বন্ধুকে আমলকী খাইয়ে সাড়ে ৪ লাখ টাকা লুট
আব্দুল্লাহ আল মামুন
প্রকাশ: ১২ অক্টোবর ২০২৫ | ০৬:৩৬
| প্রিন্ট সংস্করণ
চট্টগ্রাম নগরের বন্দর থানার পোর্ট কলোনি এলাকায় এক চাকরিজীবীর সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে প্রতারণার মাধ্যমে সাড়ে চার লাখ টাকা আত্মসাৎ করার অভিযোগ উঠেছে এক তরুণের বিরুদ্ধে। অভিযোগের মূল আসামি মো. রাসেল চৌধুরী (২১), যিনি প্রতারণা ও হ্যাকিং চক্রের সক্রিয় সদস্য বলে দাবি করেছেন মামলার বাদী মোহাম্মদ ইব্রাহিম (৩১)। ঘটনাটি ঘটে গত ১৫ সেপ্টেম্বর রাত ১২টার দিকে বন্দর থানাধীন পোর্ট কলোনি এলাকার এক সরকারি কোয়ার্টারে।
গত ২৪ সেপ্টেম্বর প্রতারণার শিকার মোহাম্মদ ইব্রাহিম ওই ঘটনায় রাসেল চৌধুরীসহ পাঁচজনের বিরুদ্ধে চট্টগ্রাম মহানগর আদালতে মামলা করেছেন। আদালত পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনকে (পিবিআই) মামলাটি তদন্তের দায়িত্ব দিয়েছেন।
মো. রাসেল চৌধুরী (২১) বাঁশখালী উপজেলার রত্নপুর গ্রামের মফিজুল আলমের ছেলে। তিনি কুমিল্লা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-৪-এ লাইন ক্রু লেভেল-১ চাকরি করতেন। প্রতারণার মাধ্যমে টাকা হাতিয়ে নেওয়ায় চাকরিও হারিয়েছেন তিনি।
বাদী মোহাম্মদ ইব্রাহিম বলেন, ‘রাসেল একই এলাকার ছেলে, তাই ওকে আমি ভালোভাবেই চিনতাম। ও মাঝেমধ্যে আমার বাসায় আসত, বাজারে আড্ডা দিত। ঘটনার দিন রাত ১০টার দিকে বন্দর এলাকার নতুন মার্কেটে দেখা হলে আমি ওকে বাসায় নিয়ে যাই। আপ্যায়ন করতে গিয়েই সর্বনাশ হয়ে গেল।’
বাদীর অভিযোগ অনুযায়ী, রাসেল তার সঙ্গে কথা বলতে বলতে একপর্যায়ে একটি আমলকী খেতে দেন এবং মাথায় হাত বুলিয়ে দেন। এরপর তিনি অস্বাভাবিক বোধ করতে শুরু করেন। পরে রাসেলের কথামতো নিজের মোবাইল ফোন তার হাতে তুলে দেন।
বাদীর ভাষ্য, ‘ও কৌশলে আমার ব্যাংকের পিন সংগ্রহ করে নেয়। এরপর সোনালী ব্যাংকের আমার ই-ওয়ালেট থেকে চার দফায় ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা তার নিজের ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের (ইউসিবি) খাতুনগঞ্জ শাখার অ্যাকাউন্টে ট্রান্সফার করে ফেলে।’
সেই রাতেই রাসেল স্বাভাবিকভাবে বিদায় নিয়ে চলে যায়। সকালে ঘুম থেকে উঠে মোবাইল চেক করতে গিয়ে ইব্রাহিম দেখেন, ফোনে সিম কার্ড নেই। ব্যাংক অ্যাকাউন্টে লগইন করে তিনি দেখেন, সব টাকা তুলে নেওয়া হয়েছে।
মামলায় রাসেলের পাশাপাশি আসামি করা হয়েছে তার বাবা মফিজুল আলম, ভাই জাহেদুল ইসলাম ও নাহিদুল ইসলাম এবং বন্ধু মো. জিহানকে। বাদীর অভিযোগ, রাসেল এ ধরনের প্রতারণার সঙ্গে জড়িত একটি চক্রের সদস্য। তিনি বিভিন্ন সময় মোবাইল হ্যাক করে বা বিকাশ/ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা হাতিয়ে নেন, আর পরিবারের সদস্যরা ওই টাকার ভাগ নেন। অভিযোগে বলা হয়, রাসেল চুরি বা প্রতারণার মাধ্যমে পাওয়া অর্থ তার পরিবারের সদস্যদের কাছে হস্তান্তর করেন, তারা সেই টাকায় সুদে টাকা লেনদেনসহ বিভিন্ন ব্যবসা করে আসছেন।
ঘটনার পরপরই তিনি থানায় গিয়ে অভিযোগ দায়ের করলেও পুলিশ তা আমলে নেয়নি বলে অভিযোগ করেন বাদী মোহাম্মদ ইব্রাহিম। তিনি বলেন, ‘আমি থানায় গিয়ে সবকিছু খুলে বলেছি। কিন্তু কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এরপর বাধ্য হয়ে আদালতে মামলা করি।’ তিনি আরও বলেন, ‘রাসেলের বাবার সঙ্গে যোগাযোগ করলে উল্টো আমাকে হুমকি দেয়। বলেছিল, মামলা করলে আমাকেই জেলে দেবে।’
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে রাসেল চৌধুরীর বাবা মফিজুল আলম হুমকি দেওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করেছেন। তবে ছেলের প্রতারণার কথা স্বীকার করে বলেন, ‘আমার ছেলেটা জুয়া খেলায় জড়িয়ে প্রতারক হয়ে উঠেছে। পল্লী বিদ্যুতে চাকরি করত। সেখানেও লোকজনের কাছ থেকে নানাভাবে অনেক টাকা নিয়ে পালিয়ে গেছে। তারা তাকে ধরিয়ে দিতে পুরস্কারও ঘোষণা করেছে। আমার নিজের কাছ থেকেও প্রতারণা করে এক লাখ ১০ হাজার টাকা নিয়ে গেছে। আমার পুরো পরিবারকে ধ্বংস করেছে ছেলেটা। তাকে ও তার বন্ধু জিহানকে গ্রেপ্তার করলে সব বেরিয়ে আসবে।’
বাদী ও স্থানীয় কয়েকজন জানান, রাসেল চৌধুরী অতীতেও প্রতারণার ঘটনায় জড়িত ছিল। সে একাধিকবার মোবাইল হ্যাকিং, বিকাশের সিম চুরি এবং ই-ওয়ালেট থেকে টাকা আত্মসাতের ঘটনা ঘটিয়েছে। বন্দর ও চান্দগাঁও এলাকায় রাসেলের বিরুদ্ধে এর আগেও মৌখিক অভিযোগ উঠেছে বলে জানান স্থানীয় বাসিন্দারা। তারা বলেন, ‘রাসেল একজন চতুর ছেলে। খুব ভদ্রভাবে সম্পর্ক গড়ে তারপর সুযোগ বুঝে প্রতারণা করে।’
পিবিআই চট্টগ্রাম মেট্রোর উপপরিদর্শক মাসুদ আলম বলেন, ‘মামলার নথি হাতে পেয়েছি। প্রাথমিকভাবে তথ্য যাচাই চলছে। ব্যাংক ট্রান্সফারের নথি এবং আসামিদের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় বিশ্লেষণ করে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
- বিষয় :
- টাকা লুট
