ঢাকা রোববার, ১২ জুলাই ২০২৬

আখতারের ১৪ বছরের দুর্বিষহ প্রবাস জীবন

আখতারের ১৪ বছরের দুর্বিষহ প্রবাস জীবন
×

ফাইল ছবি

কামরুল হাসান জনি, ইউএই

প্রকাশ: ০৮ জুন ২০২০ | ০৬:৩৬ | আপডেট: ০৮ জুন ২০২০ | ০৬:৩৯

বিদেশে গেলেই মোটা অংকের টাকা মেলে। দালালের এমন প্ররোচনায় পড়ে আমিরাতে পাড়ি জমান ৬০ বছর বয়সী আখতার হোসেন। একেকটি বেদনা বিধুর দিনের স্বাক্ষী হয়ে কেটে গেছে ১৪ বছর। এই সময়ের মাঝে হারিয়েছেন বাবা এবং মাকে। শেষ বিদায়ে দেখা হয়নি প্রিয় দুইটি মুখ। দীর্ঘ সময় ধরে দেখা নেই স্ত্রী-সন্তানের। স্থানীয়দের সহায়তায় বড় মেয়ের বিয়ে দেওয়া হলেও তার অংশগ্রহণ ছিল কেবল আর্শীবাদে। দুঃসহনীয় এই প্রবাসে ধীরে ধীরে তার ঘোর গেছে। এখন কেবলই অপেক্ষা শূন্য হাতে দেশে ফেরার।  

২০০৬ সালের কথা। চার চারটি কন্যা সন্তানের জনক আখতার হোসেন তাদের মানুষের মত মানুষ করার চিন্তায় বিভোর তখন। বাড়িতে বৃদ্ধ বাবা-মা। সংসারের বড় বোঝা মাথায় নিয়ে দালালের কথা মতো বেচে দেন বাবার দেওয়া ভিটেমাটি। সেই টাকায় পাড়ি জমান মরুর দেশ সংযুক্ত আরব আমিরাতে। বর্তমানে আমিরাতের প্রাদেশিক শহর আজমানে বসবাস করেন আখতার। বিমানে উঠার সময় যেই আগ্রহ, যেই স্বপ্ন ছিল তার চোখে মুখে- গত ১৪ বছরের বেঁচে থাকার সংগ্রামে সেসব মলিন হয়ে গেছে।  

দালাল বলেছিল দেওয়া হবে ভাল কোম্পানির চাকরি, ভাল বেতন। অথচ এর কিছুই দেখা মিলেনি। মিলেছে কেবল একটি ভবনে লিফট মেরামতের কাজ। দুই সপ্তাহ অনুশীলনের পর কৌশল আয়ত্ব করে কাজ শুরু হয় তার। শ্রমে ঘামে মাস শেষ হলেও বেতন নিতে গিয়ে খেতে হলো দ্বিতীয় ধাক্কা। যে বেতন ধরা হলো তা খাবার খরচ আর রুম ভাড়া পরিশোধেই শেষ।

বাড়িতে বৃদ্ধ বাবা-মা ও স্ত্রী-সন্তান আখতারের দিকে চেয়ে বসে থাকে। তার টাকায় সংসার চলার কথা। কিন্তু তার আর টাকা পাঠানো হয় না। সিদ্ধান্ত বদল করে অন্যত্র কাজের সন্ধান করলে মালিক পক্ষ সোজা জানিয়ে দিল, অন্য জায়গায় কাজ করতে গেলে মামলা করে দেশে ফেরত পাঠাবে। এক প্রকার বাধ্য হয়ে পালিয়ে যান আখতার। শুরু হয় প্রবাসের তিক্ত অধ্যায়। কোম্পানির ভিসা বাতিল করে দেওয়ায় অবৈধ প্রবাসী হিসেবে নাম উঠে তালিকায়। যতটুকু সম্ভব লুকিয়ে কাজ করেন। যতটুকু আয় হয় নিজের হাত খরচ রেখে বাকিটা এবার সংসারে পাঠান আখতার। এভাবেও ভাগ্য তার সঙ্গ দেয়নি। আমিরাতে আইন অনুযায়ী, অবৈধ শ্রমিক কাজে রাখলে মোটা অংকের জরিমানার বিধান থাকায় তাকে কেউই কাজে রাখতে চায় না। এরমধ্যে মা-বাবার মৃত্যুর সংবাদ আসে তার কাছে। আসে বড় মেয়ের বিয়ের খবরও। বাবা-মাকে শেষবার দেখা হয়নি তার। তবে বড় মেয়ের বিয়ের খরচ জোগাতে এগিয়ে এসেছিল স্থানীয় লোকজন। ভিসা না থাকায় তার আর ফেরাও হয়নি এই ১৪ বছর। 

আখতার জানান, ‌অবৈধ বসাবাসকারীদের ভিসা লাগানোর জন্য দু-তিন দফায় সুযোগ আসলেও পর্যাপ্ত টাকার অভাবে সুযোগ হাত ছাড়া করতে হয়েছে। এবার বৈশ্বিক মারামারি করোনাভাইরাসের (কভিড ১৯) কারণে আবার তিন মাসের জন্য বিশেষ সুযোগ দিয়েছে দেশটির সরকার। তাই আখতার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন দেশে ফেরার। শূন্য হাতে হলেও দেশে ফিরে জীবনের শেষ সময়টুকু স্ত্রী-সন্তাদের সঙ্গে কাটানোর প্রবল ইচ্ছা এখন তার চোখে-মুখে।

আরও পড়ুন

×