নিরীক্ষায় ৪৬ লাখ টাকার গরমিল, অভিযোগ প্রধান শিক্ষকের দিকে
কুমিরা আবাসিক বালিকা স্কুল অ্যান্ড কলেজ
এম সেকান্দর হোসাইন, সীতাকুণ্ড (চট্টগ্রাম)
প্রকাশ: ০২ আগস্ট ২০২৬ | ০৭:২৩ | আপডেট: ০২ আগস্ট ২০২৬ | ০৮:২০
| প্রিন্ট সংস্করণ
সীতাকুণ্ড উপজেলার কুমিরা আবাসিক বালিকা স্কুল অ্যান্ড কলেজের আর্থিক ব্যবস্থাপনা, হিসাব সংরক্ষণ ও প্রশাসনিক কার্যক্রমে নানা অনিয়মের অভিযোগ উঠে এসেছে একটি বেসরকারি নিরীক্ষা প্রতিবেদনে। এতে প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষ মোহাম্মদ নাসির উদ্দিনের বিরুদ্ধে প্রায় ৪৬ লাখ টাকার হিসাব গরমিল, সরকারি প্রকল্পের অর্থ ব্যবহারে অসংগতি এবং প্রশাসনিক বিভিন্ন অনিয়মের তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন অধ্যক্ষ।
সাবেক বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি ইফতেখার আহমেদ জুয়েলের দাবি, নিরীক্ষায় উঠে আসা অভিযোগের বিষয়ে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তাকে লিখিতভাবে অবহিত করা হলেও এখন পর্যন্ত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
চট্টগ্রামের আগ্রাবাদভিত্তিক মাহামুদ সবুজ অ্যান্ড কোম্পানি নামের একটি অডিট ফার্ম ২০১৮ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানের আয়-ব্যয়, ব্যাংক লেনদেন, সরকারি উপবৃত্তির অর্থ, বিল-ভাউচার, রেজল্যুশন ও হিসাব সংরক্ষণ পর্যালোচনা করে এ প্রতিবেদন প্রস্তুত করে। নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রাতিষ্ঠানিক ফি ও অন্যান্য আয়-ব্যয়ের হিসাবে প্রায় ৪৬ লাখ টাকার গরমিল পাওয়া গেছে। এই অর্থের ব্যয়ের গ্রহণযোগ্য হিসাব বা প্রয়োজনীয় নথি উপস্থাপন করতে পারেননি অধ্যক্ষ।
এতে আরও উল্লেখ করা হয়, ‘ঋণ বিতরণ’ খাতে ১ লাখ ৮৯ হাজার ৫৬৩ টাকা ব্যয় দেখানো হলেও প্রকৃতপক্ষে কোনো ঋণ বিতরণের তথ্য বা প্রমাণ পাওয়া যায়নি। পুরোনো পরীক্ষার খাতা, বাতিল কাগজপত্র ও অন্যান্য সামগ্রী বিক্রির অর্থও প্রতিষ্ঠানের তহবিলে জমা হয়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
অডিটে অধিকাংশ বিল-ভাউচারে নম্বর, অনুমোদিত স্বাক্ষর কিংবা প্রয়োজনীয় সমর্থনকারী কাগজপত্র না থাকার বিষয়টিও তুলে ধরা হয়েছে। এমনকি কলেজ বিভাগের এক জ্যেষ্ঠ শিক্ষকের স্বাক্ষরযুক্ত সাদা কাগজ ব্যবহার করে বড় অঙ্কের অর্থ পরিশোধের অভিযোগও প্রতিবেদনে রয়েছে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ২০২৩ সালে অগ্রণী ব্যাংকের সীতাকুণ্ড শাখা থেকে সরকারি পিবিজিএসআই প্রকল্পের ৫ লাখ টাকা একক স্বাক্ষরে উত্তোলন করা হয়। তবে প্রায় তিন বছর পেরিয়ে গেলেও ওই অর্থ কোন খাতে ব্যয় হয়েছে, তার কোনো হিসাব সংশ্লিষ্ট দপ্তরে জমা দেওয়া হয়নি বলে নিরীক্ষায় উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রশাসনিক ক্ষেত্রেও বিভিন্ন অনিয়মের কথা প্রতিবেদনে এসেছে। এর মধ্যে প্রায় ২০ বছর ধরে সহকারী প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য রেখে প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনা এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ক্যাম্পাসে হাঁস-মুরগি পালনের বিষয়ও উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে অধ্যক্ষ মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন বলেন, ‘আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর বিএনপি নেতা আসলাম চৌধুরীর মনোনয়নে ইফতেখার আহমেদ জুয়েল সভাপতি হন। পরে সেই কমিটির মেয়াদ শেষ হয় এবং বর্তমানে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁর ভাষ্য, বর্তমান সভাপতি মনোনয়নকে কেন্দ্র করে বিরোধের জেরে তাঁকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে হয়রানি করতে বেসরকারি অডিট করানো হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘বেসরকারি অডিট ফার্ম দিয়ে এ ধরনের অডিট করার এখতিয়ার নেই কারও। আমাকে ফাঁসানোর উদ্দেশ্যেই এই প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে। এতে উত্থাপিত অভিযোগ সত্য নয়।’
এ বিষয়ে স্কুল অ্যান্ড কলেজের সভাপতি ও সীতাকুণ্ড উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ফখরুল ইসলাম বলেন, ‘বিষয়টি সম্পর্কে আমি অবগত আছি। অভিযোগের সত্যতা তদন্তে প্রমাণিত হলে বিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ইসমত আরা বেগম বলেন, ‘সাবেক সভাপতি দায়িত্বে থাকাকালে একটি বেসরকারি অডিট ফার্ম দিয়ে অডিট করানো হয়েছে। প্রতিবেদনে বিভিন্ন অনিয়মের তথ্য উঠে এসেছে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। বিষয়টি আমাকে অবহিত করা হয়েছে। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
সাবেক সভাপতি ইফতেখার আহমেদ জুয়েল বলেন, ‘দায়িত্ব পালনকালে গভর্নিং বডির সিদ্ধান্তে বেসরকারিভাবে অডিট করানো হয়। সেখানে নানা আর্থিক ও প্রশাসনিক অনিয়মের তথ্য উঠে আসে। তদন্তের জন্য উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তার কাছে লিখিত আবেদন ও ই-মেইল পাঠানো হলেও এখন পর্যন্ত কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।’
- বিষয় :
- বিদ্যালয়