ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

শঙ্কিত শাহপরীর দ্বীপের মানুষ

শঙ্কিত শাহপরীর দ্বীপের মানুষ
×

 আবদুর রহমান, টেকনাফ (কক্সবাজার) 

প্রকাশ: ০৩ মে ২০২৬ | ০৭:০৭

| প্রিন্ট সংস্করণ

জলবায়ু পরিবর্তন, ঘূর্ণিঝড় ও নদীভাঙনের কারণে টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপে মানুষের বসতভিটা হারানোর ইতিহাস দীর্ঘ হচ্ছে। বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তঘেঁষা নাফ নদীর তীরে উপকূলবাসীর শেষ নিরাপদ আশ্রয়স্থল ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্রটিও এখন ভাঙনের মুখে। এতে চরম অনিশ্চয়তা ও আতঙ্কে দিন কাটছে হাজারো মানুষের। 

উপজেলার সাবরাং ইউনিয়নের শাহপরীর দ্বীপের ৭, ৮ ও ৯ নম্বর ওয়ার্ডের ১৩টি গ্রামে প্রায় ৪০ হাজার মানুষের বসবাস। নাফ নদী ও সাগরবেষ্টিত এ জনপদে প্রতিনিয়ত প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করেই টিকে থাকতে হচ্ছে তাদের। স্থানীয়দের ভাষ্য, গত এক দশকে ঘূর্ণিঝড় ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ভয়াবহ ভাঙনে অন্তত ৫ হাজার মানুষ তাদের ঘরবাড়ি হারিয়েছেন। ফলে প্রতিটি দুর্যোগের আগমনী বার্তা এখানে আতঙ্ক হয়ে নেমে আসে।

টেকনাফ শহর থেকে প্রায় ১৩ কিলোমিটার দূরে নাফ নদের তীরে জালিয়াপাড়ায় এখনও শতাধিক পরিবারের পাঁচ শতাধিক মানুষ চরম ঝুঁকিতে বসবাস করছেন। নতুন করে শুরু হওয়া ভাঙনে বিলীন হওয়ার পথে শুধু বসতভিটাই নয়, এলাকার একমাত্র ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্রটিও।
নদীপারের জরাজীর্ণ ঘরে বসবাসকারী ৫৩ বছর বয়সী আলমাজ খাতুন বলেন, ‘জোয়ারের পানি বাড়লে ঘরে থাকা যায় না। পানি বাড়লে অন্যের ঘরে যাই, কমলে আবার ফিরে আসি। যাওয়ার মতো স্থায়ী কোনো জায়গা নাই, একখান নিরাপদ থাকার জায়গা চাই।’ ঘূর্ণিঝড়ের সময় আশ্রয়ের প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘শেল্টারটাও ভাঙনের মুখে। এই অবস্থায় কেমনে ভরসা করুম? ঝড় শুরু হলেই বুক কাঁপে।’
উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কার্যালয় সূত্র জানায়, ১৯৯১ সালের ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড়ের পর উপকূলবাসীর নিরাপত্তার জন্য ১৯৯৩ সালে সৌদি আরবের অর্থায়নে শাহপরীর দ্বীপে তিনতলা সাইক্লোন শেল্টার নির্মাণ করা হয়। ৫০ শতাংশ জমির ওপর নির্মিত এ স্থাপনার আশপাশের অধিকাংশ জমি ইতোমধ্যে নদীতে বিলীন হয়েছে। বর্তমানে ভবনটি ছাড়া বাকি অংশ প্রায় নেই বললেই চলে। তবু এই ঝুঁকিপূর্ণ ভবনেই প্রায় এক হাজার শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে।

প্রতিবন্ধী স্বামীসহ পরিবারের ছয় সদস্য নিয়ে বসবাসকারী শাহেনা আক্তার বলেন, ‘আমাদের জীবন নাফ নদীর তীরে সংগ্রামের। সামান্য জোয়ারেই ঘরে পানি ঢুকে পড়ে। ঝোড়ো হাওয়া শুরু হলেই ভয় লাগে। আর ঘূর্ণিঝড়ের খবর এলে ঘুম হারাম হয়ে যায়। কারণ পাশের আশ্রয়কেন্দ্রটাও নিরাপদ না।’ তিনি জানান, একসময় যেখানে তিন শতাধিক পরিবারের বসতি ছিল, এখন সেখানে নদীর পানি। ১৯৯১ সালের ঘূর্ণিঝড়ের পর থেকে চারবার বসতি হারিয়েছেন তিনি। তার আশঙ্কা, বর্তমান বসতিটিও বেশি দিন টিকবে না।
স্থানীয় বাসিন্দা আবদুর গফুর বলেন, ‘এক পাশে নদী, অন্য পাশে বসতি। আশ্রয়কেন্দ্রটাও জিও ব্যাগ দিয়ে কোনোভাবে টিকিয়ে রাখা হয়েছে। ঝড় এলে কোথায় যাব, সেই চিন্তায় আমরা আতঙ্কে থাকি।’ তিনি অভিযোগ করেন, সংশ্লিষ্টদের অবহেলার কারণেই পরিস্থিতি এতটা খারাপ হয়েছে। সাবরাং ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য আব্দুস সালাম বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে নাফ নদীর তীরবর্তী মানুষ ধীরে ধীরে আশ্রয়হীন হয়ে পড়ছেন। ‘প্রতিবছর বিপুল অর্থ ব্যয় করে বালুর জিও ব্যাগ ফেলে ভাঙন ঠেকানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। কিন্তু তা স্থায়ী সমাধান নয়। নিরাপদ স্থানে নতুন আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ এখন জরুরি–বলেন তিনি।

এদিকে, টেকনাফের বাহারছড়ার বড় ডেইল এলাকার মাথাভাঙা সাইক্লোন আশ্রয়কেন্দ্রটিও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। দীর্ঘদিন সংস্কার না হওয়ায় এর অবস্থা নাজুক। পাহাড়ঘেরা এ এলাকায় ভারী বর্ষণে পাহাড়ধসের ঝুঁকিও বাড়ছে, যা স্থানীয়দের উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে তুলেছে। স্থানীয় ইউপি সদস্য ফরিদ উল্লাহ বলেন, ‘টানা বৃষ্টিতে পাহাড়ধসের আশঙ্কা থাকে। তার ওপর আশ্রয়কেন্দ্রটিও ঝুঁকিপূর্ণ। এতে বয়স্ক ও প্রতিবন্ধী মানুষ সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন।’
এ বিষয়ে টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইমামুল হাফিজ নাদিম বলেন, ‘বর্ষা মৌসুম সামনে রেখে উপকূলীয় এলাকার সব আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। যেসব শেল্টার 


ঝুঁকিপূর্ণ, সেগুলো সরেজমিনে পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা চলছে।” তিনি জানান, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাসকারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করা হচ্ছে।
কক্সবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী সালাউদ্দিন আহমদ বলেন, “জিও ব্যাগ ফেলে সাময়িকভাবে ভাঙন ঠেকানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। তবে নতুন করে ভাঙন শুরু হওয়ায় পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠেছে। স্থায়ী সমাধানের জন্য বড় ধরনের প্রকল্প প্রয়োজন।”
 

আরও পড়ুন

×