ঢাকা রোববার, ১৯ জুলাই ২০২৬

জেমস ওয়েবে আদি ছায়াপথের সন্ধান

ছায়াপথে জোনাকির আলো

ছায়াপথে জোনাকির আলো
×

জেমস ওয়েবে আদি ছায়াপথের সন্ধান পাওয়া বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত তরুণ জ্যোতির্বিজ্ঞানী লামীয়া আশরাফ মওলা - ছবি : সংগ্রহ

আলাউদ্দিন আলাদিন

প্রকাশ: ১২ জুলাই ২০২৬ | ০৭:২৭ | আপডেট: ১২ জুলাই ২০২৬ | ০৭:২৮

| প্রিন্ট সংস্করণ

লামীয়া আশরাফ মওলা। বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত তরুণ জ্যোতির্বিজ্ঞানী। জেমস ওয়েব টেলিস্কোপে তিনি নতুন এক শিশু গ্যালাক্সির সন্ধান পেয়েছেন; যার নাম দেওয়া হয়েছে ফায়ারফ্লাই স্পার্কল বা জোনাকির আলো। যুক্তরাষ্ট্রের ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি শেষ করে বর্তমানে আমেরিকার ওয়েলেসলি কলেজে অধ্যাপনা করা তরুণ এই জ্যোতির্বিজ্ঞানীর স্বপ্নযাত্রার কথা তুলে এনেছেন আলাউদ্দিন আলাদিন

রাতের অন্ধকারে জোনাকিরা যখন জ্বলে ওঠে, তখন আঁধারেও আলো ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে। ঠিক এমনই একটি ছবি ধরা পড়েছে মহাবিশ্বের গভীরে। মহাবিশ্ব সৃষ্টির একেবারে শুরুর দিকে। ৬০ কোটি বছর পরের একটি শিশু গ্যালাক্সির সন্ধান মিলেছে। উজ্জ্বল তারাপুঞ্জে ভরা এই গ্যালাক্সির নাম রাখা হয়েছে ‘ফায়ারফ্লাই স্পার্কল’ বাংলায় যার অর্থ দাঁড়ায় ‘জোনাকির আলো’। এই যুগান্তকারী আবিষ্কারে নেতৃত্ব দিয়েছেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত জ্যোতির্বিজ্ঞানী ড. লামীয়া আশরাফ মওলা।

লামীয়ার দলে ছিলেন যাঁরা
বিশ্বের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ বিজ্ঞান সাময়িকী নেচার-এ প্রকাশিত হয়েছে এই গবেষণাপত্র। গবেষণায় নাসার জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপের তথ্য ও ছবি ব্যবহার করে এই নবীন গ্যালাক্সি আবিষ্কার করা হয়, যা বিগ ব্যাংয়ের মাত্র ৬০ কোটি বছর পর গঠনপ্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। গবেষণায় ড. লামীয়ার সঙ্গে ছিলেন উত্তর আমেরিকা, ইউরোপ ও জাপানের আরও ২১ জন বিজ্ঞানী। 

গ্যালাক্সির শৈশব
এই আবিষ্কারটা বিজ্ঞানীদের এতটা আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে কেন এসেছে, সেটি বুঝতে হলে একটু পেছনে যেতে হবে। আমাদের নিজেদের গ্যালাক্সি মিল্কিওয়ে আজ যেমন বিশাল, কোটি কোটি বছর আগে এটিও ছিল একটি শিশু। সেই শৈশবকাল ঠিক কেমন ছিল, তা এতদিন ধরা ছিল অনুমানের মধ্যে। ফায়ারফ্লাই স্পার্কল সেই পর্দা সরিয়ে দিল।
নাসার জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ প্রথমবারের মতো বিগ ব্যাংয়ের প্রায় ৬০ কোটি বছর পরের একটি গ্যালাক্সির ভর সরাসরি পরিমাপ করতে সক্ষম হয়েছে। অবাক করার বিষয় হলো, এই গ্যালাক্সির ভর সেই বয়সে আমাদের মিল্কিওয়ের ভরের সমান ছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে। 

লামীয়া মওলা বলেন, ‘ফায়ারফ্লাই স্পার্কল থেকে আসা আলো আমাদের কাছে পৌঁছাতে ১৩.২ বিলিয়ন বছর সময় লেগেছে। আমাদের গবেষণা বলছে, আমরা যদি গ্যালাক্সিটির ঠিক এখনকার অবস্থা দেখতে পেতাম, তাহলে হয়তো সেটি আমাদের মিল্কিওয়ের মতোই দেখতে হতো। এই আবিষ্কার আমাদের গ্যালাক্সির শৈশবকাল কেমন ছিল তা জানার একটি বিরল সুযোগ করে দিয়েছে।’

জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ

উজ্জ্বল তারাপুঞ্জে ঝলমলে গ্যালাক্সিটি
গবেষণায় দেখা গেছে, ‘ফায়ারফ্লাই স্পার্কল’ গ্যালাক্সি দশটি উজ্জ্বল তারাপুঞ্জ নিয়ে গঠিত, যার প্রতিটির ভর আনুমানিক ১০ লাখ সূর্যের সমান। এই ঝলমলে তারার দলের কারণেই গ্যালাক্সিটিকে দেখতে লাগছে একঝাঁক জোনাকির মতো, আর সেখান থেকেই নামটি।
গবেষণা দলটি ফায়ারফ্লাই স্পার্কলের ভেতরে কমপক্ষে ১০টি আলাদা আলাদা তারাপুঞ্জ শনাক্ত করেছে, যাদের প্রতিটির বৈশিষ্ট্য আলাদা। এটি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে তারাগুলো এখনও মিল্কিওয়ের মতো একসঙ্গে মিশে যায়নি। লামীয়া বলেন, ‘জেমস ওয়েব আমাদের যে অধিকাংশ গ্যালাক্সি দেখিয়েছে, সেগুলো এতটা বর্ধিত ছিল না যে আলাদা আলাদা গঠন বোঝা যাবে। কিন্তু ফায়ারফ্লাই স্পার্কলের ক্ষেত্রে আমরা রীতিমতো ইট দিয়ে ইট গেঁথে গ্যালাক্সি তৈরি হওয়ার দৃশ্য দেখছি।’ 

যেভাবে দেখা গেল এত দূরের গ্যালাক্সি
এত দূরের একটি গ্যালাক্সি এত স্পষ্ট দেখার পেছনে একটি চমৎকার কারণ আছে। ফায়ারফ্লাই স্পার্কলের ঠিক সামনে রয়েছে একটি ভারী গ্যালাক্সিপুঞ্জ, যার মহাকর্ষ বলের প্রভাবে আশপাশের স্থানকাল বাঁকা হয়ে পড়ে। এই বাঁকা স্থানকালের মধ্য দিয়ে যখন দূরের আলো আসে, তখন এটি আতশকাঁচের মতো কাজ করে, একেই বলে গ্র্যাভিটেশনাল লেন্সিং। এই প্রক্রিয়ায় ফায়ারফ্লাই স্পার্কল জেমস ওয়েব টেলিস্কোপে ২৬ গুণ বেশি উজ্জ্বল হয়ে ধরা দিয়েছে।

ঢাকার শান্তিনগর থেকে মহাকাশের গভীরে
লামীয়ার নিজের গল্পটাও কম অনুপ্রেরণার নয়। লামীয়া ঢাকার শান্তিনগরে বড় হয়েছেন। উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে এ-লেভেল পরীক্ষা শেষ করেন। এরপর বৃত্তি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েলেসলি কলেজে পড়তে যান। প্রথমে নিউরোসায়েন্স পড়ার ইচ্ছা থাকলেও পরে জ্যোতির্পদার্থবিজ্ঞানের দিকে ঝুঁকে পড়েন। ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি শেষ করে বর্তমানে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটসের ওয়েলেসলি কলেজের সহকারী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত। 

আরও যত অর্জন এবং তরুণদের শিক্ষা
এই আবিষ্কারটির আগেও লামীয়ার গুরুত্বপূর্ণ কাজের স্বীকৃতি ছিল। ২০২২ সালে তিনি জেমস ওয়েব ও গ্র্যাভিটেশনাল লেন্সিং ব্যবহার করে ‘স্পার্কলার’ নামের একটি গ্যালাক্সি আবিষ্কার করেছিলেন, যা নিয়ে বিবিসি, সিএনএনসহ আলোচিত সব সংবাদমাধ্যমেই খবর প্রকাশিত হয়েছিল। এই আবিষ্কার নিয়ে ড. লামীয়া আশরাফ মওলা বলেন, ‘মহাবিশ্বের এত প্রাচীন সময়ের একটি গ্যালাক্সিকে এতগুলো আলাদা আলাদা অংশে ভেঙে দেখতে পাব, এটি আমি ভাবতেই পারিনি। সেই গ্যালাক্সির ভর যে আমাদের মিল্কিওয়ের গঠনকালীন ভরের কাছাকাছি হবে, সেটি আরও অবাক করার।’
লামীয়ার এই অর্জন দেশের তরুণ প্রজন্মকে বিজ্ঞান গবেষণায় এগিয়ে যেতে সাহস জোগাবে। ঢাকার একটি সাধারণ স্কুল থেকে পড়াশোনা শুরু করে মহাবিশ্বের সৃষ্টিরহস্য উন্মোচনের এই যাত্রা; সেটিই হয়তো আগামীর বিজ্ঞানীদের জন্য সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা! 

আরও পড়ুন

×