ঢাকা রোববার, ১৯ জুলাই ২০২৬

সেরা তরুণ বিজ্ঞানীর তালিকায় অনন্যা

জ্যোতির্ময় পথে

জ্যোতির্ময় পথে
×

তরুণ জ্যোতির্পদার্থবিজ্ঞানী তনিমা তাসনিম অনন্যা ও ইনসেটে সায়েন্টিফিক আমেরিকান সাময়িকীর চলতি সংখ্যার প্রচ্ছদ

আলাউদ্দিন আলাদিন

প্রকাশ: ০৫ জুলাই ২০২৬ | ০৭:৩১

| প্রিন্ট সংস্করণ

তনিমা তাসনিম অনন্যা। বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত তরুণ জ্যোতির্পদার্থবিজ্ঞানী। বিশ্বের মর্যাদাপূর্ণ বিজ্ঞানবিষয়ক মার্কিন সাময়িকী সায়েন্টিফিক আমেরিকান প্রথম ‘ইয়াং আমেরিকান সায়েন্টিস্টস’  হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে তাঁকে।  বিশ্বের মোট ২৮ জন সম্ভাবনাময় তরুণ গবেষক এই তালিকায় উঠে এসেছেন। লিখেছেন আলাউদ্দিন আলাদিন

বিশ্বের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ বিজ্ঞান সাময়িকী সায়েন্টিফিক আমেরিকান প্রথম ‘ইয়াং আমেরিকান সায়েন্টিস্টস’ বা বিজ্ঞানের উদীয়মান তারকা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত জ্যোতির্পদার্থবিজ্ঞানী তনিমা তাসনিম অনন্যাকে। অতিভারী ব্ল্যাকহোল ও গ্যালাক্সির সক্রিয় কেন্দ্র নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ গবেষণার জন্য তাঁকে সাময়িকীটির উদ্বোধনী ইয়াং আমেরিকান সায়েন্টিস্টস তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। বিভিন্ন শাখায় বিশ্বের মোট ২৮ জন সম্ভাবনাময় তরুণ গবেষক এই তালিকায় উঠে এসেছেন। তালিকায় স্থান পাওয়া গবেষকরা কর্মজীবনের শুরুতে বিজ্ঞানের বিভিন্ন ক্ষেত্রে অসাধারণ অবদান রাখছেন এবং ভবিষ্যতে নিজেদের ক্ষেত্রকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করবেন–এমন বিশ্বাস সাময়িকীটির।  

যেভাবে খুঁজে বের করা হয়েছে তাদের 
এই বিজ্ঞানীদের খুঁজে বের করতে বিশ্বের শত শত খ্যাতিমান গবেষকের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল, তাদের মতে আগামী দিনের বিজ্ঞানকে নেতৃত্ব দেবেন কারা? কারা নতুন ধারণা নিয়ে কাজ করছেন, যুগান্তকারী আবিষ্কার করছেন এবং আগামী কয়েক দশকের বৈজ্ঞানিক অগ্রগতিকে প্রভাবিত করতে পারেন? এসব প্রশ্নের উত্তর থেকেই তৈরি হয়েছে এই তালিকা। মনোনীত ব্যক্তিরা বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণাগার, শিল্পপ্রতিষ্ঠান কিংবা অলাভজনক সংস্থায় কেউ মৌলিক গবেষণা করছেন, কেউ নতুন প্রযুক্তি বা পণ্য উন্নয়নে কাজ করছেন। তবে একটি বিষয় সবার মধ্যে মিল–তারা গুরুত্বপূর্ণ বিজ্ঞানচর্চার সঙ্গে যুক্ত। এই ২৮ জন গবেষকের সবাই কর্মজীবন মাত্র শুরু করেছেন এবং তারা যুক্তরাষ্ট্রে গবেষণা করছেন। 

তনিমার গবেষণার বিষয়
মহাবিশ্বের সবচেয়ে রহস্যময় বস্তুগুলোর একটি হলো ব্ল্যাকহোল। এই অদৃশ্য দানবকে বোঝার চেষ্টা করে যাচ্ছেন তরুণ বিজ্ঞানী তনিমা তাসনিম অনন্যা। বর্তমানে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েইন স্টেট ইউনিভার্সিটির পদার্থবিজ্ঞান ও জ্যোতির্বিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক। পিএইচডি করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের ইয়েল ইউনিভার্সিটিতে। তাঁর গবেষণার মূল বিষয় সুপারম্যাসিভ ব্ল্যাকহোল বা অতিভারী কৃষ্ণগহ্বর।

ঢাকার লোডশেডিং থেকে মহাবিশ্বের পথে
তনিমার বেড়ে ওঠা ঢাকায়। ছোটবেলার একটি সাধারণ ঘটনাই তাঁর জীবনের গতিপথ বদলে দিয়েছিল। মাত্র পাঁচ বছর বয়সে মা তাঁকে মঙ্গল গ্রহে পাথফাইন্ডার মহাকাশযানের অবতরণের কথা জানান। সেদিনই তাঁর মনে প্রথম জেগে ওঠে মহাবিশ্বের প্রতি কৌতূহল। তনিমা বলেন, ‘যখনই বুঝলাম পৃথিবীর বাইরেও আরও অনেক জগৎ আছে; তখন থেকেই ঠিক করে ফেললাম, জ্যোতির্বিজ্ঞান নিয়ে পড়ব।’ সায়েন্টিফিক আমেরিকানকে তনিমা বলেন, ‘ঢাকায় বড় হওয়ার সময় লোডশেডিংয়ের রাতগুলোই ছিল তারার দিকে তাকানোর সবচেয়ে ভালো সুযোগ। সেই রাতে আকাশভরা তারা দেখতে দেখতেই মহাকাশের প্রতি ভালোবাসা।’
তনিমা ঢাকার মানারাত ইন্টারন্যাশনাল স্কুল থেকে ও-লেভেল এবং এ-লেভেল শেষ করে স্কলারশিপ নিয়ে পাড়ি দেন যুক্তরাষ্ট্রে। পেনসিলভেনিয়ার ব্রিন মার কলেজে পদার্থবিজ্ঞান ও হ্যাভারফোর্ড কলেজে জ্যোতির্বিজ্ঞান পড়েন তিনি। এরপর ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি এবং ডার্টমাউথ কলেজে পোস্টডক্টোরাল গবেষণা শেষে বর্তমানে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েইন স্টেট ইউনিভার্সিটির পদার্থবিজ্ঞান ও জ্যোতির্বিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক। 

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে আঁকলেন ব্ল্যাকহোল  
তনিমার গবেষণার বিষয়টি একটু বুঝে নেওয়া যাক। প্রতিটি ছায়াপথের কেন্দ্রে আছে বিশাল বিশাল কৃষ্ণগহ্বর, যাদের ভর সূর্যের চেয়ে লাখ থেকে কোটি গুণ পর্যন্ত বেশি। টেলিস্কোপ দিয়ে মহাকাশের দিকে তাকালে শুধু দূরের বিষয়ই নয়, অতীতও দেখা যায়। কারণ, আলো আসতে সময় লাগে। এভাবে ১ হাজার ২০০ কোটি বছর আগের কৃষ্ণগহ্বরও পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে একটি নিউরাল নেটওয়ার্ক তৈরি করে তনিমা এ পর্যন্ত মহাবিশ্বে কৃষ্ণগহ্বরের সবচেয়ে পূর্ণাঙ্গ চিত্র এঁকেছেন, কোথায় আছে এগুলো, কীভাবে বাড়ছে এবং আশপাশের পরিবেশে কী প্রভাব রাখছে। সবচেয়ে দ্রুতগতিতে যেসব কৃষ্ণগহ্বর আশপাশের পদার্থ গ্রাস করে, সেগুলো তৈরি করে ‘অ্যাকটিভ গ্যালাকটিক নিউক্লিয়াস’ বা এজিএন  ছায়াপথের কেন্দ্রে এক অবিশ্বাস্য শক্তির উৎস। সমস্যা হলো এই এজিএনগুলো প্রায়ই গ্যাস ও ধূলিকণার বিশাল বলয়ে ঢাকা থাকে, ফলে সরাসরি দেখা কঠিন। তনিমা দৃশ্যমান আলো, অবলোহিত রশ্মি এবং এক্স-রে, এই তিন ধরনের পর্যবেক্ষণ একসঙ্গে বিশ্লেষণ করে ঢাকা পড়া কৃষ্ণগহ্বরগুলোর আসল চরিত্র বোঝার চেষ্টা করছেন। তাঁর গবেষণার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, এই ঢেকে রাখা বলয়টিই আসলে কৃষ্ণগহ্বরের আচরণ জানার একটি চাবিকাঠি হতে পারে।

নাসা থেকে সার্ন: অভিজ্ঞতার ভান্ডার
পড়াশোনার পাশাপাশি তনিমা ইন্টার্নশিপ করেছেন নাসায় এবং সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় সার্নে, যেটি বিশ্বের সবচেয়ে বড় পারমাণবিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান। ২০১২ সালে সার্নে থাকার সময় তিনি সাক্ষী হয়েছিলেন ঐতিহাসিক মুহূর্তের হিগস-বোসন কণার অস্তিত্ব নিশ্চিত হয়েছিল সেদিন।

আগের স্বীকৃতিও কম নয়
এটিই প্রথমবার নয়; ২০২০ সালে বিজ্ঞানবিষয়ক মার্কিন সাময়িকী সায়েন্সনিউজ-এর ‘এসএন টেন: সায়েন্টিস্টস টু ওয়াচ’ তালিকায় শীর্ষে ছিলেন তিনি। এই তালিকার মনোনয়ন দেন নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী ও যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় বিজ্ঞান একাডেমির সদস্যরা। এ ছাড়া তিনি ব্ল্যাক ইন ফিজিক্স এবং উই-স্টেম বাংলাদেশসহ বিভিন্ন সংগঠনে নেতৃত্ব দিয়েছেন, যেগুলো বিজ্ঞানে পিছিয়ে পড়া গোষ্ঠীর অংশগ্রহণ বাড়াতে কাজ করে। উই-স্টেম হলো বিজ্ঞানে আগ্রহী মেয়েদের এবং তরুণীদের জন্য একটি মেন্টরশিপ নেটওয়ার্ক, যেটি তিনি নিজে সহ-প্রতিষ্ঠা করেছেন।

লাল-সবুজের অর্জন
তনিমার এই অর্জন কেবল ব্যক্তিগত সাফল্য নয়, বরং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশি মেধা ও গবেষণা সক্ষমতারও একটি উজ্জ্বল স্বীকৃতি। তাঁর সাফল্য দেশের নতুন প্রজন্মকে বিজ্ঞান গবেষণায় এগিয়ে যেতে অনুপ্রাণিত করবে বলে মনে করছেন তারা। ব্ল্যাকহোল সম্পর্কে তনিমার নিজের কথায় বলতে গেলে– ‘এগুলো সত্যিই দানবাকার। যে ছায়াপথে এরা থাকে, সেই ছায়াপথের বিকাশে এদের বড় প্রভাব রয়েছে। ব্ল্যাকহোল আর ছায়াপথ যেন একসঙ্গেই বিবর্তিত হয়। কিন্তু এদের এই সম্পর্কের অনেক দিক এখনও রহস্যে ঘেরা।’
সেই রহস্যের সমাধান খুঁজে চলেছেন বাংলাদেশের মেয়ে তনিমা। তরুণ এই বিজ্ঞানীর হাত ধরেই হয়তো তৈরি হবে আগামী দিনের বড় আবিষ্কার কিংবা মহাবিশ্ব সম্পর্কে আরও গভীর বোঝাপড়া! u
 

আরও পড়ুন

×