কেন থামছে না মানব পাচার
ছেলের পাঠানো চিঠি দেখাচ্ছেন পাচারের শিকার স্কুলপড়ুয়া আনাছের মা ছমুদা বেগম সমকাল
টেকনাফ (কক্সবাজার) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ১৯ এপ্রিল ২০২৬ | ০৭:৩৮
| প্রিন্ট সংস্করণ
কেন থামছে না মানব পাচার? এই প্রশ্ন এখন রোহিঙ্গা অধ্যুষিত টেকনাফের উপকূলজুড়ে। মিয়ানমার থেকে রোহিঙ্গাদের আগমনের পর থেকে এই অঞ্চলে সাগরপথে মানব পাচার বেড়েছে। সীমান্ত এলাকা হওয়া, দালালচক্রের দৌরাত্ম্য ও প্রশাসনিক শিথিলতার কারণে মানব পাচারের রাশ টানা যাচ্ছে না বলে সংশ্লিষ্টদের অভিমত।
টেকনাফ উপকূল থেকে সাগরপথে মালয়েশিয়ার দূরত্ব আনুমানিক দেড় থেকে ২ হাজার কিলোমিটার, যা প্রায় ৮০০ থেকে ১ হাজার ১০০ নটিক্যাল মাইলের সমান। তবে যাত্রার নির্দিষ্ট রুট, আবহাওয়া ও মাঝপথে থামার ওপর এই দূরত্ব ও সময় নির্ভর করে। অনেক ক্ষেত্রে পাচারকারীরা নজর এড়াতে সরাসরি পথে না গিয়ে ঘুরপথ ব্যবহার করে। ফলে যাত্রাপথ আরও দীর্ঘ ও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে হয়ে ওঠে। সাম্প্রতিক তথ্যে জানা গেছে, কিছু যাত্রীবাহী ট্রলার অনুকূল পরিস্থিতিতে ৫-৬ দিন সময় নিয়ে গন্তব্যে পৌঁছেছে।
উপকূলের বাসিন্দারা বলছেন, টেকনাফের ভৌগোলিক অবস্থানই পাচারকারীদের জন্য বড় সুবিধা। নাফ নদী ও কক্সবাজার থেকে টেকনাফ ৮০ কিলোমিটার অরক্ষিত মেরিন ড্রাইভ সড়কের অসংখ্য অরক্ষিত ঘাটে সহজেই নৌকা নামানো যায়। বিশেষ করে উখিয়ার ইনানীসহ শাহপরীর দ্বীপ, সাবরাং ও বাহারছড়ার কয়েকটি পয়েন্ট দীর্ঘদিন ধরে মানব পাচারের রুট হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।
কেন মানুষ ঝুঁকিপূর্ণ পথে বিদেশ যাচ্ছেন– এই প্রশ্নের জবাবে শাহপরীর দ্বীপের বাসিন্দা ইবনে আমিন বলেন, ‘দারিদ্র্য, বেকারত্ব এবং উন্নত জীবনের স্বপ্নই মূল কারণ। বিদেশে গেলেই জীবন বদলে যাবে– এই প্রলোভনে পড়ে অনেক তরুণ সবকিছু বিক্রি করে দালালদের হাতে নিজেদের তুলে দিচ্ছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘দালালদের বিরুদ্ধে দৃষ্টাস্তমূলক কোনো পদক্ষেপ না নেওয়ায় বারবার একই অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে তারা। মানব পাচার বন্ধ করতে হলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর ও ধারাবাহিক অভিযান এবং সংশ্লিষ্ট সবার সম্মিলিত উদ্যোগ জরুরি।’
স্থানীয় জেলেদের অভিযোগ, নির্দিষ্ট দালাল, রুট ও পাচারের পয়েন্ট সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট তথ্য থাকা সত্ত্বেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কার্যকর ও ধারাবাহিক অভিযান তেমন দৃশ্যমান নয়। মাঝে মধ্যে অভিযান পরিচালিত হলেও মূল হোতারা থেকে যায় ধরাছোঁয়ার বাইরে। তাদের দাবি, মানব পাচার চক্রটি শুধু স্থানীয় পর্যায়ে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এর সঙ্গে জড়িত রয়েছে একটি শক্তিশালী আন্তর্জাতিক চক্র। বিপুল অর্থ, রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে দালালরা বারবার আইনের ফাঁক গলে বেরিয়ে আসছে।
স্থানীয় রুবায়েত হোসাইন বলেন, ‘মানব পাচার বন্ধ করতে হলে বিচ্ছিন্ন অভিযান যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন সমন্বিত ও টার্গেটেড পদক্ষেপ। পাচারকারীদের আর্থিক নেটওয়ার্ক ভেঙে দেওয়া, সীমান্তে নজরদারি জোরদার, বিকল্প কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং সচেতনতা বৃদ্ধির এসব উদ্যোগ একসঙ্গে বাস্তবায়ন করতে হবে। পাশাপাশি আঞ্চলিক ও আন্তঃরাষ্ট্রীয় সহযোগিতা জোরদার করাও অত্যন্ত জরুরি। অন্যথায় এই উপকূল দিয়ে মানব পাচার কার্যত বন্ধ করা সম্ভব হবে না।’
শাহপরীর দ্বীপ ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য আব্দুল মান্নান বলেন, ‘মূলত রোহিঙ্গাদের আগমনের পর থেকেই টেকনাফ উপকূল দিয়ে মানব পাচার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। তবে দালালদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির অভাবেই এই অপরাধ থামছে না। তাই মানব পাচার চক্রগুলোর একটি নির্ভরযোগ্য তালিকা তৈরি করে তাদের কঠোর আইনি শাস্তি নিশ্চিত করা জরুরি।’
তিনি আরও বলেন, ‘সমুদ্রঘেঁষা কক্সবাজার থেকে টেকনাফ পর্যন্ত পুরো মেরিন ড্রাইভের অনেক অংশ এখনও অরক্ষিত। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে দালালরা বিভিন্ন পয়েন্ট থেকে নিয়মিত নৌকায় করে মানুষ পাচার করছে। ২০১৫ সালে মালয়েশিয়া-থাইল্যান্ড সীমান্তে গণকবরের ঘটনা সামনে আসার পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর অভিযানে কিছুদিন এ কার্যক্রম বন্ধ ছিল। কিন্তু পরবর্তীতে অভিযান শিথিল হওয়া এবং দালালদের যথাযথ শাস্তি না হওয়ায় তারা আবার সক্রিয় হয়ে উঠেছে।’
জানতে চাইলে কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (মুখপাত্র) দেবদূত মজুমদার বলেন, ‘মানব পাচার রোধে ইতোমধ্যে পুলিশের পক্ষ থেকে কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। নতুন ও পুরোনো দালালদের শনাক্ত করে তাদের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান ও গ্রেপ্তার কার্যক্রম পরিচালনার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।’
- বিষয় :
- মানব পাচার
