ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

লক্ষ্মীপুরের চার আসনে জয়ের মূলে চার কারণ

লক্ষ্মীপুরের চার আসনে জয়ের মূলে চার কারণ
×

শাহাদাত হোসেন সেলিম, আবুল খায়ের ভূঁইয়াশহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানী, এবিএম আশরাফ উদ্দিন নিজান

 মো. আতোয়ার রহমান মনির, লক্ষ্মীপুর

প্রকাশ: ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ১৩:৩৯ | আপডেট: ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ১৪:১০

| প্রিন্ট সংস্করণ

জাতীয় সংসদ নির্বাচনে লক্ষ্মীপুরের চারটি আসনেই বিএনপি প্রার্থীদের জয়লাভের পর এখন আলোচনায়– কোন সমীকরণে এই জয় এলো, কোথায় কোন কৌশল কাজ করেছে, আর কোথায় পিছিয়ে পড়লেন প্রতিদ্বন্দ্বীরা। মাঠপর্যায়ের খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, দলীয় ঐক্য, ভোটকেন্দ্র ব্যবস্থাপনা, নীরব সমর্থন এবং বিভক্ত প্রতিপক্ষ– এ চার কারণই বেশির ভাগ আসনে ফল নির্ধারণে বড় ভূমিকা রেখেছে।

লক্ষ্মীপুর–১
লক্ষ্মীপুর-১ আসনে ঐক্যের কারণে জয়ের হাসি ফুটেছে শাহাদাত হোসেন সেলিমের মুখে। হেরে গেছেন প্রতিদ্বন্দ্বী মাহবুব আলম। রামগঞ্জে ফল ঘোষণার পর দেখা যায়, দলীয় ঐক্য, গ্রামভিত্তিক নেটওয়ার্ক এবং শেষ সপ্তাহের নিবিড় গণসংযোগ ধানের শীষের প্রার্থীর জয় সহজ করেছে। স্থানীয় বিশ্লেষকদের মতে, আগে বিভক্ত থাকা কয়েকটি উপদল মনোনয়ন ঘোষণার পর এক মঞ্চে আসে; কেন্দ্র থেকে ইউনিয়ন পর্যন্ত এক বার্তা দেওয়া হয়– ভোট ও পাহারা দুটোই নিশ্চিত করতে হবে।

বিএনপির নির্বাচন পরিচালনায় যুক্তদের দাবি, আওয়ামী লীগের ভোটারদের বড় একটি অংশ প্রকাশ্যে না এলেও নীরব সমর্থন দিয়েছে। সংখ্যালঘু ভোটারদের মধ্যেও নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার বার্তা কাজ করেছে বলে তারা মনে করেন। অন্যদিকে, ইসলামী ভোট ভাগ হয়ে যাওয়ায় মাহবুব আলম তার সম্ভাব্য কোর ভোট একত্র করতে পারেননি। ভোটার রহিম উদ্দিন বলেন, ‘ঝামেলা ছাড়াই ভোট দিতে পেরেছি, এটাই বড় কথা। এখন কাজ দেখতে চাই।’
হারের কারণ জানতে চাইলে মাহবুব আলম বলেন, ‘সংগঠনগত দুর্বলতা ছিল, তবুও আমরা লড়েছি। মানুষের রায় মেনে নিচ্ছি।’
জয়ের পর শাহাদাত হোসেন সেলিম বলেন, ‘এটা জনগণের বিজয়। অগ্রাধিকার দেব মাদক ও সন্ত্রাস প্রতিরোধ, কর্মসংস্থান এবং আইনশৃঙ্খলা উন্নয়নে।’

লক্ষ্মীপুর-২ (রায়পুর-সদর আংশিক)
এই আসনে ধানের শীষের প্রার্থী আবুল খায়ের ভূঁইয়া পেয়েছেন ১ লাখ ৪৬ হাজার ৩২১ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী এসইউএম রুহুল আমিন ভূঁইয়া পেয়েছেন ১ লাখ ৩৩ হাজার ৬৯৮ ভোট। জয় ব্যবধান ১২ হাজার ৬২৩। এ আসনের জয়-পরাজয়ে রাজনৈতিক ঐতিহ্য বড় ভূমিকা রেখেছে। প্রবীণ ভোটার ও পরিবারভিত্তিক ভোটব্যাংক ছিল বিএনপির শক্তি। মাঠকর্মীরা সকাল থেকেই ভোটার উপস্থিতি নিশ্চিত করেন। জামায়াত প্রার্থী উন্নয়ন ইস্যু তুললেও সাংগঠনিক নেটওয়ার্কে পিছিয়ে ছিলেন। স্থানীয়দের মতে, আওয়ামী লীগের ভোটের একটি অংশও বিএনপির দিকে গেছে। জয়ের পর আবুল খায়ের ভূঁইয়া বলেন, ‘মানুষ যে আস্থা রেখেছে তা উন্নয়নের মাধ্যমে ফিরিয়ে দেব। চরাঞ্চল রক্ষা ও জীবিকায় সহায়তা অগ্রাধিকার পাবে।’

লক্ষ্মীপুর-৩ (সদর)
লক্ষ্মীপুর-৩ আসনে জয় পেয়েছেন শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি। দুই দফা এমপি থাকার অভিজ্ঞতা এবং দৃশ্যমান উন্নয়ন তার পক্ষে গেছে। এখানে বিএনপি ঐক্যবদ্ধভাবে মাঠে ছিল। তরুণ ভোটারদের বড় অংশ উন্নয়নের ধারাবাহিকতা বিবেচনায় তাকে সমর্থন করে। এ্যানি পেয়েছেন ১ লাখ ৩৫ হাজার ৬১২ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী রেজাউল করিম পেয়েছেন ১ লাখ ২২ হাজার ৮০২ ভোট। জয় ব্যবধান ১২ হাজার ৮১০। এ্যানি বলেন, “পরিকল্পিত শহর, কর্মসংস্থান, নিরাপত্তা—এই তিনটিই অগ্রাধিকার।” রেজাউল করিম বলেন, “রাজনীতি মানে মানুষের পাশে থাকা, সেটাই করব।”

লক্ষ্মীপুর–৪ (রামগতি–কমলনগর)
লক্ষ্মীপুর–৪ আসনে উপকূলীয় উন্নয়ন ও দুর্যোগে উপস্থিতির স্মৃতি এগিয়ে দিয়েছে এবিএম আশরাফ উদ্দিন নিজান-কে। স্থানীয়দের ধারণা, আওয়ামী লীগের ভোটের একটি অংশও তার দিকে গেছে। নিজান পেয়েছেন ১ লাখ ১৫ হাজার ১৯৯ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী আশরাফুর রহমান হাফিজউল্লাহ পেয়েছেন ৭৩ হাজার ৭৫৬ ভোট। জয় ব্যবধান ৪১ হাজার ৪৪৩।

নিজান বলেন, “এটি জনগণের বিজয়। সবাইকে সঙ্গে নিয়ে পরিকল্পিত উন্নয়নে কাজ করব।” তিনি আরও বলেন, “উপকূল রক্ষা, টেকসই বাঁধ, সন্ত্রাস ও মাদকদমনে কাজই হবে আমার অগ্রাধিকার।

লক্ষ্মীপুরের চার আসনে ছোট দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা প্রচারে সক্রিয় থাকলেও ফলাফলে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলতে পারেননি। তারা দুর্নীতিদমন, স্থানীয় সরকারে স্বচ্ছতা, তরুণদের কর্মসংস্থান ও নিরাপত্তার মতো ইস্যু সামনে এনেছিলেন। বিভিন্ন এলাকায় উঠান বৈঠক, লিফলেট বিতরণ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারণাও চালান।

তবে শক্তিশালী সাংগঠনিক কাঠামো, কেন্দ্রভিত্তিক এজেন্ট এবং ভোটার উপস্থিতি নিশ্চিত করার সক্ষমতায় বড় দলগুলোর সঙ্গে পাল্লা দিতে পারেননি তারা। অনেক ভোটার বলেছেন, “কথা ভালো, কিন্তু জিততে পারবে কে—শেষে সেটা ভেবেই ভোট দিয়েছি।”

নির্বাচনের পর ছোট দলের কয়েকজন প্রার্থী জানিয়েছেন, তারা হতাশ নন; বরং ভবিষ্যতের জন্য সংগঠন গোছাতে মাঠে থাকবেন। সাধারণ ভোটাররা আশা করছেন—রাজনৈতিক বিভেদ ভুলে জেলার উন্নয়নে সবাই একসঙ্গে কাজ করবেন।

আরও পড়ুন

×