মান্তাদের অধিকার আদায়ে কাজ করা তরুণ
মান্তাদের অধিকার আদায়ের পাশাপাশি নিয়মিত এমন মেডিকেল ক্যাম্পও পরিচালনা করেন আরিফুর রহমান ছবি :: ইয়ুথনেট গ্লোবাল
সোহানুর রহমান
প্রকাশ: ১৮ অক্টোবর ২০২৬ | ০৭:৩৬
| প্রিন্ট সংস্করণ
আরিফুর রহমান। যুব সংগঠন ইয়ুথনেট গ্লোবালের সাধারণ সম্পাদক। নদীই যাদের ঠিকানা, সেই জলে ভাসা মান্তা জনগোষ্ঠীর পাশে দাঁড়িয়ে স্বেচ্ছাসেবার পথে যাত্রা শুরু তাঁর। মান্তা জনগোষ্ঠীর অধিকার প্রতিষ্ঠা থেকে দুর্যোগ মোকাবিলা, পরিবেশ শিক্ষা ও জলবায়ু সুবিচার পর্যন্ত বিস্তৃত তাঁর কাজের পরিধি। ঝালকাঠির এই তরুণের কাজ নিয়ে লিখেছেন সোহানুর রহমান
নদীই যাদের ঠিকানা, সেই জলে ভাসা মান্তা জনগোষ্ঠীর পাশে দাঁড়িয়ে স্বেচ্ছাসেবার পথে যাত্রা শুরু হয়েছিল আরিফুর রহমানের। ২০১৬ সালে নদী অঞ্চলে কাজ করতে গিয়ে তিনি দেখেন, স্থায়ী ঠিকানা, শিক্ষা, চিকিৎসা ও সামাজিক সুরক্ষার সীমিত সুযোগ কীভাবে এই জনগোষ্ঠীর জীবনকে কঠিন করে তুলেছে। নদীর সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত তাদের জীবন ও জীবিকা নানা অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে। সেই অভিজ্ঞতা তাঁকে প্রান্তিক মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার কাজে যুক্ত হতে উদ্বুদ্ধ করে। তিনি যুব সংগঠন ইয়ুথনেট গ্লোবালের সাধারণ সম্পাদক। মান্তা জনগোষ্ঠীর অধিকার প্রতিষ্ঠা থেকে দুর্যোগ মোকাবিলা, পরিবেশ শিক্ষা ও জলবায়ু সুবিচার পর্যন্ত বিস্তৃত তাঁর কাজের পরিধি।
মান্তাদের পাশে দাঁড়িয়ে
ঝালকাঠি ও বরিশাল অঞ্চলের নদ-নদীতে নৌকায় বসবাসকারী মান্তা জনগোষ্ঠীর অনেক পরিবার মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করে। স্থায়ী ঠিকানা ও প্রয়োজনীয় পরিচয়পত্রের অভাবে তাদের অনেকে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক সুরক্ষার সুবিধা পেতে সমস্যায় পড়েন। ফলে দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটানোর পাশাপাশি সরকারি ও প্রাতিষ্ঠানিক সেবা পাওয়াও তাদের জন্য কঠিন হয়ে ওঠে। এই বাস্তবতা বদলাতে আরিফুর শিক্ষা, স্বাস্থ্যসচেতনতা, জীবিকা উন্নয়ন ও আর্থিক অন্তর্ভুক্তি নিয়ে কাজ করছেন। ইয়ুথনেট গ্লোবালের ‘মান্তাকানেক্ট’ কর্মসূচিতে দি এশিয়া ফাউন্ডেশনের সহযোগিতায় জাগো ফাউন্ডেশন ট্রাস্ট ও ডকটাইমের সঙ্গে কাজ চলছে। উদ্যোগটির লক্ষ্য মান্তা জনগোষ্ঠীর প্রয়োজনীয় সেবায় প্রবেশাধিকার বাড়ানো এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে তাদের যোগাযোগ সহজ করা। ইয়ুথনেটের তথ্য অনুযায়ী, উদ্যোগটির মাধ্যমে ৩০০ মান্তা সদস্যকে ব্যাংকিং ও আর্থিক সেবার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। মান্তাদের কবরস্থানের জায়গা নিশ্চিত করতেও স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে কাজ করা হয়েছে বলে সংগঠনটি জানিয়েছে। পাশাপাশি ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবার মাধ্যমে দূর থেকে চিকিৎসকের পরামর্শ পাওয়ার সুযোগ তৈরির উদ্যোগ রয়েছে। এসব উদ্যোগের দীর্ঘমেয়াদি সাফল্য নির্ভর করবে সেবাগুলো কতটা নিয়মিত পাওয়া যাচ্ছে এবং পরিবারগুলো কতটা উপকৃত হচ্ছে, তার ওপর।

দুর্যোগে সহায়তা ও জীবিকা
২০২০ সালে করোনাভাইরাস মহামারিতে নিম্ন আয়ের মানুষের আয় বন্ধ হয়ে গেলে আরিফুর তরুণদের সংগঠিত করে কমিউনিটি কিচেনের মাধ্যমে রান্না করা খাবার বিতরণ করেন। সংকটের সময়ে স্থানীয় তরুণদের সংগঠিত করে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর এই অভিজ্ঞতা তাঁর স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। যুব রেড ক্রিসেন্টের স্বেচ্ছাসেবামূলক কার্যক্রমেও যুক্ত ছিলেন তিনি। ঘূর্ণিঝড় আম্পান ও বিভিন্ন বন্যায় ফেনী, সিলেট, কুড়িগ্রাম, চট্টগ্রাম, বান্দরবান ও রংপুরে ত্রাণ ও জরুরি সহায়তা কার্যক্রমে অংশ নেন। এসব কার্যক্রমে স্থানীয় মানুষের তাৎক্ষণিক প্রয়োজনের পাশাপাশি দুর্যোগের পর তাদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার চ্যালেঞ্জও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ২০২২ সাল থেকে কুড়িগ্রামে ‘চর ইয়ুথনেট কমিউনিটি’ উদ্যোগের মাধ্যমে ৯৫টি পরিবারের আশ্রয়, জীবিকা ও জলবায়ু সহনশীলতা নিয়ে কাজ চলছে। চরের তরুণদের কর্মসংস্থানমুখী প্রশিক্ষণও এ উদ্যোগের অংশ। নদীভাঙন ও দুর্যোগের ঝুঁকিতে থাকা পরিবারগুলোর জীবনযাত্রায় দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন আনতে জরুরি সহায়তার পাশাপাশি জীবিকার সুযোগ এবং স্থানীয় সক্ষমতা বাড়ানো প্রয়োজন।
পরিবেশশিক্ষা ও দূষণবিরোধী প্রচার
পরিবেশশিক্ষা বিস্তারে ইকো অলিম্পিয়াড বাংলাদেশের কার্যক্রম আয়োজন ও সমন্বয়ে ভূমিকা রেখেছেন আরিফুর। আয়োজকদের তথ্য অনুযায়ী, বরিশাল অঞ্চলে কর্মসূচিটির বিভিন্ন পর্বে প্রায় ২৫ হাজার শিক্ষার্থী অংশ নিয়েছে। শিক্ষার্থীদের পরিবেশ সম্পর্কে সচেতন করার পাশাপাশি স্থানীয় সমস্যা নিয়ে ভাবতে এবং সমাধানমূলক কাজে যুক্ত হতে উৎসাহিত করা এ ধরনের উদ্যোগের উদ্দেশ্য। ঝালকাঠির ১০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ৩০০ শিক্ষার্থী ও ২০ শিক্ষককে নিয়ে ইয়ুথ ক্লাইমেট ক্লাব গড়ে উঠেছে। ক্লাবের সদস্যরা বৃক্ষরোপণ, পরিচ্ছন্নতা ও প্লাস্টিকদূষণ প্রতিরোধে কাজ করছে। এসব উদ্যোগে স্থানীয় প্রশাসন, পরিবেশ অধিদপ্তর ও জেলা শিক্ষা অফিস সহযোগিতা করেছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে কেন্দ্র করে এমন কার্যক্রম পরিচালনার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মধ্যে পরিবেশগত দায়িত্ববোধ গড়ে তোলার চেষ্টা চলছে। শিশুদের স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর সিসাদূষণ প্রতিরোধেও কাজ করছে ইয়ুথনেট। ইউনিসেফ ও পিওর আর্থ বাংলাদেশের সহযোগিতায় ২০২৫ সালের অক্টোবর ও নভেম্বরে দেশের ৬৪ জেলায় সচেতনতামূলক প্রচারণা চালানো হয় বলে সংগঠনটি জানিয়েছে। এতে দুই হাজার ২০০ জনের বেশি মানুষ অংশ নেন। প্রশিক্ষণ পান ৩০০-এর বেশি তরুণ সংগঠক। কার্যক্রমে যুক্ত ছিল ২৬টি তৃণমূল যুব সংগঠন ও ৫৫টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। ইয়ুথনেটের হিসাব অনুযায়ী, গ্লোবাল ক্লাইমেট স্ট্রাইক, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বৈদ্যুতিক যানবাহন, ন্যায়সংগত জ্বালানি রূপান্তরসহ বিভিন্ন উদ্যোগে ৫০ জেলার প্রায় ১৫ হাজার তরুণ-তরুণী যুক্ত হয়েছেন। এসব কার্যক্রমের মাধ্যমে স্থানীয় পর্যায়ের পরিবেশগত সমস্যা নিয়ে সচেতনতা তৈরির পাশাপাশি তরুণদের সামাজিক অংশগ্রহণ বাড়ানোর চেষ্টা করছে সংগঠনটি।
ভাবনায় নদীর মানুষ
২০২৫ সালে ঝালকাঠিতে জেলা পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ যুব সংগঠকের সম্মাননা পেয়েছিলেন আরিফুর। বিবিএ সম্পন্ন করে বর্তমানে এলএলবি পড়ছেন। ভবিষ্যতে প্রান্তিক মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি তরুণদের সবুজ দক্ষতা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও পরিবেশবান্ধব কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরিতে কাজ করতে চান। তবে যে মান্তা জনগোষ্ঠীর জীবনসংগ্রাম তাঁকে এই পথে এনেছিল, তাদের শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক সুরক্ষায় প্রবেশাধিকার বাড়ানোই তাঁর অন্যতম লক্ষ্য। নদীর সঙ্গে যাদের জীবন ও জীবিকা নিবিড়ভাবে জড়িত, তাদের অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত করার কাজই তাঁর স্বেচ্ছাসেবার মূল প্রেরণা।
- বিষয় :
- অধিকার