রাজানগরের রাজবাড়ী সংরক্ষণে নতুন স্বপ্ন
রাঙ্গুনিয়ায় ৩০০ বছরের পুরোনো চাকমা রাজার বাড়ি সমকাল
মাসুদ নাসির, রাঙ্গুনিয়া
প্রকাশ: ২৬ অক্টোবর ২০২৪ | ২৩:১১
এলাকার নাম দক্ষিণ রাজানগর। রাঙ্গুনিয়া উপজেলার রাজানগরে ইছামতী নদীর তীর ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে ৩০০ বছরের পুরোনো রাজপ্রসাদের ভগ্নাবশেষ। ৫২ একর জায়গাজুড়ে এই রাজবাড়ী দীর্ঘদিনের অযত্ন-অবহেলায় নিশ্চিহ্নপ্রায়।
এদিকে সংরক্ষণের অভাবে হারিয়ে গেছে রাজদরবার, হাতিঘোড়ার পিলখানা, বৌদ্ধবিহারসহ গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন। তবে রাজবাড়ীর শান বাঁধানো পুকুর ও সাগরদীঘির অস্তিত্ব এখনও রয়েছে।
সম্প্রতি রাজপ্রাসাদটি সংস্কারের মাধ্যমে জাদুঘরে রূপান্তর করার উদ্যোগ নিয়ে সমীক্ষা চালাচ্ছে প্রত্নসম্পদ বিশেষজ্ঞদের একটি টিম। খাগড়াছড়ি ক্ষুদ্র নৃ-তাত্ত্বিক সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউটের অর্থায়নে চাকমা রাজার রাজপ্রাসাদ ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা নিয়ে সমীক্ষা, মাপজোখ, অনুসন্ধান ও খনন শুরু হয়েছে।
গত বছরের ২৯ অক্টোবর রাজানগরের রাজপ্রাসাদের প্রাথমিক সমীক্ষা করেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রত্বতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক মোকাম্মেল হোসেন ভূঁইয়া, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. আনন্দ বিকাশ চাকমা, স্থপতি আশিষ চাকমা ও প্রত্নসম্পদ বিশেষজ্ঞ টিমসহ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের একটি টিম।
এ বিষয়ে সমীক্ষা টিমের সদস্য সহযোগী অধ্যাপক ড. আনন্দ বিকাশ চাকমা বলেন, ‘রাজানগর বা চাকমা রাজবাড়ী হলো ঐতিহাসিক সভ্যতার নগরী। এখানে ঐতিহাসিক যে স্থাপনা রয়েছে, সেগুলোর পরিচয় পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে সংস্কার, মেরামত ও সংরক্ষণ প্রয়োজন। আমরা গবেষণা করে এটার ঐতিহাসিক, প্রত্নতাত্ত্বিক, স্থাপত্যশৈলীর গুরুত্ব এবং নৃ-তাত্ত্বিক ও স্থানীয় ইতিহাসের গুরুত্বের দিকগুলো বিবেচনা করেছি। আমরা মনে করছি, এই রাজপ্রাসাদ সংরক্ষণে উপযুক্ত পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন।’
তিনি আরও বলেন, ‘খাগড়াছড়ি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী ইনস্টিটিউটের অর্থায়নে আমরা এই সমীক্ষা প্রকল্প পরিচালনা করছি। প্রকল্প সমাপনান্তে একটি প্রতিবেদন জমা দেব। বর্তমান রাজা দেবাশীষ রায়ের সম্মতি ও পরামর্শনুযায়ী সংস্কার প্রক্রিয়া বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হবে।’
রাজ পরিবারের নথি ঘেঁটে জানা যায়, মোগল বংশধর সেরমুস্ত খাঁ ১৭৩৭ সালে রাজানগরে রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করেন। একই সময়ে চাকমা রাজত্বের গোড়াপত্তন হয়। দক্ষিণ চট্টগ্রামের বান্দরবান জেলার মাতামুহুরী নদীর অববাহিকায় আলীকদমে ছিল রাজধানী। তার রাজ্যসীমা ছিল উত্তরে ফেনী, দক্ষিণে শঙ্খ নদী, পূর্বে লুসাই পাহাড় এবং পশ্চিমে নিজামপুর রাস্তা। আরাকানিদের অত্যাচারে চাকমারা মোগল নবাবের সঙ্গে মিত্রতা স্থাপন করেন। তখন চট্টগ্রামের নবাব ছিলেন জুল কদর খাঁ। তিনি সেরমুস্ত খাঁকে রাঙ্গুনিয়ার পাহাড়ি অঞ্চলে বসতি স্থাপনের অনুমতি দেন।
১৭৫৭ সালে সেরমুস্ত খাঁ মৃত্যুর পর রাজা হন শুকদেব রায়। তিনি ছিলেন সেরমুস্ত খাঁর পোষ্যপুত্র। রাজা শুকদেব রায় আলীকদম ছেড়ে চাকমা অধ্যুষিত রাঙ্গুনিয়ার পদুয়ায় শিলক নদীর তীরে প্রাসাদ তৈরি করেন। নাম দেন সুখবিলাস। সেখানেই প্রতিষ্ঠা করেন রাজধানী। তার রানীর নাম ছিল ছেলেমা। রাজা শুকদেব রায়ের সন্তান ছিল না। তিনি তার রানীর নামানুসারে রাজপ্রাসাদের পশ্চিম দিকে একটি পুকুরের নামকরণ করেন ছেলেমা পুকুর।
জানা যায়, রাজ্য পরিচালনা ও বসবাসের জন্য শুকদেব রায় দক্ষিণ রাজানগর ইউনিয়নের রাজাভূবণ গ্রামে নির্মাণ করেন দ্বিতল রাজপ্রাসাদ। এটি সময়ের সেরা কারুকাজ ও শৈল্পিকতার নিদর্শন। প্রাসাদটির নিচতলায় ৬টি ও দ্বিতীয় তলায় ৪টি কক্ষ রয়েছে। ভবনটি তৈরি হয় দেয়াং পাহাড়ের মাটির চারকোণাকৃতি ইট, চুন, সুড়কি দিয়ে।
প্রসাদের প্রবেশপথে ছিল রাজদরবার, সৈন্যশালা ও বন্দিশালা। পাশেই আছে একটি শান বাধাঁনো পুকুর। পশ্চিম পাশে আছে শাক্ষ্যমনি বৌদ্ধ-বিহার। রাজবাড়ির কাছেই রয়েছে কালীন্দি রানী ও তাঁর স্বামী রাজা ধরণ বক্স খাঁ’র ২টি চিতা মন্দির।
দক্ষিণ রাজনগরে প্রজা সাধারণের সুপেয় জলের কষ্ট দূরীকরণে রাজ প্রাসাদের পূর্ব পাশে খনন করা হয় কালীন্দি রানীর নামে সাগরদীঘি। প্রতিষ্ঠিত হয় করেন রাজারহাট, কালীন্দি রানীর নামানুসারে রানীরহাট ও রাজা ভূবণমোহন রায়ের নামানুসারে রাজাভূবণ উচ্চ বিদ্যালয়।
১৭৭৬ সালে রাজা শুকদেব রায়ের মৃত্যুর পর তাঁদের বংশধর শের দৌলত খাঁ রাজ্যভার নিয়ে যখন রাঙামাটির রাজবাড়িতে রাজত্ব স্থানান্তর করেন, সেই থেকে দক্ষিণ রাজানগর ইউনিয়নের রাজাভূবণ গ্রামের রাজবাড়ি পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে।
সরেজমিন দেখা যায়, প্রাচীন রাজবাড়ি ভুতুড়ে বাড়িতে পরিণত হয়েছে। প্রাসাদের ভগ্নাবশেষ লতা-গুল্মে আচ্ছাদিত। ইট-সুড়কি দিয়ে তৈরি লোহাবিহীন রাজপ্রাসাদের দেয়ালগুলোর প্রস্থ প্রায় দুই হাতেরও বেশি। খসে পড়েছে প্রসাদের ছাদ। নড়েবড়ে অবকাঠামোর কারণে এটি পরিস্কার করাও সম্ভব হচ্ছে না।
জানা যায়, রাজার বংশধরেরা বিভিন্ন সময় রাজপ্রাসাদ রক্ষায় প্রাণপণ চেষ্টা চালালেও শেষ রক্ষা হয়নি। রাজপ্রাসাদটি ১৯৯৩ সাল থেকে টানা ২০ বছর দেখভাল করেছেন প্রয়াত প্রমতোষ দেওয়ান। ২০১৩ সালে তিনি পরলোকগমন করলে তাঁর ছেলে রুমেল দেওয়ান রাজপ্রাসাদটি রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব নেন।
২০০৭ সালে চাকমা রাজা দেবাশীষ রায় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা হওয়ার পর রাঙ্গুনিয়ার মানুষ দাবি জানিয়েছিলেন, রাজবাড়ির সংস্কারের মাধ্যমে এটিকে পর্যটন কেন্দ্র হিসাবে গড়ে তোলার। ২০০৮ সালের মাঝামাঝি রাজা দেবাশীষ রায় রাজবাড়ি এলাকা পরিদর্শনে আসেন, তখন তিনি এটি সংরক্ষণের কথাও বলেছিলেন। কিন্তু পরে কোন উদ্যোগ নেয়া হয়নি।
- বিষয় :
- বাড়ি দখল