ঢাকা রোববার, ২১ জুন ২০২৬

বিশ্ববিদ্যালয়ে বিশ্বকাপ

বড়পর্দায় তারুণ্যের উচ্ছ্বাস

বড়পর্দায় তারুণ্যের উচ্ছ্বাস
×

আর্জেন্টিনা-আলজেরিয়া ম্যাচ শেষে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ও ব্রাজিল-হাইতি ম্যাচ শেষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের উল্লাস। -ছবি: সমকাল

আলাউদ্দিন আলাদিন

প্রকাশ: ২১ জুন ২০২৬ | ০৭:৪৩ | আপডেট: ২১ জুন ২০২৬ | ০৭:৪৪

| প্রিন্ট সংস্করণ

ফুটবল বিশ্বকাপ এলে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর চেহারা বদলে যায়! ক্লাসরুম-লাইব্রেরির পাশাপাশি ক্যাম্পাসের মাঠ, মুক্তমঞ্চ আর হলের সামনের চত্বর হয়ে ওঠে যেন এক রঙিন ঠিকানা; যেখানে হাজারো শিক্ষার্থী একসঙ্গে রাত জাগে, চিৎকার করে। ২০২৬ বিশ্বকাপ যেহেতু ইতিহাসের সবচেয়ে বড় আসর তাই এবারের উন্মাদনা যেন আগের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে যাচ্ছে। ক্যাম্পাস ঘুরে সেই উন্মাদনার খোঁজ দিচ্ছেন আলাউদ্দিন আলাদিন

২০২৬ সালের ফিফা বিশ্বকাপ চলছে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোতে। উদ্বোধনী ম্যাচ দিয়ে শুরু হয়েছে ১১ জুন, মেক্সিকো সিটির ঐতিহাসিক আজতেকা স্টেডিয়ামে, যেখানে একসময় পেলে আর ম্যারাডোনার মতো কিংবদন্তিরা বিশ্বকাপ জিতেছিলেন। এবারই প্রথমবারের মতো ৪৮টি দল খেলছে বিশ্বকাপে, যেখানে আগে ছিল মাত্র ৩২টি দল। দলসংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে ম্যাচের সংখ্যাও। আগে যেখানে হতো ৬৪টি ম্যাচ, এবার হচ্ছে ১০৪টি। ১২টি গ্রুপে ভাগ হয়ে দলগুলো লড়ছে, আর নতুন যোগ হয়েছে–‘রাউন্ড অব বত্রিশ’ নামের একেবারে নতুন একটি নকআউট পর্ব। প্রায় ৩৯ দিন ধরে চলবে এই টুর্নামেন্ট, আর ফাইনাল হবে ১৯ জুলাই, নিউ জার্সি শহরের মেটলাইফ স্টেডিয়ামে।
এত বড় পরিসরের একটা টুর্নামেন্ট মানেই বাংলাদেশের ফুটবলপ্রেমীদের জন্য আরও বেশি ম্যাচ, আরও বেশি রাত জাগা, আরও বেশি উপলক্ষ একসঙ্গে হওয়ার। সেই উপলক্ষটা সবচেয়ে রঙিনভাবে ধরা দেয় দেশের বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসগুলোতে। 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বসেছে পাঁচটি বড়পর্দা  
দেশের সবচেয়ে পুরোনো ও বড় বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবারের মতো এবারও বিশ্বকাপ উন্মাদনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে। এবার ক্যাম্পাসের পাঁচটি স্থানে বড়পর্দায় খেলা দেখানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে। বিশ্বকাপ ঘিরে বিভিন্ন হল, বিভাগ ও ব্যাচভিত্তিক সমর্থকগোষ্ঠীও সক্রিয় হয়ে উঠেছে, আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিল সমর্থকদের নানা আয়োজন, পতাকা টাঙানো এবং সামাজিক মাধ্যমে প্রচারণা ক্যাম্পাসের উৎসবের আমেজ আরও বাড়িয়ে তুলেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ ডাকসুও পিছিয়ে নেই। ভিসি চত্বরে জায়ান্ট স্ক্রিনে খেলা প্রদর্শন, রম্য বিতর্ক এবং ফ্যান এনগেজমেন্ট কর্মসূচির আয়োজন করেছে তারা। 

ম্যাচের রাতগুলোতে ক্যাম্পাসের পরিবেশ একেবারে অন্যরকম হয়ে যায়। যেমন ১৬ জুন রাতে ফ্রান্সের ম্যাচ আর তার পরদিন ভোরে আর্জেন্টিনার খেলা ঘিরে শিক্ষার্থীদের মধ্যে দেখা গেছে বাড়তি উচ্ছ্বাস। সেদিনের আর্জেন্টিনা-আলজেরিয়া ম্যাচ ঘিরে ভোর থেকেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন স্থানে জড়ো হন ফুটবলপ্রেমীরা। হাজি মুহম্মদ মুহসীন হল মাঠে বড়পর্দায় খেলা দেখতে ভিড় করেন বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী। মেসির প্রতিটি গোলের পরই করতালি, উল্লাসধ্বনি আর বিজয়োল্লাসে মুখর হয়ে ওঠে পুরো মাঠ। লিওনেল মেসির হ্যাটট্রিকের মুহূর্তে গোটা মাঠ যেন বিস্ফোরিত হয়ে ওঠে আনন্দে। এমন দৃশ্য নতুন কিছু নয়। ২০২২ সালের বিশ্বকাপ ফাইনালের রাতেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রের আঙিনায় বড়পর্দায় খেলা দেখতে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে জড়ো হয়েছিলেন হাজার হাজার মানুষ। ফ্রান্সের বিপক্ষে মেসির প্রথম গোলে হাজার হাজার মানুষ একসঙ্গে চিৎকার করে উঠেছিলেন–গোল! সেই স্মৃতি আজও অনেকের মনে টাটকা, আর সেই উন্মাদনারই ধারাবাহিকতা চলছে এবারও, আরও বড় পরিসরে। 

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের মুক্তমঞ্চ যখন গ্যালারি
প্রকৃতির কোলে গড়ে ওঠা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ও বিশ্বকাপের আমেজ থেকে দূরে নেই। এবার জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ-জাকসু শিক্ষার্থীদের জন্য বড়পর্দায় খেলা দেখার আয়োজন করেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সেলিম আল দীন মুক্তমঞ্চে ব্রাজিল ও মরক্কোর মধ্যকার ম্যাচ প্রদর্শনের মাধ্যমে এই আয়োজনের আনুষ্ঠানিক সূচনা হয়। 
যে মুক্তমঞ্চ সাধারণত নাটক, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান কিংবা প্রতিবাদী সমাবেশের জন্য পরিচিত, বিশ্বকাপের সময় সেটিই হয়ে ওঠে একরকম খোলা স্টেডিয়াম। গাছগাছালির ছায়ায় ঘেরা ক্যাম্পাসে রাতের অন্ধকার চিরে বড়পর্দার আলো আর হাজারো কণ্ঠের গর্জন মিলেমিশে তৈরি করে অন্যরকম এক অভিজ্ঞতা।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শহরজুড়ে উৎসব
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ঘিরেও পুরো রাজশাহী শহরে বিশ্বকাপের রং ছড়িয়ে পড়েছে। সম্প্রতি রাজশাহীতে অনুষ্ঠিত হয়েছে এক ব্যতিক্রমধর্মী মোটরসাইকেল ও কার র‍্যালি, যেখানে দলীয় বিভাজন ভুলে ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, জার্মানি, ফ্রান্স, স্পেনসহ বিভিন্ন দলের সমর্থকেরা একসঙ্গে অংশ নেন। শাহ মখদুম ঈদগাহ মাঠসংলগ্ন সড়কে শতাধিক ফুটবলপ্রেমী জড়ো হয়ে মোটরসাইকেল, কার ও সাইকেল নিয়ে শোভাযাত্রা করেন। শিক্ষার্থীদের এই সম্মিলিত উচ্ছ্বাস প্রমাণ করে, বিশ্বকাপ এখানে শুধু  একটি দলের সমর্থন নয়, বরং পুরো ফুটবল সংস্কৃতিরই উদযাপন।

পিছিয়ে নেই বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ও 
শুধু সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় নয়, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিসহ দেশের বিভিন্ন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়েও বিশ্বকাপ উপলক্ষে নিয়মিত আয়োজন করা হয় বড়পর্দায় খেলা দেখার ব্যবস্থা। ক্যাম্পাসের অডিটোরিয়াম, ক্যাফেটারিয়া বা খোলা জায়গায় প্রজেক্টরের মাধ্যমে খেলা দেখানো হয়, যেখানে শিক্ষার্থীরা পছন্দের দলের জার্সি পরে, পতাকা হাতে নিয়ে দলবদ্ধভাবে অংশ নেন। অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে আবার বিভিন্ন ছাত্র সংগঠন বা ক্লাবের উদ্যোগে আয়োজিত হয় ছোট ছোট পূর্বাভাস প্রতিযোগিতা, প্রেডিকশন কনটেস্ট, যেখানে কে কোন দল জিতবে তা অনুমান করে পুরস্কার জেতার সুযোগ পান শিক্ষার্থীরা। এসব আয়োজন ক্যাম্পাসের সামাজিক জীবনে যোগ করে বাড়তি প্রাণ।

কেন এত উন্মাদনা ক্যাম্পাসে?
বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে বিশ্বকাপ উন্মাদনার পেছনে আছে বেশ কিছু স্বাভাবিক কারণ। প্রথমত, এখানে থাকেন হাজার হাজার তরুণ-তরুণী, যাদের বয়স আর জীবনের পর্যায়–দুটোই উপযুক্ত এমন সামষ্টিক উদযাপনের জন্য। দ্বিতীয়ত, হলে থাকা শিক্ষার্থীদের জন্য রাত জেগে খেলা দেখা তুলনামূলক সহজ। বাসায় থাকা পরিবারের মতো ঘুমের সময়সূচি নিয়ে চিন্তা করতে হয় না অনেককেই। তৃতীয়ত, ক্যাম্পাসের খোলা মাঠ, মুক্তমঞ্চ বা হলের সামনের চত্বর। এসব জায়গা স্বাভাবিকভাবেই বড় জমায়েতের জন্য উপযোগী।

আর সবচেয়ে বড় কারণটা হয়তো মনস্তাত্ত্বিক। ফুটবল এমন একটা খেলা, যেখানে দেশ নিজে অংশ না নিলেও মানুষ একটা দলকে নিজের করে নেয়, তার সঙ্গে আবেগে জড়িয়ে পড়ে। ক্যাম্পাসে এই আবেগটা আরও তীব্র হয়ে ওঠে, কারণ একসঙ্গে হাজারো মানুষ মিলে একই আবেগ অনুভব করার সুযোগ এমনিতে খুব একটা পাওয়া যায় না। একটা গোল হলে যখন পুরো মাঠ একসঙ্গে চিৎকার করে ওঠে, তখন সেই মুহূর্তটা শুধু খেলার জয়-পরাজয়ের নয়, এটি হয়ে ওঠে একসঙ্গে থাকার, একসঙ্গে অনুভব করার একটি স্মৃতি। 

প্রজন্মের সম্মিলিত স্মৃতি
বিশ্বকাপ চলে যায়, রেখে যায় অসংখ্য স্মৃতি। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের সেইসব রাত, যখন বন্ধুরা মিলে মাদুর বিছিয়ে মাঠে বসে খেলা দেখা হয়েছিল, যখন একটা গোলের জন্য পুরো হল কেঁপে উঠেছিল উল্লাসে, যখন প্রিয় দলের হারে চোখের জল লুকাতে হয়েছিল বন্ধুদের কাছ থেকে। এসব মুহূর্ত একটা প্রজন্মের কাছে থেকে যায় আজীবনের স্মৃতি হয়ে। বহু বছর পরও বন্ধুরা যখন একসঙ্গে বসেন, তখন প্রায়ই উঠে আসে সেই রাতের গল্প, ‘মনে আছে, সেবার আমরা মাঠে বসে কীভাবে চিৎকার করেছিলাম?’
২০২৬ সালের এই বিশ্বকাপও তেমনই একটা অধ্যায় হয়ে থাকবে বাংলাদেশের আজকের বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের জীবনে। ইতিহাসের সবচেয়ে বড় এই আসরে ৪৮টি দল, ১০৪টি ম্যাচ আর প্রায় চল্লিশ দিনের উৎসবমুখর সময়। এই পুরোটা জুড়েই ক্যাম্পাসগুলো থাকবে জীবন্ত, প্রাণবন্ত, উচ্ছ্বাসে ভরপুর।
আর যতদিন বিশ্বকাপ আসবে, ততদিন বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর রাতগুলোও এভাবেই জেগে থাকবে উল্লাসে, উন্মাদনায়, আর এক অদ্ভুত সুন্দর সম্মিলিত আবেগে। 

আরও পড়ুন

×