রাতে জ্বলে সড়কবাতি পথ হারায় বন্যহাতি
চুনতী অভয়ারণ্যের জাঙ্গালিয়া অংশে স্থাপন করা হয়েছে রোড সাইন, গার্ড রেল, পিলার ও বৈদ্যুতিক খুঁটি। এসবের কারণে হাতি চলাচল ব্যাহত হচ্ছে সমকাল
কাইছার হামিদ, লোহাগাড়া (চট্টগ্রাম)
প্রকাশ: ১৭ আগস্ট ২০২৫ | ০০:২৮
চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক ও রেললাইনের পূর্ব পাশে চুনতী সংরক্ষিত বনাঞ্চল, পশ্চিমে বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য। অভয়ারণ্যের মাঝখানে রয়েছে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক ও রেললাইনের প্রায় ১০ কিলোমিটার অংশ। এ অংশে হাতিসহ বিভিন্ন বন্যপ্রাণী চলাচলের ১৩টি পথ (করিডোর) রয়েছে। মহাসড়কের দুই পাশে মানবসৃষ্ট নানা বাধার কারণে অভয়ারণ্যের বন্যপ্রাণীর প্রাকৃতিক চলাচলের পথ সংকুচিত হয়ে গেছে। বিশেষ করে ঘনঘন রোড সাইন, জাঙ্গালিয়া এলাকায় দুর্ঘটনা রোধে রাতেও বাতি জ্বালিয়ে রাখায় হাতির চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। আর বিকট শব্দে ট্রেন চলাচলের কারণে অভয়ারণ্যের পশুপাখির মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়, রেললাইন দিয়ে বন্যহাতির চলাচলে বাধার সৃষ্টি হয়। বনবিভাগকে না জানিয়ে সড়ক ও জনপথ বিভাগ মহাসড়কে নানা স্থাপনা তৈরি করেছে।
হাতি পথ দিয়ে চলাফেরা করে, যেটি বংশপরম্পরায় তারা ব্যবহার করে আসছে। এ পথে চলাচলে বাধা পেলে তারা দিকভ্রান্ত হয়ে যায়।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণীবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও হাতি বিশেষজ্ঞ ড. মোহাম্মদ আবদুল আজিজ বলেন, ‘বন্যহাতির চলাচলের নির্দিষ্ট করিডোর থাকে; যা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে তারা অনুসরণ করে। এই পথে হঠাৎ করে মানবসৃষ্ট বাধা ও বাতির উজ্জ্বল আলো হাতির আচরণে সরাসরি প্রভাব ফেলছে। হাতি অত্যন্ত সংবেদনশীল প্রাণী। সামান্য পরিবর্তনেও তারা দ্বিধায় পড়ে চলাচলের পথ বদলে ফেলে। নিরাপদ করিডোর নিশ্চিত করতে হলে নতুন অবকাঠামো নির্মাণের আগে পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন নিশ্চিত করতে হবে। হাতির জন্য পরিচিত, নিরিবিলি ও প্রাকৃতিক পরিবেশ বজায় রাখতে হবে। নিরাপদ পরিবেশ না থাকলে হাতিরা সেই পথ পরিহার করবেই।’
জানা যায়, লোহাগাড়া উপজেলার চুনতী বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য এশিয়ান হাতিসহ নানা বন্যপ্রাণীর নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে পরিচিত। নরম মাটি, ঝরনা ও ভূগর্ভন্থ পানি প্রবাহের কারণে বনটি হাতির প্রজননক্ষেত্র। মহাসড়কের দুই পাশে মানবসৃষ্ট নানা প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে রোড সাইন, গার্ড রেল, বৈদ্যুতিক খুঁটি, সাইনবোর্ড, সীমানা ফটক, দূরত্ব চিহ্নিতকারী পিলার ও বৈদ্যুতিক বাতি। ফলে রেল লাইনে হাতির মতো বৃহৎ প্রাণীর জন্য নির্মিত ‘এলিফ্যান্ট ওভারপাস’ও এখন কার্যকারিতা হারাচ্ছে। কারণ বন্যপ্রাণী পার হওয়ার সময় তাদের নজরে পড়ে মানুষের ভিড়, কানে আসে যানবাহনের হর্ন। আর চোখ ধাঁধানো আলো পশুপাখিকে বিভ্রান্ত করে দেয়। ফলে বন্যপ্রাণীরা প্রাকৃতিক চলাচলের পথ থেকে মুখ ফিরিয়ে রিয়েছে। এভাবে চলতে থাকলে শুধু বন্যপ্রাণী নয়, পুরো ইকোসিস্টেম হুমকির মুখে পড়বে। এখনই সময়, পরিকল্পনাহীন স্থাপনাগুলো সরিয়ে প্রকৃতির চলাচলের পথকে ফিরিয়ে দেওয়া।
জানা যায়, মহাসড়কের চুনতি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য রেঞ্জ কার্যালয়ের ফটক থেকে চুনতি সংরক্ষিত বনের সাতগড় বিট অফিস পর্যন্ত জাঙ্গালিয়ার অর্ধ কিলোমিটার অংশে কয়েকটি বন্যহাতি চলাচলের পথ রয়েছে। এরমধ্যে একটি পথে রেললাইনের উপর ‘এলিফ্যান্ট ওভারপাস’ তৈরি করা হয়েছে। তবে ওভারপাস দিয়ে বন্যহাতির চলাচল তেমন দেখা যায় না। সম্প্রতি ওই এলাকায় পর পর কয়েকটি সড়ক দুর্ঘটনায় অনেকে হতাহত হয়েছেন। এরপর সড়ক ও জনপথ বিভাগ অপরিকল্পিতভাবে অসংখ্য রোডসাইন ও রাম্বল স্ট্রিপ স্থাপন করেছে। এসব রোডসাইন রাতে যানবাহনের আলো পড়লে ঝলমল করে। রাম্বল স্ট্রিপ স্থাপনের ফলে যানবাহনের গতি কমে যায়। নির্জন এলাকায় অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে ও অন্ধকার দূর করতে লাগানো হয়েছে বৈদ্যুতিক বাল্ব। এতে অপরিকল্পিত স্থাপনা ও আলোর কারণে হাতিসহ বন্যপ্রাণীর চলাচল বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
সরেজমিন মহাসড়ক থেকে এলিফ্যান্ট ওভারপাসে যাতায়াতের পথে দেখা গেছে সড়ক ও জনপথ বিভাগের সাইনবোর্ড, রোডসাইন, গার্ডরেল, দূরত্ব চিহ্নিতকারী পিলার ও বৈদ্যুতিক খুঁটি। পাশেই রয়েছে কক্সবাজার সড়ক বিভাগের স্বাগতম লেখা ফটক ও অল্প দূরত্বে চট্টগ্রাম দক্ষিণ সড়ক বিভাগের ধন্যবাদ লেখা ফটক। এলিফ্যান্ট ওভারপাস হয়ে বন্যহাতিকে সংরক্ষিত বনাঞ্চল আর অভয়ারণ্যে যাতায়াত করতে এসব মানবসৃষ্ট বাধা অতিক্রম করতে হয়।
স্থানীয় পরিবেশ কর্মী সানজিদা রহমান বলেন, ‘বন্যহাতি আমাদের জীববৈচিত্র্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু আজ উন্নয়নের নামে যেভাবে এলাকা ভাগ করে হাতি চলাচলের পথে মানবসৃষ্ট বাধা সৃষ্টি করা হচ্ছে, তাতে তাদের প্রাকৃতিক চলাচল বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। বিশেষ করে ‘এলিফ্যান্ট করিডোরে’ মানবসৃষ্ট বাধা, শব্দদূষণ, রোডসাইন ও যানবাহনের গতি সবই হাতির জন্য হুমকি। ফলে তারা বাধ্য হচ্ছে বিকল্প ও ঝুঁকিপূর্ণ পথে চলাচল করতে। যে পথে শত বছর ধরে হাতি চলাচল করছে, সেই পথ নিরাপদ রাখতে হবে। না হলে এই মহাবিপন্ন প্রাণীরা এক সময় হয়তো চিরতরে মুখে ফিরিয়ে নেবে এই বনভূমি থেকে।’
চট্টগ্রাম দক্ষিণ সড়ক ও জনপথ বিভাগের উপ-সহকারী প্রকৌশলী আবু হানিফ বলেন, ‘জাঙ্গালিয়া এলাকায় রোডসাইনসহ বিভিন্ন সড়ক সুরক্ষা সাইনবোর্ড স্থাপনের কারণে বন্যহাতির চলাচলে প্রতিবন্ধকতা তৈরি হচ্ছে–এটা বনবিভাগ আমাদের জানায়নি।’ সম্প্রতি জাঙ্গালিয়া এলাকায় অল্প দূরত্বে অনেক রোডসাইন স্থাপন করার কারণ কি? এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘সড়কে নিরাপদ যানবাহন চলাচলের জন্য এসব করা হয়েছে, এসব স্থাপনা আরও বেশি দরকার।’
বন্যপ্রাণী ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ কর্মকর্তা নুর জাহান বলেন, ‘জাঙ্গালিয়া এলাকায় বন্যহাতি চলাচলের কয়েকটি পথ রয়েছে। সম্প্রতি ওই এলাকায় সড়ক সম্প্রসারণের পর হাতি চলাচলের পথে রোডসাইনসহ সড়ক সুরক্ষা সাইনবোর্ড স্থাপনের বিষয়ে বনবিভাগকে অবহিত করা হয়নি। এছাড়া ওই এলাকায় বৈদ্যুতিক বাল্ব স্থাপন করে রাতে লাইট জ্বালানোর ব্যাপারেও আমাদের কেউ লিখিত কিংবা মৌখিকভাবেও জানাননি। মূলত, বন্যপ্রাণীরা ওই স্থান দিয়ে রাতেই চলাচল করে। এভাবে ঘন ঘন রোডসাইন স্থাপন ও বৈদ্যুতিক বাতি জ্বালিয়ে রাখলে হাতিসহ বন্যপ্রাণী চলাচলে ব্যাঘাত সৃষ্টি হবে। বন্যপ্রাণী চলাচলে পথ সুগম রাখতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সাথে কথা বলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’
- বিষয় :
- বন্যহাতি
