ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

চরাঞ্চলের শিশুরা পড়বে কোথায়

চরাঞ্চলের শিশুরা পড়বে কোথায়
×

দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় বিদ্যালয় ঘরটি জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে। তবু প্রতিদিন বিদ্যালয়ের সামনের মাঠে খেলা করে শিশুরা সমকাল

 আতোয়ার রহমান মনির, লক্ষ্মীপুর

প্রকাশ: ২৪ মে ২০২৬ | ০৬:৫৩

| প্রিন্ট সংস্করণ

১৯৯৪ সালে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা সোপিরেট জাপানের সহায়তায় লক্ষ্মীপুরের সদরের চর রমণী মোহন ইউনিয়নের বুড়িরঘাট বেড়িবাঁধ এলাকায় একটি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়। নদী ভাঙনকবলিত ও শিক্ষা সুবিধাবঞ্চিত মানুষের সন্তানদের প্রাথমিক শিক্ষার সুযোগ করে দিতে গড়ে ওঠা বিদ্যালয়টিতে এক সময় শতাধিক শিক্ষার্থী পড়াশোনা করত। এলাকার একটি পরিবার বিদ্যালয়ের জন্য জমিও দান করে। ছয় বছর পর বিদেশি দাতা সংস্থার অর্থায়ন বন্ধ হয়ে গেলে বিদ্যালয়টিও বন্ধ হয়ে যায়। ২০১৬ সালে আবারও এটির কার্যক্রম চালু হয়। টানা তিন বছর পাঠদান চললেও ২০১৯ সালের দিকে পুনরায় বন্ধ হয়ে যায় প্রতিষ্ঠানটি। গত ৭ বছরে বিদ্যালয়টি আর চালুর উদ্যোগ নেই।

বিদ্যালয়টি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় চরাঞ্চলের শতাধিক শিশু শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। কয়েক কিলোমিটারের মধ্যে কোনো সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় না থাকায় অনেক শিশুর পড়ালেখা বন্ধ হয়ে গেছে। তাদের কেউ নদীতে মাছ ধরছে, কেউ দিন কাটাচ্ছে খেলাধুলা ও ঘোরাঘুরিতে।
বর্তমানে বিদ্যালয়টির জরাজীর্ণ ভবনটি কেবল অতীতের স্মৃতি বহন করছে। ইটের দেয়াল ও টিনের চাল জীর্ণ হয়ে গেছে। স্কুলের মাঠ এখন ব্যবহার করা হচ্ছে ধান, সয়াবিন ও বিভিন্ন কৃষিপণ্য শুকানো ও সংরক্ষণের কাজে। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, এখনও মাঝেমধ্যে শিশু ও অভিভাবকরা বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে এসে দাঁড়িয়ে থাকেন। তাদের একটাই প্রশ্ন– কবে আবার চালু হবে স্কুলটি।
অভিভাবক মো. শাহ আলম বলেন, ‘আমাদের এলাকা থেকে সরকারি স্কুল অনেক দূরে। ছোট ছোট বাচ্চাদের এত দূরে পাঠানো সম্ভব হয় না। তাই তারা পড়াশোনা বাদ দিয়ে নদীতে মাছ ধরে বা খেলাধুলা করে সময় কাটায়।’

অভিভাবক নাছিমা বেগম বলেন, ‘আমরা গরিব মানুষ। শহরে নিয়ে সন্তানদের পড়ানোর সামর্থ্য নেই। সরকার যদি আবার বিদ্যালয়টা চালু করত, তাহলে আমাদের সন্তানরা লেখাপড়ার সুযোগ পেত।’ তিনি আরও বলেন, ‘চরাঞ্চলের শিশুদের শিক্ষার অধিকার নিশ্চিত করতে দ্রুত বিদ্যালয়টি সংস্কার ও পুনরায় চালুর উদ্যোগ নিতে হবে। পাশাপাশি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা কিংবা বিকল্প শিক্ষাব্যবস্থা চালু করাও জরুরি।’
স্থানীয় বাসিন্দা আবদুল কাদের বলেন, ‘বিদ্যালয়টি চালু থাকাকালে এ এলাকার অনেক ছেলেমেয়ে শিক্ষিত হয়েছে। এখন বন্ধ থাকায় নতুন প্রজন্ম অন্ধকারের দিকে চলে যাচ্ছে। একটি বিদ্যালয় না থাকায় পুরো চরাঞ্চল শিক্ষাবঞ্চিত হয়ে পড়ছে। নদীভাঙন, দারিদ্র্য আর অবহেলার বিরুদ্ধে প্রতিনিয়ত লড়াই করা মেঘনাপাড়ের মানুষ এখন অন্তত তাদের সন্তানদের হাতে বই তুলে দিতে চান। তাদের প্রত্যাশা, একটি বিদ্যালয়ই বদলে দিতে পারে পুরো এলাকার ভবিষ্যৎ।’
সোপিরেটের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো. নুরুল আলম বলেন, ‘কমিউনিটি লার্নিং সেন্টারের আওতায় জাপানি দাতা সংস্থার সহায়তায় আমরা কয়েকটি বিদ্যালয় পরিচালনা করতাম। অর্থায়ন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিদ্যালয়টির কার্যক্রম আর চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি।’
লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ক্যাথোয়াইপ্রু মারমা বলেন, ‘এই বিদ্যালয়টির বিষয়ে আমি আগে অবগত ছিলাম না। আপনাদের মাধ্যমে জানলাম। খোঁজখবর নিয়ে বিদ্যালয়টি পুনরায় চালুর বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের চেষ্টা করব।’

আরও পড়ুন

×