ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

দুর্গম চরে থাকতে চান না শিক্ষকরা

দুর্গম চরে থাকতে চান না শিক্ষকরা
×

দক্ষিণ চর আবদুল্যা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। যাতায়াতসহ নানা সমস্যার কারণে চরের বিদ্যালয়টিতে শিক্ষক সংকট লেগেই থাকে সমকাল

 মিসু সাহা নিক্কন, রামগতি (লক্ষ্মীপুর)

প্রকাশ: ২৪ আগস্ট ২০২৫ | ০০:৪১

রামগতি উপজেলায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে ৯৬টি। এর মধ্যে ৪১টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য। এসব বিদ্যালয়ের বেশির ভাগ চরাঞ্চলের। ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করছেন সহকারী শিক্ষকরা। আগামী ডিসেম্বরে আরও ৩ জন প্রধান শিক্ষক অবসরে যাবেন। প্রধান শিক্ষক পাঠদানসহ প্রশাসনিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।
এদিকে, প্রধান শিক্ষক না থাকায় সহকারী শিক্ষকরা ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষককে মানতে চান না বলে অভিযোগ অভিভাবকদের। একটি বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীর অভিভাবক বিটুল সাহা বলেন, ‘প্রধান শিক্ষক না থাকায় পড়াশোনা চলছে যেনতেনভাবে। অনেক শিক্ষক ঠিক সময় বিদ্যালয়ে আসেন না। ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষককে অনেকে মানতে চান না। উপজেলা শহরের বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকের পদ দ্রুত পূরণ করা হলেও চরাঞ্চলের কোনো কোনো বিদ্যালয়ে দেড় যুগ ধরে খালি।’
উপজেলার মূল ভূ-খণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন চর আবদুল্যা ইউনিয়নের দক্ষিণ চর আবদুল্যা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও চর সেভেজ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দীর্ঘদিন ধরে নেই প্রধান শিক্ষক।  সহকারী শিক্ষকেরও সংকট রয়েছে। চর আবদুল্যা ইউনিয়নের বাসিন্দা ও অভিভাবক কামাল মিয়া বলেন, দুর্গম চরাঞ্চল হওয়ায় এখানে শিক্ষকরা বেশিদিন থাকতে পান না, তদবির করে অন্যত্র বলি হয়ে যান। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষও শিক্ষকদের ধরে রাখার ব্যাপারে মনোযোগী নয়।’
মধ্য চর আফজল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কথা হয় প্রধান শিক্ষকের দায়িত্বে থাকা সহকারী শিক্ষক মো. আবু সায়েদের সঙ্গে। তিনি সমকালকে বলেন, ‘২০০৭ সাল থেকে গত ১৭ বছর ধরে এই বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক নেই। ২০১৬ সালে এক বছরের জন্য এসেছিলেন একজন প্রধান শিক্ষক। পরে তিনিও বদলি হয়ে যান। আমি ২০১৯ সালে যোগদানের পর থেকে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করে আসছি। আমাকে প্রশাসনিক কাজে উপজেলা সদরে প্রায় যেতে হয়। ফলে নিয়মিত ক্লাস নিতে পারি না।’
প্রধান শিক্ষক না থাকায় ভোগান্তির কথা উল্লেখ করে পূর্ব চর মেহার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক সাফায়েত উল্যাহ বলেন, ‘ছয় বছর ধরে আমি ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করছি। এ জন্য আমাকে দাপ্তরিক কাজে প্রায় সদরে যেতে হয়। অংশ নিতে হয় ট্রেনিং ও ক্লাস্টারসহ বিভিন্ন সভায়। তখন আমি ক্লাস নিতে পারি না।’
পূর্ব চর আলগী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক জোবেদা ইয়াছমিন জানান, বিদ্যালয়ে দীর্ঘদিন ধরে শূন্য প্রধান শিক্ষকের পদ। এতে করে পাঠদানসহ প্রশাসনিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। এ বিদ্যালয়ে ১২৩ জন শিক্ষার্থী রয়েছে। উপস্থিতি ৬৫ শতাংশ। তবে নানা কারণে ঝরে পড়ছে শিক্ষার্থীরা। 
পূর্ব চর গাজী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অভিভাবক গোলাম সারোয়ার বলেন, ‘শহর এলাকায় বিদ্যালয়ে অবসরের কারণে পদ শূন্য হলে অন্য এলাকা থেকে এনে পূরণ হয়। কিন্তু চরাঞ্চলের বিদ্যালয়গুলোয় অবসরে যাওয়ার পর পদ শূন্যই থেকে যায়।’ চর দরবেশ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অভিভাবক জামাল উদ্দিন জানান, শিক্ষক সংকটের কারণে শিক্ষার্থীদের পাঠদানসহ প্রশাসনিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। 
উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা যায়, প্রধান শিক্ষকের পদগুলো ৬৫ শতাংশ পদোন্নতির মাধ্যমে ও ৩৫ শতাংশ সরাসরি নিয়োগের মাধ্যমে পূরণের বিধান রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে সরাসরি প্রধান শিক্ষক পদে নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে না। তাই প্রধান শিক্ষকের শূন্য পদ পূরণ করা যাচ্ছে না। এ ছাড়া উপজেলার ৯৬টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ১৯ জন সহকারী শিক্ষকের পদও শূন্য রয়েছে। 
চর আবদুল্যাহ ইউনিয়নের বাসিন্দা শাকিল হোসেন বলেন, ‘এলাকার মানুষ খুবই গরিব। চরে পর্যাপ্ত বিদ্যালয় না থাকায় যৌতুক ও বাল্যবিবাহ বেশি প্রচলিত। এখানে স্বাস্থ্য, শিক্ষা নিশ্চিত করা বড় চ্যালেঞ্জ। এ চরে রয়েছে মাত্র দুটি প্রাথমিক বিদ্যালয়। তাও শিক্ষক সংকটের মধ্য দিয়ে চলছে পাঠদান।’
দক্ষিণ চর আবদুল্যা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মনির হোসেন বলেন, ‘আমার বিদ্যালয়ে মোট শিক্ষার্থী রয়েছে ১৪০ জন। প্রাক প্রাথমিক শ্রেণিতে শিক্ষার্থী রয়েছে ২৪ জন, ১ম শ্রেণি ২৩ জন, ২য় শ্রেণি ২৮ জন, ৩য় শ্রেণি ২১ জন, ৪র্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী রয়েছে ২৪ জন ও ৫ম শ্রেণির মাত্র ২০ জন। মোট শিক্ষার্থীর মধ্যে বালক ৬৮ ও বালিকা ৭২ জন। এখানে শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়গামী করা কঠিন কাজ।’
চর সেভেজ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আমিনুল ইসলাম মুকুল বলেন, ‘এ বিদ্যালয়ে কখনও প্রধান শিক্ষক ছিলেন কিনা, তা আমার জানা নেই। দীর্ঘদিন ধরে আমি দায়িত্ব পালন করছি।’
উপজেলা সহকারী শিক্ষক সমিতির সভাপতি আবু সায়েদ বলেন, ‘মুশকিল হচ্ছে, অনেক ক্ষেত্রে ভারপ্রাপ্ত এই প্রধান শিক্ষকদের আদেশ-নির্দেশ মানতে চান না অন্য শিক্ষকরা– এটা ঠিক।’ 
এ বিষয়ে উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মু. সাইদুর রহমান স্বপন বলেন, ‘শূন্য পদ পূরণের বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে। শিক্ষকরা পদোন্নতি পেলে দ্রুত পদায়ন করা হবে।’
 

আরও পড়ুন

×