অর্থ আর শর্তের জালে আটকা নগর ভবন
নগর ভবনের নান্দনিক নকশা হয়েছে। কিন্তু এই ভবন কবে উঠবে তা কেউ বলতে পারছেন না - সমকাল
আবদুল্লাহ আল মামুন
প্রকাশ: ০৫ অক্টোবর ২০২৫ | ০৬:৩০
| প্রিন্ট সংস্করণ
চট্টগ্রাম নগরের আন্দরকিল্লা মোড়। রাস্তার পাশের দেয়ালে একটি ফলক ঝুলছে দেড় দশক ধরে; যেটিতে লেখা আছে ‘নগর ভবন, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন। ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন আলহাজ এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী।’ তারিখ লেখা আছে– ১১ মার্চ, ২০১০। ওপরে নগর ভবনের নকশার একটি ছবি। বছরের পর বছর ধরে এভাবে নামফলকে ঝুলছে নগর ভবন। এরই মধ্যে চারজন মেয়র দায়িত্ব পালন করেছেন। তারা বিভিন্ন সময় কাজ শুরু করেছিলেন। কিন্তু অর্থাভাবে কাজ এগোয়নি। সরকারও ‘নগর ভবন’ প্রকল্পটি পাস করেনি। বর্তমান ডা. শাহাদাত হোসেনও নগর ভবন প্রকল্পটি পাস করাতে তোড়জোড় করছেন। কিন্তু তাকে ঋণ নেওয়ার শর্ত জুড়ে দিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়। এ কারণে এবারও নগর ভবন বাস্তবে নির্মাণ হবে কিনা, তা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে।
সিটি করপোরেশন সূত্রে জানা গেছে, ২০১০ সালের ১১ মার্চ নগর ভবনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন তৎকালীন মেয়র এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী। সিটি করপোরেশনের নিজস্ব অর্থায়নে ভবনটি নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছিল ৪৮ কোটি ৮৫ লাখ ৫৬ হাজার টাকা। প্রাথমিকভাবে নির্মাণকাজ শুরু করা হয়েছিল। কিন্তু ২০১০ সালের ১৭ জুন অনুষ্ঠিত সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মহিউদ্দিন চৌধুরী পরাজিত হলে নগর ভবন নির্মাণকাজ বন্ধ হয়ে যায়। ভেস্তে যায় নগর ভবনের স্বপ্ন। ২০১৪ সালে মেয়র এম মনজুর আলমের নির্দেশে পুনরায় কাজ শুরু হয়। তার আমলে নগর ভবনের কাজ শেষ করারও ঘোষণা দেন তিনি। কিন্তু এক বছর না পেরুতেই টাকা পরিশোধ না করায় কাজ বন্ধ করে দেয় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। ফলে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের নগর ভবন নাম ফলকেই আটকে থাকে।
২০১৫ সালে আ জ ম নাছির উদ্দীন মেয়র নির্বাচিত হওয়ার পর নগর ভবন নির্মাণে পুনরায় তোড়জোড় শুরু করেন। নকশাও চূড়ান্ত করা হয়। নকশা অনুযায়ী ২৩ তলার পরিবর্তে তিনতলা বেজমেন্টসহ ২৫ তলাবিশিষ্ট নগর ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়। ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে ভবনটি নির্মাণের চেষ্টা চালানো হলেও অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে অনুমোদন না পাওয়ায় সেই উদ্যোগও ভেস্তে যায়। ২০২১ সালে মেয়র নির্বাচিত হয়ে নিজস্ব অর্থায়নে নগর ভবন নির্মাণের ঘোষণা দেন রেজাউল করিম চৌধুরী। ২০২৬ সালের ৬ মে নির্মাণকাজেরও উদ্বোধন করেন তিনি। কিন্তু উদ্বোধনের পর আর কোনো কাজ হয়নি।
সিটি করপোরেশনের প্রকৌশল বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, আধুনিক নগর ভবন নির্মাণ করতে ২০১৯ সালে ২০২ কোটি টাকার একটি প্রকল্প প্রস্তাব স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। এতদিন প্রকল্পটি বিভিন্ন দপ্তরে ঘুরপাক খাচ্ছিল। অবশেষে ২০২৫ সালের ৮ মে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ প্রকল্পটিতে অর্থায়নের সম্মতি দেয়। কিন্তু তাতে কিছু শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়। মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব রুখসানা রহমান স্বাক্ষরিত চিঠিতে বলা হয়, প্রস্তাবিত প্রকল্পের জিওবি (সরকারি অনুদান) অংশের ১৬১ কোটি ৯১ লাখ টাকার মধ্যে ৬০ শতাংশ ঋণ হিসেবে দেওয়া হবে। এর পরিমাণ
৯৭ কোটি ১৪ লাখ টাকা। আর বাকি ৪০ শতাংশ অর্থাৎ ৬৪ কোটি ৭৬ লাখ টাকা অনুদান হিসেবে দেওয়া হবে।
এছাড়াও সাতটি শর্ত দেওয়া হয়। প্রথম শর্তে বলা হয়, সরকারি ঋণের ক্ষেত্রে সুদের হার ৫ শতাংশ। দ্বিতীয় শর্তে বলা হয়েছে, ঋণ পরিশোধের সময়সীমা ২০ বছর। তিন মাস অন্তর অন্তর ঋণের টাকা পরিশোধ করতে হবে। এর মধ্যে ঋণ নেওয়া ও কিস্তি শোধ শুরুর মধ্যকার বিরতি (গ্রেস পিরিয়ড) হিসেবে পাঁচ বছর সময় অন্তর্ভুক্ত। সাধারণত প্রথম কিস্তি পাওয়ার পরের পাঁচ বছরকে গ্রেস পিরিয়ড ধরা হয়। তিন নম্বর শর্তে বলা হয়েছে, প্রকল্পটি অনুমোদিত হলে অর্থ বিভাগের সঙ্গে একটি ঋণচুক্তি করতে হবে। চার নম্বর শর্ত হলো—প্রস্তাবিত ব্যয় মধ্যমেয়াদি বাজেট কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ রেখে বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। নিজস্ব তহবিলের অংশের ব্যয় নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে পাঁচ নম্বর শর্তে। ছয় নম্বর শর্তে প্রতিবছর নিরীক্ষা প্রতিবেদন যথাসময়ে পরিশোধ করার কথা এবং সাত নম্বর শর্তে ঋণের টাকা নিয়মিত পরিশোধ করার কথা বলা হয়েছে।
তবে সিটি মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, ‘সিটি করপোরেশন একটি সেবা সংস্থা। এই প্রকল্প থেকে আয় করার কোন সুযোগ নেই। তাহলে ঋণ নিলে শোধ করবো কি করে? তাছাড়া প্রতিমাসে বেতন-ভাতা বাবদ ব্যয় হয় ৩২ কোটি টাকা। এগুলো জোগাড়েই হিমশিম খেতে হয় সিটি করপোরেশনকে। এর বাইরে দেনা আছে ৪০০ কোটি টাকার বেশি।’
১৮৬৪ সালে আন্দরকিল্লা মোড়ে তখনকার মিউনিসিপ্যাল করপোরেশনের কার্যালয় স্থাপন করা হয়। পরে ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় সেই ভবনটি ভেঙে ফেলা হয়। ওই পুরনো ভবনের পাশে গত শতকের ষাটের দশকে শুরুতে তিনতলা ও পরে ছয়তলা নগর ভবন করা হয়। ২০১৯ সালের জুনে অস্থায়ী নগর ভবন টাইগারপাসে স্থানান্তর করা হলে আন্দরকিল্লার সেই ছয়তলা ভনটিও ভেঙে ফেলা হয়। টাইগারপাসে বাটালী হিলের পাদদেশে বস্তিবাসীদের পুনর্বাসনে নির্মিত ছয়তলা ভবনকে অস্থায়ী কার্যালয় হিসেবে ব্যবহার করছে সিটি করপোরেশন।
- বিষয় :
- নগর ভবন
