ফুটপাতে কাঁচাবাজার মানুষ হাঁটেন সড়কে
চন্দনপুরা সড়কের ফুটপাত দখল করে বসে সাবেরিয়া মাছবাজার সমকাল
শৈবাল আচার্য্য
প্রকাশ: ২১ জুন ২০২৬ | ০৭:১৭
| প্রিন্ট সংস্করণ
ঘরির কাঁটায় তখন বিকেল ৪টা। সবাই ব্যস্ত সড়কের ওপর নানা পাত্র ও ভ্রাম্যমাণ গাড়িতে মাছ, সবজির পসরা বসাতে ব্যস্ত দোকানিরা। যার যেভাবে ইচ্ছে সেভাবেই রাস্তার ওপর সাজাতে থাকেন পণ্যসামগ্রী। এতে আধঘণ্টার মধ্যেই সড়কের প্রায় অর্ধেক দখল হয়ে যায় ব্যবসায়ীদের পণ্যসামগ্রীতে। বিকেল ৫টা বাজতে না বাজতে ভ্যানে করে সবজি, মাছসহ নানা পণ্য নিয়ে সড়কের ওপর দাঁড়িয়ে পড়েন আরও কিছু ব্যবসায়ী। এতে সড়কের বেশির ভাগ অংশ ‘নাই’ হয়ে যায়। কিছুক্ষণের মধ্যে সেখানে হাজির হতে থাকেন অনেক নারী-পুরুষ। চলতে থাকে জমজমাট বেচাকেনা। এ কারণে সড়ক তো বটেই, ফুটপাতের চিহ্নও আর থাকে না। একদিকে ভাসমান পণ্য, অন্যদিকে ক্রেতা-বিক্রেতাদের প্রচণ্ড ভিড়ে এতবড় সড়কের অর্ধেক অংশে পথচারী ও যানবাহন চলাচলের উপায় থাকে না। ফলে তৈরি হয় দীর্ঘ যানজট। এতে চরম ভোগান্তিতে পড়তে হয় সাধারণ মানুষ ও পথচারীদের।
এই চিত্র চট্টগ্রাম নগরের অন্যতম ব্যস্ততম এলাকা আন্দরকিল্লা থেকে দেওয়ানবাজার, সাবেরিয়া সড়কের। ছোট-বড় বিক্রেতা ও মৌসুমি ব্যবসায়ীদের দখলে চলে যায় এই সড়কের অধিকাংশ অংশ। দোকানিদের দখলে চলে যায় সড়কের পাশে নির্মিত ফুটপাতও। ফলে সড়কের সম্প্রসারিত অংশ পথচারী কিংবা যাত্রীদের কাজে আসছে না। সড়কের এক পাশজুড়ে প্রতিদিন বসে বাজার, অন্য পাশের বেশির ভাগ অংশ থাকে অবৈধ পার্কিংয়ের দখলে। যে কারণে সড়কটি সম্প্রসারণ করার সুফল পাচ্ছে না এলাকাবাসী ও পথচারীরা। বিশেষ করে শুক্র ও শনিবার বাড়তি দোকানিরা নানা পণ্য নিয়ে বসে পড়েন সড়কেই। দীর্ঘদিন ধরেই এমন অবস্থা চলে আসলেও স্থায়ীভাবে দখলদারদের উচ্ছেদ করতে ব্যর্থ হচ্ছে প্রশাসন। যার খেসারত দিতে হচ্ছে অনেককেই। এতে নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে হচ্ছে স্থানীয় বাসিন্দাদেরও। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন কয়েকবার অভিযান চালিয়ে এ সড়ক থেকে অবৈধ কিছু দোকান উচ্ছেদ করলেও কিছুদিন যেতে না যেতেই আবারও সড়ক বেদখল হয়ে যায়।
চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের পরিচালিত জরিপের এক তথ্য বলছে, নগরের ৯৭ শতাংশ সড়কের একাংশই দখল হয়ে আছে। কোথাও অবৈধ দোকান, কোথাও পার্কিং। কোথাও কোথাও আবার বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহার হচ্ছে হাঁটাচলার ব্যস্ততম সড়ক। চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন মাস্টারপ্ল্যান প্রকল্পের আওতায় নগরের সড়ক ও ফুটপাতের অবস্থান জরিপের আরেক তথ্য বলছে, নগরের ৭১ শতাংশ ফুটপাত সম্পূর্ণ বা আংশিক দখলে চলে গেছে। ৬৮ শতাংশ ফুটপাতে হাঁটার উপযোগিতাও নেই।
সড়কটি দিয়ে প্রায়ই চলাচল করেন চকবাজার এলাকার বাসিন্দা রুমন ভট্টাচার্য। চলাচল করতে গিয়ে প্রতিনিয়ত চরম ভোগান্তিতে পড়ার অভিযোগ তার। রুমন ভট্টাচার্য বলেন, ‘যানজট নিরসন ও সাধারণ মানুষের যাতায়াত নির্বিঘ্ন করতেই ব্যস্ততম এই সড়কটি সম্প্রসারণ করা হয়েছিল। শুরুতে এর সুফলও মানুষ ভোগ করেছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে সড়কজুড়ে রাজত্ব শুরু হয় অবৈধ দোকানদারদের। এখানে যার যেভাবে ইচ্ছে সেভাবেই নানা পণ্যের পসরা বসিয়ে বসে পড়েন। রাস্তার ওপরেই ভ্যান গাড়িতে করে পণ্য নিয়ে বিক্রিও করেন দোকানিরা। সড়ক তো বটেই, দখলের কারণে ফুটপাতের চিহ্নও পাওয়া যায় না ব্যস্ততম এই সড়কের। এ যেন অভিভাবকহীন এক এলাকা। বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত এভাবেই রাস্তা-ফুটপাত দখল করে চলে ব্যবসা। যত দখল তত বাণিজ্য।’
বহদ্দারহাট এলাকার বাসিন্দা চাকরিজীবী কানিজ ফাতেমা বলেন, ‘চাকরির সুবাদে প্রতিদিন এ সড়ক দিয়েই যাতায়াত করতে হয়। সকালের দিকে কিছুটা স্বস্তি থাকলেও, বিকেলের পর থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত এ সড়কে যাতায়াত করতে গিয়ে কাহিল অবস্থার সম্মুখীন হতে হয়। অবৈধ দোকানের কারণে প্রায়ই লেগে থাকে দীর্ঘ যানজট। যে কারণে স্বাভাবিক গতিতে গাড়ি চালাতে পারেন না চালকরা। এ কারণে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বাসা থেকে কর্মস্থলে এবং কর্মস্থল থেকে বাসায় ফিরতে বাড়তি সময়ের প্রয়োজন হয়। অনেকক্ষণ গাড়িতেই বসে থাকতে হয় আমার মতো এ পথে যাতায়াতরত চাকরিজীবী মানুষদের।’
এক নম্বর সিটি সার্ভিস বাসের চালক মো. খোরশেদ বলেন, ‘৫ মিনিটের সড়কটি পার হতে ২০-৩০ মিনিট পর্যন্ত লেগে যায়। যানজট তৈরি হওয়ায় স্বাভাবিক গতিতে গাড়ি চালাতে পারি না। এ নিয়ে যাত্রীরা আমাদের ওপর ক্ষোভ ঝাড়ে। অথচ এতে আমরাও বিব্রত। এতে যাত্রীদের মতো গুরত্বপূর্ণ সময় নষ্ট হয় আমাদেরও।’
এ বিষয়ে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট চৈতী সর্ববিদ্যা বলেন, ‘সেখানে একাধিকবার অভিযান, সতর্কের পরও অবৈধ দখলদারদের রোধ করা যাচ্ছে না। অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করার পরও সেখানে আবারও দখলে নিয়ে ব্যবসা করছে কিছু ব্যবসায়ী-দোকানি। গত ৭ জুন আন্দরকিল্লা থেকে দেওয়ান বাজার পর্যন্ত সড়ক ও ফুটপাত দখল করে বসানো দেড় শতাধিক অবৈধ ভাসমান দোকান উচ্ছেদ করা হয়। এ সময় ফুটপাত ও সড়কে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির দায়ে চার ব্যক্তিকে জরিমানাও করা হয়েছে। জনসাধারণের চলাচলে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির অপরাধে চার ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা রুজু করা হয়। পাশাপাশি তাদের কাছ থেকে ১৮ হাজার টাকা জরিমানা আদায় করা হয়। দীর্ঘদিন ধরে ওই এলাকার ফুটপাত ও সড়ক দখল করে অবৈধভাবে ভাসমান দোকান বসানো হয়েছিল। এতে পথচারী ও যানবাহনের চলাচলে বিঘ্ন ঘটছিল। তিনি বলেন, ‘নগরকে পরিচ্ছন্ন, সুশৃঙ্খল ও চলাচল উপযোগী রাখতে প্রশাসনের পাশাপাশি নাগরিকদেরও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। আমরা এ কাজে নগরবাসীর সহযোগিতা কামনা করছি।’
- বিষয় :
- বাজার
