ঢাকা বুধবার, ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

বিদেশে মৃত্যুতে ‘শেষযাত্রার ‘ভার’ও প্রবাসীদের কাঁধে, দূতাবাসের সহায়তা নিয়ে প্রশ্ন

বিদেশে মৃত্যুতে ‘শেষযাত্রার ‘ভার’ও প্রবাসীদের কাঁধে, দূতাবাসের সহায়তা নিয়ে প্রশ্ন
×

পর্তুগাল প্রবাসী এক বাংলাদেশির মরদেহ। ছবি: সমকাল

পর্তুগাল প্রতিনিধি

প্রকাশ: ২১ আগস্ট ২০২৬ | ২১:০৭ | আপডেট: ২১ আগস্ট ২০২৬ | ২১:২০

উন্নত জীবন ও পরিবারের আর্থিক সচ্ছলতার আশায় প্রতিবছর বহু বাংলাদেশি পাড়ি জমাচ্ছেন পর্তুগালে। তবে প্রবাসজীবনের এই পথ সবার জন্য নিরাপদ নয়। গত এক বছরে দেশটিতে অসুস্থতা, সড়ক ও কর্মক্ষেত্রের দুর্ঘটনা, হত্যাকাণ্ডসহ বিভিন্ন ঘটনায় অন্তত ১২ বাংলাদেশি নাগরিকের মৃত্যু হয়েছে।

গত এক বছরে পর্তুগালে বাংলাদেশিদের মৃত্যুর কারণ ছিল নানা ধরনের। দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতা, ছুরিকাঘাত, নির্মাণকাজের দুর্ঘটনা, মোটরসাইকেল ও সড়ক দুর্ঘটনা এবং রেল দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন বাংলাদেশিরা। নিহতদের বড় একটি অংশই ছিলেন কর্মক্ষম বয়সি তরুণ বা মধ্যবয়সি।

সবশেষ ১৪ আগস্ট লিসবনের মার্তিম মনিজ এলাকায় নিজ বাসায় ঘুমের মধ্যে মারা যান যশোরের তরুণ জিহাদ (২৫)। স্বজন ও পরিচিতজনদের কাছ থেকে তার আকস্মিক মৃত্যুর খবর পাওয়া গেলেও মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট কারণ স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।

এর আগে, গত বছরের অক্টোবরে লিসবনে লিভারজনিত রোগে মারা যান বাংলাদেশি প্রকৌশলী শফিকুল ইসলাম শফিক (৩৮)। একই মাসে কোস্টা দা কাপারিকায় ছুরিকাঘাতে নিহত হন মোহাম্মদ শামিম।

২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে মাদেইরায় নির্মাণকাজের সময় সিমেন্টের বস্তা পড়ে মারা যান কামরুল ইসলাম। মার্চে ভিলা নোভা দে মিলফন্তেসে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় নিহত হন কানু রায় (৩২)।

মে মাসে আলগার্ভ অঞ্চলের মেক্সিলহোইরা গ্রান্দেতে একটি গাড়িকে ট্রেন ধাক্কা দিলে নিহত হন টাঙ্গাইলের রাম প্রসাদ সরকার (৩৬)। দুর্ঘটনার সময় গাড়িটিতে পাঁচ বাংলাদেশি ছিলেন।
জুলাইয়ের শুরুতে সেতুবাল জেলার আলমেদায় সড়ক দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হয়ে মারা যান সিলেটের শামসুল ইসলাম কামরান (২৫)।

প্রবাসে কোনো বাংলাদেশির মৃত্যু হলে পরিবারের জন্য সবচেয়ে বড় সংকটগুলোর একটি হয়ে দাঁড়ায় মরদেহ দেশে পাঠানোর খরচ ও প্রক্রিয়া। লিসবনের বাংলাদেশি কমিউনিটির কয়েকজনের দাবি, অনেক ক্ষেত্রে সহপ্রবাসী, বন্ধু ও বিভিন্ন সংগঠনের উদ্যোগে অর্থ সংগ্রহ করেই মরদেহ দেশে পাঠাতে হয়।

প্রবাসী ব্যবসায়ী মাসুম আহমেদের দাবি, শুধু ২০২৬ সালেই তার ব্যক্তিগত উদ্যোগে প্রায় ছয়জন বাংলাদেশির মরদেহ দেশে পাঠানো হয়েছে। তিনি বলেন, শুধু ২০২৬ সালেই আমরা প্রায় ছয়টা লাশ আমার উদ্যোগে দেশে পাঠিয়েছি। আমরা প্রবাসীরাই মিলেমিশে এসব লাশ দেশে পাঠিয়েছি। সবার কাছ থেকে চাঁদা তুলে, এক কথায় বলতে গেলে হাত পেতে লাশগুলো দেশে পাঠাতে হয়েছে।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ দূতাবাস, লিসবনের সঙ্গে ই-মেইল ও ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

পর্তুগাল প্রবাসী শাম্মী বেগম জানান, ‘আমি ২০২১ সাল থেকে পর্তুগালে কাজ করছি। দীর্ঘদিন ধরে আমি দেখছি, কোনো বাংলাদেশি প্রবাসী বিদেশে মারা গেলে অনেক সময় তার মরদেহ দেশে পাঠানোর জন্য বাংলাদেশি কমিউনিটির মানুষজন চাঁদা তুলে অর্থ সংগ্রহ করেন। বিষয়টি আমাদের জন্য অত্যন্ত কষ্টদায়ক।’

শাম্মী বেগম আরও জানান, একজন প্রবাসী সারাজীবন কঠোর পরিশ্রম করে দেশে রেমিট্যান্স পাঠান এবং দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। অথচ, মৃত্যুর পর তার মরদেহ দেশে পাঠানোর ক্ষেত্রেও যদি পরিবারকে বা কমিউনিটিকে অর্থ সংগ্রহ করতে হয়, তাহলে এটি সত্যিই অত্যন্ত দুঃখজনক।

তিনি বলেন, বাংলাদেশ সরকারের কাছে বিনীত অনুরোধ—বিদেশে কোনো বাংলাদেশি মারা গেলে তার মরদেহ সম্মানের সঙ্গে দেশে ফিরিয়ে নেওয়া হোক। এটি করতে সরকার যেন কার্যকরভাবে সহযোগিতা করে। প্রবাসীদের কল্যাণে এবং তাদের পরিবারের পাশে দাঁড়াতে এ বিষয়ে একটি সুস্পষ্ট সরকারি ব্যবস্থা থাকা অত্যন্ত জরুরি।

পর্তুগাল বাংলা প্রেসক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি রনি মুহাম্মদের দাবি, প্রায় এক যুগের প্রবাসজীবনে তিনি ১৫টিরও বেশি বাংলাদেশি নাগরিকের মরদেহ দেশে পাঠানোর প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।

তিনি বলেন, ‘একজন প্রবাসী মারা গেলে তার পরিবার অনেক সময় আর্থিকভাবে অসচ্ছল থাকে। তখন প্রবাসীদের কাছ থেকেই সহযোগিতা নিয়ে মরদেহ দেশে পাঠাতে হয়। এটি পরিবারের জন্য অত্যন্ত কষ্টের বিষয়।’ রনি মুহাম্মদের মতে, যারা প্রবাসে থেকে দেশে রেমিট্যান্স পাঠিয়ে অর্থনীতিতে অবদান রাখছেন। তাদের মৃত্যুর পর মরদেহ দেশে পাঠানোর ক্ষেত্রেও রাষ্ট্রের দায়িত্ব থাকা উচিত।

রনি মুহাম্মদ আরও বলেন, একজন রেমিট্যান্স যোদ্ধা মারা গেলে তার মরদেহ যেন সরকারি খরচে দেশে পাঠানো যায়, সে বিষয়ে বাংলাদেশ সরকারের ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।

প্রবাসীরা বলছেন, পর্তুগালে বাংলাদেশি অভিবাসীর সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কর্মক্ষেত্র, যাতায়াত, আবাসন, স্বাস্থ্যসেবা ও নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। গত এক বছরে প্রকাশ্যে আসা মৃত্যুর ঘটনাগুলো দেখিয়েছে, প্রবাসীদের ঝুঁকি শুধু কর্মক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ নয়; সড়ক দুর্ঘটনা, অপরাধ, আকস্মিক অসুস্থতা ও নির্মাণকাজের দুর্ঘটনাও কেড়ে নিচ্ছে তরুণদের প্রাণ।

পর্তুগাল বাংলা প্রেসক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি আরও বলেন, জীবিত অবস্থায় যারা দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখছেন, তাদের মৃত্যুর পরও রাষ্ট্রের দায়িত্ব থাকা উচিত। বিশেষ করে আর্থিকভাবে অসচ্ছল পরিবারের ক্ষেত্রে মরদেহ দেশে পাঠানোর সরকারি সহায়তা দ্রুত, স্বচ্ছ ও সহজ করার পাশাপাশি প্রবাসীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতেও কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন। তিনি প্রশ্ন তোলেন—বিদেশের মাটিতে একজন বাংলাদেশির শেষযাত্রার ভার কি সবসময় তার সহপ্রবাসীদের কাঁধেই থাকবে?

আরও পড়ুন

×