ঢাকা বুধবার, ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

১১২ কিলোমিটার সংস্কারে প্রয়োজন ৫০০ কোটি টাকা

১১২ কিলোমিটার সংস্কারে প্রয়োজন ৫০০ কোটি টাকা
×

বৃষ্টির কারণে নোয়াখালী পৌরসভার বিভিন্ন সড়কে বড় গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। অর্থাভাবে সংস্কার করা যাচ্ছে না সমকাল

 আনোয়ারুল হায়দার, নোয়াখালী

প্রকাশ: ০২ আগস্ট ২০২৬ | ০৭:২৭

| প্রিন্ট সংস্করণ

নোয়াখালী পৌরসভার ২০৭ কিলোমিটার সড়কের মধ্যে ১১২ কিলোমিটারই এখন সংস্কারের অপেক্ষায়। ছোট-বড় অসংখ্য গর্ত, ভাঙাচোরা অবস্থার কারণে এসব সড়কে চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। পৌর কর্তৃপক্ষ বলছে, সড়ক, ফুটপাত ও নালা নির্মাণ ও সংস্কারে প্রয়োজন প্রায় ৫০০ কোটি টাকা। তবে অর্থসংকটের কারণে প্রয়োজনীয় কাজ করা যাচ্ছে না।
পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী বেলাল আহমেদ খান সমকালকে জানান, ‘পৌরসভার মোট ২০৭ কিলোমিটার সড়কের মধ্যে ১২৩ কিলোমিটার পাকা, ৭৩ কিলোমিটার কাঁচা এবং ১১ কিলোমিটার ফুটপাত রয়েছে। ফুটপাত বাদ দিলে ১৯৬ কিলোমিটার সড়কের মধ্যে ৮৪ কিলোমিটার সংস্কার করা হয়েছে। বাকি ১১২ কিলোমিটার সড়কের অধিকাংশই জরাজীর্ণ। এসব সড়ক, ফুটপাত ও ড্রেন নির্মাণে প্রায় ৫০০ কোটি টাকা প্রয়োজন। গত অর্থবছরে সড়ক, ড্রেন নির্মাণ ও সড়কবাতি স্থাপনে ৩০ কোটি টাকার কাজ বাস্তবায়ন হয়েছে।’

সরেজমিন শহরের শান্তিনগর, জেল রোড, নতুন বাসস্ট্যান্ড, মাইজদী বাজার-পুলিশ লাইনস, হরিনারায়ণপুর, লক্ষ্মীনারায়ণপুর, হাউজিং এস্টেটের সেন্ট্রাল রোড ও বালুর মাঠ রোড ঘুরে দেখা যায়, দীর্ঘদিন সংস্কার না হওয়ায় সড়কের বিভিন্ন স্থানে বড় বড় গর্ত সৃষ্টি হয়েছে। সামান্য বৃষ্টিতেই এসব গর্ত পানিতে ডুবে গিয়ে যান চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে। অনেক স্থানে রিকশা ও অটোরিকশা উল্টে দুর্ঘটনাও ঘটছে।
পৌরবাসীর অভিযোগ, বিকল্প সড়ক না থাকায় বাধ্য হয়ে ভাঙাচোরা পথেই চলাচল করতে হচ্ছে। এতে প্রায়ই দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছেন পথচারী, শিক্ষার্থী ও রোগীরা।
পৌর কার্যালয় সূত্র জানায়, ১৮৭৬ সালে প্রতিষ্ঠিত প্রথম শ্রেণির নোয়াখালী পৌরসভার আয়তন ১৭ দশমিক ১১ বর্গকিলোমিটার। প্রায় দেড় লাখ মানুষের বসবাস এই পৌরসভায়। পানি নিষ্কাশনের জন্য রয়েছে ১৭ কিলোমিটার প্রাথমিক ড্রেন (প্রাকৃতিক খাল), ১৩ দশমিক ১৬ কিলোমিটার সেকেন্ডারি ড্রেন এবং ৩২ দশমিক ৮৬ কিলোমিটার টারশিয়ারি ড্রেন।

১ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা নুরুর রহমান বলেন, ‘চার লেনের প্রধান সড়ক ছাড়া অধিকাংশ শাখা সড়কের অবস্থা অত্যন্ত খারাপ। ভাঙাচোরা রাস্তায় অতিরিক্ত ভাড়া দিয়েও অনেক রিকশাচালক যেতে চান না।’ ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাচালক আলা উদ্দিন বলেন, ‘গর্তে পড়ে প্রায়ই গাড়ির যন্ত্রাংশ নষ্ট হয়। একবার গ্যারেজে নিতে হলে ৭-৮ দিনের আয় মেরামতেই শেষ হয়ে যায়।’
২ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা সাজ্জাদ হোসেন বলেন, ‘নতুন বাসস্ট্যান্ড-জেলা কারাগার সড়কসহ আশপাশের শাখা সড়কগুলো চলাচলের অনুপযোগী। বৃষ্টির সময় বড় বড় গর্তে পানি জমে কৃত্রিম জলাশয়ের সৃষ্টি হয়। রাতে চলাচল আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে।’ ৩ নম্বর ওয়ার্ডের সরকারি মহিলা কলেজ সড়কের বাসিন্দা শাহাদাত হোসেন বাবু বলেন, এলাকার রাস্তার অবস্থা এতটাই শোচনীয় যে পায়ে হেঁটেও চলাচল করা কঠিন।’
কোর্ট স্টেশন এলাকার বাসিন্দা আবদুর রহিম বলেন, ‘লইয়ার্স কলোনি, কাজী কলোনি ও নোয়াখালী সরকারি মহিলা কলেজের পূর্ব পাশের সড়কে অসংখ্য গর্ত সৃষ্টি হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে সংস্কার না হওয়ায় প্রতিদিন হাজারো মানুষ দুর্ভোগে পড়ছেন। এসব সড়ক দিয়ে নোয়াখালী জিলা স্কুল, সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, প্রভাতী শিশু কানন, হরিনারায়ণপুর ইউনিয়ন উচ্চ বিদ্যালয়, নোয়াখালী হাই স্কুল, সরকারি কলেজ, সরকারি মহিলা কলেজ ও কেরামতিয়া কামিল মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা চলাচল করে। পাশাপাশি জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার, জেলা ও দায়রা জজ এবং চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে যাতায়াতকারী মানুষও ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন।’ করিমপুর মহল্লার বাসিন্দা সানজিদা আক্তার বলেন, ‘এক ঘণ্টার বৃষ্টিতেই গর্তগুলো পানিতে ভরে যায়। চলাচলের সময় কাদাপানি ছিটকে জামাকাপড় ও জুতা নষ্ট হয়।’
জেলা মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলের সাবেক কমান্ডার ফজলুল হক বাদল বলেন, ‘রশিদ কলোনি, সুলতান কলোনি ও ওবায়দুল্লাহ রোডের শাখা সড়কগুলো আরসিসি কাস্টিংয়ের মাধ্যমে পুনর্নির্মাণ করা প্রয়োজন।’ নাইস গেস্ট হাউসের মালিক মো. শওকত আলী বলেন, ‘অপরিকল্পিত সড়ক ও ড্রেন নির্মাণের কারণেই আজকের এ পরিস্থিতি। সামান্য বৃষ্টিতেই শহরে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়।’ তাঁর অভিযোগ, অতীতে ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা অপচয় ও অনিয়ম হয়েছে। ফলে প্রথম শ্রেণির পৌরসভা হলেও সেবার মান অনেক পিছিয়ে রয়েছে।
পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী বেলাল আহমেদ খান বলেন, ‘১১২ কিলোমিটার সড়ক সংস্কার, ফুটপাত ও ড্রেন নির্মাণে প্রায় ৫০০ কোটি টাকা প্রয়োজন। নতুন বরাদ্দ পাওয়া গেলে অগ্রাধিকারভিত্তিতে দরপত্র আহ্বান করে কাজ শুরু করা হবে।’
স্থানীয় সরকার বিভাগের উপপরিচালক (ডিডিএলজি) ও পৌরসভার প্রশাসক ডা. মো. শেখ সাদেক বলেন, ‘প্রয়োজনীয় প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) প্রস্তুত করে বরাদ্দের জন্য পাঠানো হবে। অর্থ বরাদ্দ পাওয়া গেলে গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোর সংস্কার ও অবকাঠামো উন্নয়নের কাজ দ্রুত শুরু করা হবে।’
 

আরও পড়ুন

×