওই সম্মেলনে একটি অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম নির্মাণের লক্ষ্যে দলের নাম থেকে 'মুসলিম' শব্দটি বাদ দেওয়া হয়। দলের নাম হয় পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ। প্রথমবারের মতো ওই সম্মেলনে অংশ নেন পাঁচ নারী।

এর দু'বছর পর ১৯৫৭ সালের ১৩-১৪ জুন আরমানিটোলার নিউ পিকচার হাউস ও গুলিস্তান সিনেমা হলে অনুষ্ঠিত চতুর্থ সম্মেলনের আগে মতবিরোধের জেরে মওলানা ভাসানী পদত্যাগ করেন। এ সম্মেলনে ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হন আবদুর রশীদ তর্কবাগীশ এবং আবারও শেখ মুজিবুর রহমান সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পান।

এর সাত বছর পর ১৯৬৪ সালের ২৫ জানুয়ারি ঢাকার ইডেন হোটেল প্রাঙ্গণে দলের পঞ্চম সম্মেলনে আবদুর রশীদ তর্কবাগীশ সভাপতি ও শেখ মুজিবুর রহমান সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন।

১৯৬৬ সালের ১৮ মার্চ ষষ্ঠ সম্মেলনে সভাপতি নির্বাচিত হন শেখ মুজিবুর রহমান। সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন তার ঘনিষ্ঠ সহচর তাজউদ্দীন আহমদ।

১৯৬৮ সালের ১৯ ও ২০ অক্টোবর সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের অনুপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত সপ্তম সম্মেলনেও নেতৃত্ব অপরিবর্তিত থাকে। এ সম্মেলনে গঠনতন্ত্র সংশোধন করে কৃষি সম্পাদক পদ তৈরি করা হয়।

১৯৭০ সালের ৪ ও ৫ জুন দলের অষ্টম সম্মেলনে শেখ মুজিবুর রহমান ও তাজউদ্দীন আহমদ স্ব-স্ব পদে পুনর্নির্বাচিত হন।

স্বাধীন দেশে ১৯৭২ সালের ৭ ও ৮ এপ্রিল প্রথমবারের মতো তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সম্মেলনে কাউন্সিলরদের সর্বসম্মতিক্রমে নির্বাচিত সভাপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ওপর নির্বাহী সংসদের অন্য নেতাদের নির্বাচনের দায়িত্ব পড়ে। সেটা ছিল দলের নবম সম্মেলন। ওই সম্মেলন শেষে ১৬ এপ্রিল তিনি জিল্লুর রহমানকে (প্রয়াত রাষ্ট্রপতি) সাধারণ সম্পাদক করে দলের ৪৪ সদস্যবিশিষ্ট কমিটি ঘোষণা করেন।

১৯৭৪ সালের ১৮-২০ জানুয়ারি দলের দশম সম্মেলনে সভাপতি নির্বাচিত হন এএইচএম কামারুজ্জামান ও সাধারণ সম্পাদক হন তাজউদ্দীন আহমদ।

বঙ্গবন্ধু ১৯৭৫ সালের শুরুতে সব দল বিলুপ্ত করে বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ (বাকশাল) গঠন করে এর চেয়ারম্যান হন। ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী সাধারণ সম্পাদক এবং জিল্লুর রহমান, শেখ ফজলুল হক মনি ও আবদুর রাজ্জাক ছিলেন সম্পাদক। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সপরিবারে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব, এর পর কারাগারে শীর্ষ চার নেতাকে হত্যার পর নেতৃত্ব সংকটে পড়ে আওয়ামী লীগ।

১৯৭৭ সালের ৩ ও ৪ এপ্রিল দলের ১১তম সম্মেলনে তাজউদ্দীন আহমদের স্ত্রী সৈয়দা জোহরা তাজউদ্দীনকে আহ্বায়ক করে সাংগঠনিক কমিটি গঠিত হয়। এর আগে ১৯৭৬ সালে মহিউদ্দিন আহমেদকে ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ও সৈয়দা সাজেদা চৌধুরীকে ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক করে গঠিত কমিটি দলীয় কার্যক্রম পরিচালনা করে।

১৯৭৮ সালে দলের ১২তম সম্মেলনে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব দেওয়া হয় যথাক্রমে আবদুল মালেক উকিল ও আবদুর রাজ্জাককে। এর পর তিন বছর টালমাটাল অবস্থায় ছিল আওয়ামী লীগ। এ সময় একাধিক গ্রুপ প্রকাশ্য বিরোধে জড়িয়ে পড়ে।

১৯৮১ সালের ১৪-১৬ ফেব্রুয়ারি হোটেল ইডেনে অনুষ্ঠিত ঐতিহাসিক ১৩তম সম্মেলনে সভাপতি নির্বাচিত হন সে সময় ভারতে স্বেচ্ছানির্বাসিত বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা। আবদুর রাজ্জাক এবারও সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। এর পরের প্রতিটি সম্মেলনে সভাপতি পদে অপ্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে ওঠেন শেখ হাসিনা এবং এখনও দক্ষ হাতে নৌকার হাল ধরে আছেন তিনি।

১৯৮৭ সালের ১-৩ জানুয়ারি দলের ১৪তম সম্মেলনে সভাপতি হিসেবে শেখ হাসিনা ও সাধারণ সম্পাদক হিসেবে ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক সৈয়দা সাজেদা চৌধুরীকে নির্বাচিত করা হয়। এর আগে ১৯৮২ সালে আবদুর রাজ্জাক দল থেকে পদত্যাগ করলে সাজেদা চৌধুরীকে ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব দেওয়া হয়।

১৯৯২ সালের ১৯ ও ২০ সেপ্টেম্বর দলের ১৫তম সম্মেলনে সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব দেওয়া হয় জিল্লুর রহমানকে।

দীর্ঘ ২১ বছর পর রাষ্ট্রক্ষমতায় এসে ১৯৯৭ সালের ৬ ও ৭ মে আউটার স্টেডিয়ামে দলের ১৬তম সম্মেলন করে আওয়ামী লীগ। সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন আবদুল জলিল।

২০০২ সালের ২৬ ডিসেম্বর ১৭তম সম্মেলনেও শীর্ষ দুই পদে কোনো পরিবর্তন আসেনি।

২০০৯ সালের ২৪ জুলাই ১৮তম সম্মেলনে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন জাতীয় চার নেতার অন্যতম সৈয়দ নজরুল ইসলামের ছেলে সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম।

২০১২ সালের ২৯ ডিসেম্বর ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ১৯তম সম্মেলনে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক অপরিবর্তিত রেখে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে মহাজোট সরকারের চার বছরের উন্নয়ন ও সাফল্য এবং জাতিসংঘে গৃহীত শেখ হাসিনার শান্তির মডেল বিস্তারিত সংযোজন করে দলের ঘোষণাপত্রে পরিবর্তন আনা হয়। সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর আলোকেও দলের ঘোষণাপত্রে কিছু পরিবর্তন আনা হয়।

দলের সর্বশেষ অর্থাৎ ২০তম সম্মেলন ২০১৬ সালের ২২ ও ২৩ অক্টোবর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে অনুষ্ঠিত হয়। ওই সম্মেলনে সভাপতি পদে টানা অষ্টমবারের মতো নির্বাচিত হন শেখ হাসিনা। সাধারণ সম্পাদক পদে আসেন ওবায়দুল কাদের। এই সম্মেলনে দলের গঠনতন্ত্র ও ঘোষণাপত্রে ব্যাপক পরিবর্তন আনা হয়। দলের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদ ৭৩ সদস্যের বদলে ৮১ সদস্যের করা হয়। সভাপতিমণ্ডলী, যুগ্ম সম্পাদক ও সাংগঠনিক সম্পাদকের পদসংখ্যা বৃদ্ধির পাশাপাশি সম্পাদকমণ্ডলী ও কার্যনির্বাহী সদস্যের একাধিক নতুন পদও সৃষ্টি করা হয়। দলের জেলা ও তৃণমূলের কমিটিগুলোতেও পদসংখ্যা বাড়ানো হয়। পাশাপাশি আরও অনেক বিষয়ে পরিবর্তন এনে গঠনতন্ত্র ও ঘোষণাপত্র যুগোপযোগী করা হয়।

আরও পড়ুন

×