টেকনাফের ৪৫ শতাংশ নলকূপের পানি লবণাক্ত
প্রকৌশল অধিদপ্তরের গাড়ি থেকে কচ্ছপিয়া এলাকায় খাবার পানি বিতরণ করা হচ্ছে সমকাল
আব্দুর রহমান, টেকনাফ (কক্সবাজার)
প্রকাশ: ২৪ মে ২০২৬ | ০৬:৫৩
| প্রিন্ট সংস্করণ
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে টেকনাফের বিভিন্ন এলাকায় আশঙ্কাজনকভাবে নিচে নেমে গেছে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর। সেই সঙ্গে বাড়ছে লবণাক্ততার প্রকোপ। গত তিন বছরে উপজেলার প্রায় ৪৫ শতাংশ নলকূপের পানি লবণাক্ত হয়ে গেছে। ফলে সুপেয় পানির তীব্র সংকটে পড়েছেন উপকূলবাসী। মানুষ পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন।
আগে সেন্টমার্টিনে ১০ মিটার গভীর নলকূপে খাওয়ার পানি পাওয়া যেত, এখন ৫০ মিটারেও মেলে না। টেকনাফে দৈনিক খাবার পানির চাহিদা ২০ হাজার লিটার। এর মধ্যে নলকূপ থেকে ৯ হাজার লিটার চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে।
উপজেলা জনস্বাস্থ্য উপ-সহকারী প্রকৌশলী (ভারপ্রাপ্ত) মো. ফারুক হোসেন বলেন, ‘যেসব এলাকায় সুপেয় পানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে, সেখানে আমরা গাড়ির মাধ্যমে খাবার পানি সরবরাহ করছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘পরিস্থিতি এভাবে চলতে থাকলে ভবিষ্যতে সুপেয় পানির সংকট আরও ভয়াবহ রূপ নেবে। তাই এখন থেকেই লবণাক্ত পানি বিশুদ্ধকরণ এবং পাহাড়ি ঝরনার পানি সংরক্ষণ করে সুপেয় পানির প্লান্ট স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।’ সীমান্তবর্তী টেকনাফ পৌরসভা, সদর ইউনিয়ন, সাবরাং, হ্নীলা ও হোয়াইক্যংয়ে সুপেয় পানির সংকট সবচেয়ে বেশি। উপজেলা স্বাস্থ্য বিভাগ বলছে, গত পাঁচ বছরে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে রোহিঙ্গা অধ্যুষিত বাহারছড়া, হ্নীলা, শামলাপুর এবং সেন্টমার্টিন ও শাহপরীর দ্বীপের লোকজন পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হচ্ছে বেশি। চর্মরোগ, পেটের পীড়া, জ্বর, আমাশয়, কলেরা, টাইফয়েড, স্মরণশক্তি লোপ পাওয়া, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়রিয়ায় আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে। অনেক নলকূপে আর্সেনিক পাওয়া যাচ্ছে।
জানতে চাইলে টেকনাফ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা এনামুল হক বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে টেকনাফে সুপেয় পানির সংকট দিন দিন তীব্র হচ্ছে। অনেক মানুষ বাধ্য হয়ে লবণাক্ত পানি ব্যবহার করছেন। এর ফলে পানিবাহিত রোগে আক্রান্তের সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘এলাকার অনেক নলকূপের পানিতে আর্সেনিকের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। দীর্ঘদিন এমন পানি ব্যবহারে আর্সেনিকজনিত নানা জটিল রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে; যা পরবর্তী সময়ে ক্যান্সারের মতো গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণও হতে পারে।’
জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর বলছে, উপজেলার বিভিন্ন এলাকার পানিতে গ্রহণযোগ্য মাত্রার চেয়ে পানিতে ৯ গুণ বেশি লবণাক্ততা পাওয়া যাচ্ছে। অনেক সময় পানি থেকে দুর্গন্ধ ছড়ায়। হ্নীলায় আগে ৪৫০ মিটার গভীরে খাওয়ার পানি পাওয়া গেলেও বর্তমানে ৬৫০ মিটার যেতে হচ্ছে। আগে হোয়াইক্যংয়ে ৫০০ মিটারে খাওয়ার পানি মিলত, এখন যেতে হচ্ছে ৬৫০ মিটার, বাহারছড়ায় আগে ৩০০ মিটারে মিলত, এখন ৫৫০ মিটার, শাহপরীর দ্বীপে আগে ২০০ মিটারে মিলত, এখন ৪৫০ মিটার গভীরে যেতে হচ্ছে।
উপজেলার দুর্গম এলাকার অর্ধশতাধিক গ্রামে লক্ষাধিক লোকের বসবাস। তারা ঝরনা, ছড়া ও ঝিরি থেকে সংগৃহীত পানির ওপর নির্ভরশীল। দীর্ঘদিন অনাবৃষ্টি ও পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় এসব গ্রামে পানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। শুষ্ক মৌসুমে পাহাড়ের সব ঝরনা, ছড়া ও ঝিরি শুকিয়ে যায়। বছরে প্রায় পাঁচ মাস পানির সংকট থাকে।
হোয়াইক্যং ইউনিয়নের কানজরপাড়া গ্রামের বাসিন্দা নুর মোস্তফা বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে আমাদের এলাকায় এখন সুপেয় পানির তীব্র সংকট চলছে। বাধ্য হয়ে অনেকেই লবণাক্ত পানি ব্যবহার করছেন।’ হ্নীলা ইউনিয়নের লেচুয়াপ্রাং গ্রামের গৃহিণী ছেনোয়ার বেগম বলেন, ‘দুই কিলোমিটার দূর থেকে কলসি ভরে খাওয়ার পানি আনতে হয়। গোসল ও রান্নার কাজে ভরসা করতে হয় ছড়ার পানির ওপর।’
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এসএম অনীক চৌধুরী বলেন, ‘যেসব এলাকায় সুপেয় পানির তীব্র সংকট রয়েছে, সেখানে জরুরি ভিত্তিতে পানি সরবরাহের ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে পানির সংকট মোকাবিলায় একটি টেকসই প্রকল্প গ্রহণের পরিকল্পনা রয়েছে।’
- বিষয় :
- জনস্বাস্থ্য
