কানাডায় বাংলাদেশি স্বাস্থ্যকর্মীর বর্ণনা
ভয়কে জয় করেই করোনা নিয়ন্ত্রণ
কানাডার এডমন্টনের একটি সুপার শপে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে পণ্য কিনছেন ক্রেতারা- সংগৃহীত
ইন্দ্রজিৎ সরকার
প্রকাশ: ১৭ এপ্রিল ২০২০ | ১৩:৪৮ | আপডেট: ১৭ এপ্রিল ২০২০ | ১৪:১৪
'করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার আগেই মার্চের শুরুর দিকে কানাডার বিভিন্ন প্রদেশে জরুরি অবস্থা জারি করা হয়। বন্ধ করে দেওয়া হয় স্কুল-কলেজ, লাইব্রেরি, রেস্টুরেন্টসহ বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠান। আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য বিভিন্ন সহায়তা প্যাকেজ ঘোষণা করে সরকার। পাশাপাশি চিকিৎসা খাতকে আরও শক্তিশালী করা হয়। এমনিতেই এখানকার চিকিৎসা ব্যবস্থা বেশ ভালো। তারপরও ইতালি-স্পেনের অবস্থা দেখে পরিস্থিতি খারাপ হওয়ার আশঙ্কায় হাসপাতালগুলোর সক্ষমতা বাড়ানো হয়। আমাদের ৭৫০ শয্যার হাসপাতালে ৮০০ ভেন্টিলেটর ছিল। তা বাড়িয়ে এক হাজার ১০০ করা হয়। যদিও এখন পর্যন্ত মাত্র ৩০০টির ব্যবহার হচ্ছে। তা ছাড়া মানুষ এখানে যথেষ্ট সচেতন। ফলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের মধ্যে আছে। আক্রান্ত ৩০ হাজার ছাড়ালেও তাদের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ এরই মধ্যে সেরে উঠেছেন। মৃত্যুর হারও কম। মানুষের মধ্যে কিছুটা ভীতি হয়তো আছে, তবে তারা আতঙ্কিত নয়।'
কানাডার অ্যালবার্টা প্রদেশের রাজধানী এডমন্টনের রয়্যাল আলেক্সান্দ্রা হাসপাতালে কর্মরত বাংলাদেশি স্বাস্থ্যকর্মী সরদার মো. জামিল আজাদের বর্ণনায় এভাবেই উঠে এলো সেখানকার করোনাচিত্র। তিনি হাসপাতালটিতে নিবন্ধিত নার্স হিসেবে কাজ করেন। একসময় বাংলাদেশের মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটে বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ছিলেন।
১০ বছর আগে কানাডায় চলে যান। দেশটিতে কৃষি বিষয়ে কাজের সুযোগ কম থাকায় তিনি পরে স্বাস্থ্য বিভাগে যোগ দেন।
জামিল আজাদ জানান, এখনও সেখানে সাধারণ মানুষকে মাস্ক ব্যবহার করতে বলছে না সরকার। এমনকি রোগীর সংস্পর্শে না গেলে চিকিৎসক-নার্সদেরও মাস্ক পরা জরুরি নয় বলা হয়েছিল। তবে চার দিন আগে নতুন গবেষণার বরাত দিয়ে বলা হয়, যেহেতু কভিড-১৯ আক্রান্ত অনেকের বাহ্যিক লক্ষণ থাকে না, তাই সতর্কতা হিসেবে হাসপাতালে মাস্ক পরা ভালো।
জামিল আজাদ আরও বলেন, 'চিকিৎসকসহ সব স্বাস্থ্যকর্মীকে এখানে বিশেষ সম্মানের চোখে দেখা হচ্ছে। ম্যাকডোনাল্ডস স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য কফি ফ্রি করে দিয়েছে। অনেক স্থানেই পার্কিং ফি নেওয়া হচ্ছে না। বিভিন্ন মাধ্যম থেকে কৃতজ্ঞতা জানানো হচ্ছে, ধন্যবাদ দেওয়া হচ্ছে। এতে আমরা আরও ভালো সেবা দিতে উৎসাহিত হই। কিন্তু বাংলাদেশে সুরক্ষা সরঞ্জাম ছাড়া চিকিৎসা দিতে অপারগতা জানানোয় চিকিৎসকদের সমালোচনা হচ্ছে। এটা ঠিক নয়। চিকিৎসক মানুষকে সেবা দিতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ঠিকই, তবে নিজের জীবন বিপন্ন করে নয়। কানাডায় কর্তৃপক্ষই সুরক্ষা সামগ্রী ছাড়া সেবা দিতে নিষেধ করে দেয়। এখানে আগে থেকেই পিপিই ব্যবহারের নীতিমালা আছে। শুধু করোনা নয়, নিউমোনিয়া, যক্ষ্ণা, ডায়রিয়া বা অন্যান্য রোগে স্বাস্থ্যকর্মীরা নির্দিষ্ট পিপিই পরেই সেবা দেন। পিপিই ছাড়া করোনার চিকিৎসায় কাউকে ঠেলে দেওয়া মানে সৈনিককে অস্ত্র ছাড়া যুদ্ধের ময়দানে পাঠানো।'
তিনি জানান, এডমন্টনে ১৬ এপ্রিল পর্যন্ত ৮৫ হাজার ৫০০ জনের করোনা পরীক্ষা করা হয়েছে। এ মুহূর্তে তার হাসপাতালে চারজন করোনা রোগী আছেন। আক্রান্ত সন্দেহে আরও ৪০ জন আছেন আইসোলেশনে। দেশটিতে স্বাস্থ্যকর্মীদের মধ্যে সংক্রমণ খুব কম বলে চিকিৎসা দেওয়ার ক্ষেত্রে কারও মধ্যে কোনো দ্বিধা নেই।
কানাডার টেলিযোগাযোগ সেবাদানকারী একটি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত আছেন বাংলাদেশি মেহেরুল ইসলাম রাজীব। তিনি জানান, মানুষের সচেতনতার কারণেই দেশটিতে করোনার সংক্রমণ ঘটেছে কম। হাসপাতাল, ব্যাংক, গ্রোসারি শপের মতো কিছু জরুরি প্রতিষ্ঠান খোলা রয়েছে। গ্রোসারি শপের আয়তন অনুযায়ী একসঙ্গে ১৫ বা ২০ জন ঢুকতে পারছেন। বাকিদের লাইনে ছয় ফুট দূরত্বে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে হচ্ছে। দোকানের কোনো জিনিস না কিনলে তা ছোঁয়ার ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।
রাজীব বলেন, 'করোনা পরিস্থিতিতে কর্মহীন বা ক্ষতিগ্রস্তদের গড়ে দুই হাজার ডলার দিচ্ছে সরকার, যা অনেকের নিয়মিত আয়ের চেয়ে বেশি। ফলে জীবিকা নিয়ে কারও দুশ্চিন্তা নেই। এর পরও ব্যাংকের কিস্তি, ক্রেডিট কার্ডের বিল ইত্যাদি তিন মাসের জন্য স্থগিত করা হয়েছে। এখানে কর্তৃপক্ষ বললেই সবাই তা মেনে চলেন। তার পরও কেউ অমান্য করলে বড় অঙ্কের জরিমানা করা হচ্ছে। জরুরি প্রয়োজন ছাড়া কেউ ঘর থেকে বের হচ্ছেন না।'
