হুটহাট জিমে যাচ্ছেন আবার ছেড়ে দিচ্ছেন?
শরীর ফিট তো সব ঠিক
মাসল ফোলাতে জিমে গিয়ে শরীরের ওপর অতিরিক্ত চাপ দেওয়া যাবে না... ছবি: সংগ্রহ
জান্নাতুল ফেরদৌস ফারিয়া
প্রকাশ: ০৪ অক্টোবর ২০২৬ | ০৭:৫৫
| প্রিন্ট সংস্করণ
তরুণদের কাছে জিম লোভনীয় বিষয়। শরীরকে ঠিক রাখার জন্য হুটহাট অনেকে জিমে ভর্তি হন। কয়েকদিন পর আবার হুট করে ছেড়েও দেন। এতে তরুণ শরীর বড় ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হয়। ভালোর জন্য জিমে গিয়ে শরীরের ক্ষতি হয়ে গেলে তা সহজে সারিয়ে তোলা যায় না! ঠিকঠাক জিম করা, আর জিমের প্রয়োজনীতা, উপকার-অপকার নিয়ে লিখেছেন জান্নাতুল ফেরদৌস ফারিয়া
অ ভি মাত্র বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে উঠেছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির আগে পড়াশোনা নিয়ে এমন ব্যস্ত ছিলেন, নিজের দিকে মন দেওয়ার সময় পাননি। কিংবা বলা যায় অভিভাবকের চাপে সেটি সম্ভব হয়নি। বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে পেলেন অবাধ স্বাধীনতা। বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা, সিনেমা দেখা, স্বাধীনমতো কাজ করার অবারিত দুনিয়া পেলেন তিনি। কী করা যায় যখন ভাবছিলেন তখন বন্ধু শাফায়াতের কথা মনে হলো। নিয়মিত জিমে যায় শাফায়াত। চমৎকার শরীর, মাসল টাইট, ফোলা। স্বপ্নের হলিউডের নায়কের চেহারা নিজের চোখে ভেসে ওঠে। দ্বারস্থ হন শাফায়াতের। তিনিও তাঁর বডি ফিট করবেন, মাসল বানাবেন।
হুটহাট করা যাবে না কিছুই!
হ্যাঁ, অভির মতো অনেকে আছেন; যিনি ভাবছেন নিজের শরীর ঠিক করবেন, মাসল ফোলাবেন। তাদের জন্য এই লেখা। নিয়মিত চর্চায় যে কেউ এটি করতে পারেন। কিন্তু হুট করে শরীরের ওপর দিয়ে বুলডোজার চালিয়ে দেওয়া উচিত নয়। এতে হার্ট অ্যাটাক হয়ে মারা যাওয়ার ঘটনাও ইতিহাসে লিপিবদ্ধ আছে। তেমনি হুট করে জিম ছেড়েও দেওয়া যায় না। নিয়ম মেনে চলতে হয় প্রতিটি ধাপ।
যেভাবে শুরু করবেন
জিমে ভর্তি হওয়ার আগে অবশ্যই শুরুতে ভালো করে খোঁজখবর নিয়ে নেবেন যেখানে ভর্তি হবেন আপনি। বর্তমানের তারুণ্যনির্ভর ক্র্যাজি ট্রেন্ডস জিম এখন প্রতিটি এলাকায় আছে। তাই খুব ভালো হয় যদি আপনি আপনার এলাকায় ভর্তি হন। কারণ, দেখা গেছে অনেকে অনেক আগ্রহ নিয়ে জিমে ভর্তি হন। দূরত্ব বেশি হওয়ায় শেষ পর্যন্ত সেটি চালিয়ে নেওয়া সম্ভব হয় না। সেই সঙ্গে অবশ্য একজন ভালো হেলথ ইনস্ট্রাক্টর বা স্বাস্থ্য প্রশিক্ষক খোঁজে নেবেন; যিনি আপনাকে গাইড করবেন। গাইড ছাড়া অবশ্যই জিম শুরু করবেন না।
যা যা দরকার
জিম থেকে আপনাকে একটি রুটিন ওয়ার্ক দেবেন আপনার হেলথ ইনস্ট্রাক্টর; যেখানে আপনার হেলথ মেজারমেন্ট বা শারীরিক পরিমাপ যেমন–ওজন, শরীরের গঠন, উচ্চতা ইত্যাদি লেখা থাকবে এবং এটি আপনাকে নিয়মিত আপ-টু-ডেট রাখতে হবে। ব্যায়ামের পোশাক হিসেবে নিতে হবে ঢিলেঢালা ও আরামদায়ক পোশাক। যেমন–টিশার্ট, গেঞ্জি, কেডস, ট্রাউজার ইত্যাদি। কেডস অবশ্যই ভালো মানের হতে হবে। আরও লাগবে পানির বোতল, তোয়ালে। শরীরে ঘাম জমতে দেওয়া যাবে না, ঘাম আসার সঙ্গে সঙ্গে তোয়ালে দিয়ে মুছে ফেলতে হবে। জিমের সময় প্রচুর ঘাম হয় বলে ডিহাইড্রেশন থেকে বাঁচতে একটু একটু পর পর পানি খেতে হয়। অবশ্যই একসঙ্গে বেশি পানি খাওয়া ঠিক নয়। কারণ এতে ফুসফুসে পানি চলে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে; যা খুবই ভয়াবহ পরিণাম ডেকে আনে।
যখন করবেন
সাধারণত সকালবেলা ব্যায়াম করা ভালো। সকালে যদি আপনার অফিস থাকে বা আপনি যদি আর্লি জাগতে না পারেন তাহলে বিকেলে ব্যায়াম করতে পারেন। অনেকে রাতেও করেন। তবে যখনই করেন না কেন, সবসময় একই সময়ে করবেন। এটি অবশ্য পালনীয় একটা কাজ। এতে শরীরের ফিটনেস যথেষ্ট ঠিক থাকে। কখনও নিজেকে স্বেচ্ছার ওপর ছেড়ে দিয়ে যখন ভালো লাগল জিম করে নিলাম, এমন করা ঠিক নয়।
জিমের সময়
আপনার শরীরের পরিমাপের ওপর নির্ভর করে আপনার জিম ইনস্ট্রাকটর এটা ঠিক করে দেবেন। ৩০ মিনিট থেকে এক ঘণ্টা হচ্ছে সাধারণ সময়সীমা। এর কম-বেশিও হতে পারে। তবে শুরুতে হঠাৎ করে অনেক সময় ব্যায়াম করা কিছুতে উচিত নয়। ধীরে ধীরে জিম ব্যাপারটা শরীরের সঙ্গে অভ্যস্ত করাতে হয়।
বয়সের থাবা
না, এমন কোনো নিয়ম নেই। তবে ১৩ বছরের নিচের মানুষের জন্য জিম করা ঠিক নয়। কারণ এ সময় তাদের শরীরে একটি স্বাভাবিক বৃদ্ধি থাকে। জিম করার ফলে এই স্বাভাবিক বৃদ্ধিটা রোধ হয়ে পড়ে। সবচেয়ে ভালো হয় যদি ১৮ বছর পেরোনোর পর জিমে যাওয়া শুরু করেন।
শুরুর আগে
জিমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শক্ত ব্যায়াম করা শুরু করা ঠিক নয়। প্রথমে হালকা একটু ব্যায়াম করে শরীরকে বড় পরিশ্রমের জন্য উপযুক্ত করে নিতে হয়। একে জিমের ভাষায় ‘ওয়ার্মআপ’ বলা হয়। এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিবার জিম শুরু করার আগে অবশ্যই শরীরকে ওয়ার্মআপ করে নেবেন। জিমের মাঝে মাঝে শবাসন হয়ে ধীরে ধীরে শ্বাস নিতে হয়। এটাও করা দরকার।
খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন
ব্যায়াম করার সময় আপনার সাধারণ খাদ্যাভ্যাস অবশ্যই পরিবর্তন করতে হবে। এটি অবশ্য আপনার হেলথ ইনস্ট্রাক্টর বলে দেবেন আপনার শারীরিক গঠনের ওপর নির্ভর করে। তবে জিম শুরু করলে অবশ্যই আপনাকে অতিরিক্ত পুষ্টিকর খাবার খেতে হবে। কারণ ব্যায়াম করলে শরীরের প্রচুর ক্যালরি নষ্ট হয়। এই ঘাটতি পূরণের জন্য অতিরিক্ত খাবার খাওয়া অবশ্যই প্রয়োজন। তবে মোটামুটি মানের একজন মানুষের জন্য অতিরিক্ত যে খাবারগুলো দরকার সেগুলো হচ্ছে–প্রতিদিন জিম শেষ করার পর দুটি ডিম খেতে হবে। এ ছাড়া দরকার অতিরিক্ত পানি, রাতে ঘুমানোর আগে এক গ্লাস দুধ, কাঁচা ছোলা, কলা, মাছ ও মাংসও নিয়মিত খেতে হবে। তবে মাংস অবশ্যই চর্বিহীন খাবেন। চেষ্টা করবেন ডিম কুসুম ছাড়া খেতে। আর জিম করা শেষে জুস খেতে পারেন।
বাসায় গড়ে তুলুন জিম
ইচ্ছে করলে ঘরে তৈরি করে নিতে পারেন প্রয়োজন মতো মিনি জিমনেশিয়াম। একজন হেলথ ইনস্ট্রাক্টরের পরামর্শ নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যায়ামের যন্ত্রপাতি কিনে নিতে পারেন। নিয়মিত ব্যায়ামের যন্ত্রপাতির নাম এবং মূল্যতালিকা– ট্রেডমিল বা রানিং মেশিন, মূল্য আট হাজার ৫০০ থেকে তিন লাখ পঞ্চাশ হাজার টাকা। ক্রস ট্রেইনার পাবেন ৯ হাজার থেকে দুই লাখ পঞ্চাশ হাজার টাকায়। বাইক সাত হাজার থেকে এক লাখ পঞ্চাশ হাজার টাকা। ডাম্বেল, প্রতি কেজি ১৪০ থেকে ৩৫০ টাকা। অ্যাব কিং প্রো, তিন হাজার ৮০০ থেকে পাঁচ হাজার টাকা। বক্সি ব্যাগ তিন হাজার থেকে দশ হাজার ৫০০ টাকা। পুশ বার বা পুশার বার ৬০০ থেকে ৯৫০ টাকা। বক্সিং গ্লাভস ৬৫০ থেকে এক হাজার ২৫০ টাকা। অ্যারোবিক স্টেপ দুই হাজার ৫০০ টাকা। রোলার স্নাইডার এক হাজার ৫০০ টাকা। ফাইভ স্ট্রিং ৮৫০ থেকে এক হাজার ২০০ টাকা। ডোর জিম ৫০০ থেকে ৭৫০ টাকা। মেডিসিন বল এক হাজার থেকে এক হাজার ৫০০ টাকা। জিম বল এক হাজার ২০০ টাকা। ক্যাপসুল বল এক হাজার ৫০০ টাকা। স্কিপিং রোপ ১৫০ টাকা। ইয়োগা ম্যাট ৬৫০ থেকে দেড় হাজার টাকা।
যেখানে পাবেন
এ সবই পাবেন তেজগাঁও, গুলশান লিংক রোড, মওলানা ভাসানী স্টেডিয়াম মার্কেট। এ ছাড়াও বসুন্ধরা শপিং মলসহ ঢাকার বিভিন্ন অভিজাত এলাকাতে আজকাল এসব যন্ত্রপাতি পাওয়া যায়। কেনার সময় দেখেশুনে কেনা ভালো।
সাবধানতা
শরীরকে ঠিক রাখার জন্য জিম করা। সুতরাং এটিকে সবার আগে প্রাধান্য দিতে হবে। যদি জিম করতে গিয়ে শরীরের ক্ষতি হয়ে যায় তাহলে তো হবে না! আর অবশ্যই হুট করে জিম শুরু করবেন না এবং হুট করে ছেড়েও দেবেন না। এটি খুবই ঝুঁকি, হুটহাট শুরু করা এবং ছেড়ে দেওয়া। সবার স্বাস্থ্য হোক সুগঠিত, সুন্দর। স্বাস্থই হোক সকল সুখের মূল!
- বিষয় :
- শরীরচর্চা