সনি ওয়ার্ল্ড ফটোগ্রাফি অ্যাওয়ার্ডস ২০২৬
ক্যামেরায় দুই তরুণের সাফল্য
‘দ্য প্লেস হোয়্যার আই ইউজড টু প্লে’ শিরোনামের এই ছবিতে স্টুডেন্ট ফটোগ্রাফার অব দ্য ইয়ার পুরস্কার জিতে নেন জুবায়ের আহমেদ অর্ণব
আলাউদ্দিন আলাদিন
প্রকাশ: ২৬ এপ্রিল ২০২৬ | ০৭:০৬ | আপডেট: ২৬ এপ্রিল ২০২৬ | ০৭:০৯
| প্রিন্ট সংস্করণ
১৬ এপ্রিল লন্ডনে সনি ওয়ার্ল্ড ফটোগ্রাফি অ্যাওয়ার্ডস ২০২৬-এর বিজয়ীদের নাম ঘোষণা করা হয়। বিশ্বের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ এই ফটোগ্রাফি প্রতিযোগিতায় দুটি উল্লেখযোগ্য পুরস্কার জিতে নেন জয় সাহা ও জুবায়ের আহমেদ অর্ণব। বিশ্বের দুই শতাধিক দেশ থেকে ৪ লাখ ৩০ হাজারেরও বেশি জমা পড়া ছবি থেকে সাফল্য ছিনিয়ে আনা দুই তরুণের স্বপ্নযাত্রার কথা তুলে ধরেছেন আলাউদ্দিন আলাদিন
বিশ্বের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ ফটোগ্রাফি প্রতিযোগিতার একটি ‘সনি ওয়ার্ল্ড ফটোগ্রাফি অ্যাওয়ার্ডস’। এবারে প্রতিযোগিতার ১৯তম আসর উজ্জ্বল হয়ে ওঠে বাংলাদেশের নাম। ১৬ এপ্রিল ২০২৬, লন্ডনে এক জমকালো গালা অনুষ্ঠানে বিজয়ীদের নাম ঘোষণা করা হয়। ফটোগ্রাফি জগতের বিখ্যাত ব্যক্তিত্ব, কিউরেটর, গ্যালারিস্ট ও মিডিয়া ব্যক্তিত্বদের সামনে পুরস্কার গ্রহণ করেন বিজয়ীরা। বাংলাদেশের পক্ষে দুটি উল্লেখযোগ্য পুরস্কার জিতে নিয়েছেন জয় সাহা ও জুবায়ের আহমেদ অর্ণব। এবারের প্রতিযোগিতায় বিশ্বের দুই শতাধিক দেশ থেকে ৪ লাখ ৩০ হাজারেরও বেশি ছবি জমা পড়ে। সেই বিপুল প্রতিযোগীর চোখে চোখ রেখে বাংলাদেশি দুই ফটোগ্রাফার বা চিত্রশিল্পী জুবায়ের আহমেদ অর্ণব ও জয় সাহা সাফল্য অর্জন করেন।
জয় সাহার হোমস অব হাওর
কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রামের হাওর অঞ্চলের বন্যাসহিষ্ণু স্থাপত্য নিয়ে তোলা জয় সাহার ফটো সিরিজ–হোমস অব হাওর। বিচারকদের মুগ্ধ করে এই সিরিজের ছবিগুলো। সিরিজটিতে জয় ধারণ করেছেন সেই অঞ্চলের মানুষদের জীবন; যেখানে প্রতিটি বাড়ি বর্ষায় পরিণত হয় পানিবেষ্টিত একটি দ্বীপে। উঁচু মাটির মঞ্চে তৈরি ঘরগুলো বন্যার পানি থেকে বাঁচতে মানুষের অভিযোজনী বুদ্ধিমত্তার প্রমাণ। সেই স্থাপত্যকে জয় সাহার ক্যামেরা তুলে ধরেছে এক নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে।
স্টুডেন্ট ফটোগ্রাফার অব দ্য ইয়ার: জুবায়ের আহমেদ অর্ণব
‘দ্য প্লেস হোয়্যার আই ইউজড টু প্লে’ শিরোনামেই বোঝা যাচ্ছে আধুনিকতার জাঁতাকলে পিষ্ট নগরায়ণের বুকে হাহাকার জন্মানো কিংবা নষ্টালজিয়ায় ভোগানো এই ছবির গল্প! বাস্তবেও তাই! ঢাকার কাউন্টার ফটো প্রতিষ্ঠানে সেন্টার ফর ভিজ্যুয়াল আর্টসে পড়াশোনা করা অর্ণব ফিরে গেছেন তাঁর পরিচিত এলাকা ঢাকার গ্রিন মডেল টাউনে। একসময় যেখানে খেলে বড় হয়েছিলেন, সেই পাড়া এখন দ্রুত নগরায়ণের গ্রাসে হারিয়ে যাচ্ছে। তাঁর ছবিগুলোর কাব্যিক ও স্বপ্নিল উপস্থাপনায় ধরা পড়েছে একটি পরিবর্তনশীল সমাজের গল্প। কংক্রিটের নিচে চাপা পড়া স্মৃতি ও মানবিক সম্পর্কের গল্পের ছবিই জুবায়ের আহমেদ অর্ণবকে এনে দিয়েছে স্টুডেন্ট ফটোগ্রাফার অব দ্য ইয়ার-এর সম্মাননা।
একটু পেছনে ফিরে...
সনি ওয়ার্ল্ড ফটোগ্রাফি অ্যাওয়ার্ডস আয়োজন করে ব্রিটিশ প্রতিষ্ঠান ‘ওয়ার্ল্ড ফটোগ্রাফি অর্গানাইজেশন’ বা ডব্লিউপিও। স্কট গ্রে ২০০৭ সালে এই সংস্থাটি প্রতিষ্ঠা করেন এবং একই বছর থেকে শুরু হয় এই বার্ষিক পুরস্কারের যাত্রা। লন্ডনভিত্তিক এই প্রতিযোগিতা আজ বিশ্বের বৃহত্তম ও মর্যাদাপূর্ণ ফটোগ্রাফি প্রতিযোগিতাগুলোর একটি হিসেবে স্বীকৃত। প্রতিযোগিতার মূল উদ্দেশ্য হলো বৈশ্বিক ফটোগ্রাফিক সংস্কৃতির ধারাবাহিক বিকাশের জন্য একটি শক্তিশালী প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা। অতীতের মহান চিত্রশিল্পীদের অবদান স্মরণ করার পাশাপাশি ভবিষ্যতের নতুন প্রতিভাদের খুঁজে বের করে আন্তর্জাতিক মঞ্চে তুলে ধরাই এর লক্ষ্য।

কেন গুরুত্বপূর্ণ এই পুরস্কার?
সনি ওয়ার্ল্ড ফটোগ্রাফি অ্যাওয়ার্ডস শুধু একটি প্রতিযোগিতা নয়, এটি বিশ্বের ফটোগ্রাফি জগতের একটি বার্ষিক মহাকেন্দ্র। প্রতি বছর এই মঞ্চ থেকে উঠে আসে নতুন প্রতিভা, যারা পরবর্তী সময়ে আন্তর্জাতিক ফটোগ্রাফি অঙ্গনে নিজেদের স্থান করে নেন। পুরস্কারটি পাওয়ার মানে আপনার কাজ বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় ফটোগ্রাফি কিউরেটর ও বিশেষজ্ঞদের দ্বারা স্বীকৃত! বিজয়ীদের ছবি লন্ডনের সমারসেট হাউসে আয়োজিত সুবিশাল প্রদর্শনীতে ঠাঁই পায়, যেখানে প্রতিবছর হাজার হাজার দর্শনার্থী আসেন। পাশাপাশি প্রকাশিত হয় বার্ষিক সংকলন, যা সারাবিশ্বের গ্রন্থাগার ও সংগ্রাহকদের কাছে পৌঁছায়। ওয়ার্ল্ড ফটোগ্রাফি অর্গানাইজেশনের নিজস্ব চ্যানেলেও বিজয়ীদের ব্যাপকভাবে প্রচার করা হয়।
যেসব বিভাগে দেওয়া হয়
এই প্রতিযোগিতায় মূলত চার বিভাগে পুরস্কার দেওয়া হয়। প্রফেশনাল বিভাগে ১০টি বিষয় বা শ্রেণিতে পুরস্কার দেওয়া হয়। যেমন–আর্কিটেকচার অ্যান্ড ডিজাইন, ক্রিয়েটিভ, ডকুমেন্টারি প্রজেক্টস, এনভায়রনমেন্ট, ল্যান্ডস্কেপ, পার্সপেক্টিভস, পোর্ট্রেচার, স্পোর্ট, ওয়াইল্ডলাইফ অ্যান্ড নেচার এবং আরও কয়েকটি বিষয়। এই ১০ বিভাগের বিজয়ীদের থেকে বেছে নেওয়া হয় সর্বোচ্চ সম্মান ‘ফটোগ্রাফার অব দ্য ইয়ার’। এ ছাড়া ওপেন বিভাগ পেশাদার ও অপেশাদার সবার জন্য উন্মুক্ত, একটিমাত্র ছবির ভিত্তিতে বিচার হয়। স্টুডেন্ট বিভাগ বিশ্বের ফটোগ্রাফি স্কুলের শিক্ষার্থীদের জন্য। ইয়ুথ বিভাগ ১৯ বছরের কম বয়সীদের জন্য। এ ছাড়া প্রতি বছর একজন অসামান্য ফটোগ্রাফারকে দেওয়া হয় ‘আউটস্ট্যান্ডিং কন্ট্রিবিউশন টু ফটোগ্রাফি’ পুরস্কার।
বিজয়ীরা কী কী পান?
সনি ওয়ার্ল্ড ফটোগ্রাফি অ্যাওয়ার্ডসের পুরস্কার কেবল একটি সনদপত্রেই সীমাবদ্ধ নয়, বিভিন্ন স্তরে বিজয়ীরা পান নগদ অর্থ, সনি ক্যামেরা সরঞ্জাম এবং আন্তর্জাতিক প্রচার ও প্রদর্শনীর সুযোগ। আর ফটোগ্রাফার অব দ্য ইয়ার পান ২৫ হাজার ডলার, সনি ডিজিটাল ইমেজিং সরঞ্জাম এবং পরবর্তী সময়ে প্রদর্শনীতে একক উপস্থাপনার সুযোগ। ওপেন ফটোগ্রাফার অব দ্য ইয়ারকে দেওয়া হয় ৫ হাজার ডলার, নিউ ডিজিটাল ইমেজিং সরঞ্জাম ও লন্ডন প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণ। জয় সাহার মতো প্রফেশনাল বিভাগ বিজয়ীদের দেওয়া হয় সনি ডিজিটাল ইমেজিং সরঞ্জাম, লন্ডনে অনুষ্ঠানে যাতায়াত ও থাকার সুবিধা, প্রদর্শনী ও বার্ষিক বইয়ে স্থান এবং বৈশ্বিক প্রচার। অর্ণবের মতো স্টুডেন্ট ফটোগ্রাফার অব দ্য ইয়ারকে দেওয়া হয় প্রায় ৩০ হাজার ইউরো মূল্যমানের সনি ডিজিটাল সরঞ্জাম, লন্ডনে আয়োজিত অনুষ্ঠানে যাতায়াত ও থাকার ব্যবস্থা, প্রদর্শনী ও বার্ষিক বইয়ে স্থান। ইয়ুথ ফটোগ্রাফার অব দ্য ইয়ারকে দেওয়া হয় শীর্ষমানের সনি ডিজিটাল ইমেজিং সরঞ্জাম ও আন্তর্জাতিক প্রচারের সুযোগ।
২০২৬ সালের সামগ্রিক বিজয়ী
২০২৬ সালে ‘ফটোগ্রাফার অব দ্য ইয়ার’ নির্বাচিত হয়েছেন মেক্সিকোর ইন্ডিজেনাস সম্প্রদায়ের শিল্পী সিটলালি ফাবিয়ান। তাঁর ‘বিলহা, স্টোরিস অব মাই সিস্টার্স’ সিরিজটি ওয়াহাকার আদিবাসী নারীদের পরিচয়, অভিবাসন ও সম্প্রদায়ের গল্প বলে। তিনিই পাচ্ছেন ২৫ হাজার ডলার ও সনি ক্যামেরা সরঞ্জাম। এ বছর বিখ্যাত ফটোগ্রাফার জোয়েল মেয়েরোউইজকে দেওয়া হয়েছে ‘আউটস্ট্যান্ডিং কন্ট্রিবিউশন টু ফটোগ্রাফি’ পুরস্কার।
সাফল্য এবং ভাবনার বিষয়...
লেখাটি যখন শেষ করছিলাম তখন অনলাইনে সাড়া দিলেন জুবায়ের আহমেদ অর্ণব। তিনি তখন যুক্তরাজ্য থেকে দেশের বিমান ধরার অপেক্ষায়। অনুভূতি জানতে চাইলে এই তরুণ মেধাবী চিত্রশিল্পী বলেন, ‘মূলত, ঢাকার নগরায়ণ, আধুনিকায়ন এবং প্রগতিশীল এই পরিবর্তনে প্রকৃতি, সমাজ ও জীবকুলের জীবনযাপন এবং মানিয়ে নেওয়ার জীবনব্যবস্থার জায়গা থেকে গল্পটি আমি তিন বছর আগে শুরু করেছি। প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে পুরস্কারটি পেয়ে নিশ্চয়ই খুব আনন্দ হচ্ছে। তবে, যে বিষয়টি আমি ফুটিয়ে তুলতে চেয়েছি তা মোটেও আনন্দের নয়। ঢাকা যেখানে বায়ুদূষণে কখনও প্রথম, আবার কখনও দ্বিতীয়, ঠিক তেমনি বনায়ন ধ্বংসেও এই মাত্রা নিতান্তই কম নয়। আমি মূলত আমার এই কাজের মাধ্যমে আবারও মনে করিয়ে দিতে চাই, আধুনিকায়নের নামে পুঁজিবাদী সমাজ ব্যবস্থা যেকোনো সময় রূপ নিতে পারে ধ্বংসস্তূপে। বেশি কিছু তো নয়, ৬ থেকে ৬.৫ মাত্রার ভূমিকম্পেই ঢাকার রূপ বদলে যেতে পারে। সময় এখন ভাবনার, অপরিকল্পিত নগরায়ণ অভিশাপের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।’
আসলেই ভাবনার বিষয় বটে। সাফল্য যেমন আমাদের গর্বিত করে এই ভাবনাও নিশ্চয়ই আমাদের নড়েচড়ে বসাবে। ভাবনার দুয়ার খুলতে সহযোগিতা করবে!
- বিষয় :
- ফটোগ্রাফি
