পুরুষতান্ত্রিকতাই নারীমুক্তির প্রতিবন্ধকতা
খুশী কবির
খুশী কবির, মানবাধিকারকর্মী সমন্বয়ক, নিজেরা করি
প্রকাশ: ১৮ নভেম্বর ২০২৫ | ০৭:০৫
| প্রিন্ট সংস্করণ
মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন হয়েছে বাংলাদেশ। আমাদের অনেক আশা-আকাঙ্ক্ষা তখন ছিল, এখনও আছে। এই ৫৪ বছরের মধ্যে বাংলাদেশে বেশ কিছু আন্দোলন-সংগ্রাম হয়েছে। এর মধ্যে গণতন্ত্র, বাকস্বাধীনতা, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ছিল আন্দোলনের মূল জায়গা। প্রতিটি আন্দোলনে নারীরা সক্রিয় ও বড় ভূমিকা রেখেছে এবং সামনের সারিতে থেকেছে। ’২৪-এর গণঅভ্যুত্থানেও নারীদের অবদান অনেক, তারা সরব ছিল, তারা সাম্যের কথা বলেছে। পরে দেখা গেছে যেসব আলোচনা হচ্ছে, সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে, সেখানে নারীর জায়গা অনুপস্থিত অথবা তারা পিছিয়ে আছে। নারীকে সামনে নিয়ে আসা হচ্ছে না। সবচেয়ে বড় উদাহরণ হলো– নারী কমিশন যেসব সুপারিশ করেছে, সেখানে সরকার কোন কোন বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দেবে, কোন কোন সুপারিশ নিচ্ছে, কীভাবে নিচ্ছে, কার কার সঙ্গে আলোচনা করছে– সেসব কিছু দেখছি না। আমরা দেখছি না নীতিনির্ধারণের জায়গায় কী হবে আর কী না হবে। সংসদে নারীর আসন, নারীর নিরাপত্তাহীনতা দূর করা, নারীর সহিংসতা দূর করার জন্য কী পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে কিংবা কী কী বক্তব্য দেওয়া হচ্ছে বা হতে পারে, পরিবার ও সমাজে নারীর অবস্থান কতটা শক্ত হবে, কীভাবে হবে সেগুলোও কিন্তু সামনে আসছে না। এবং তাদের কণ্ঠস্বরও তেমনভাবে জায়গা বা স্থান পাচ্ছে না। এ জিনিসগুলো সব নারীকে ভাবিয়ে তোলে। আমরা দেখছি সব জায়গায় নারী নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। খাগড়াছড়িতে আদিবাসী নারী ধর্ষণের প্রতিবাদের পর যে আন্দোলন হলো, তাকে দমিয়ে রাখার জন্য যে তীব্র পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে– তা নারীকে আরও বেশি ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। সেই সঙ্গে নারীর মর্যাদা ক্ষুণ্ন করা হয়েছে। আদিবাসী নারীকে ধর্ষণের বিষয়টি আমাদের ভীষণভাবে ভাবিয়ে তোলে। নারীর বিষয়গুলো মূল বিষয় হিসেবে গুরুত্ব পাচ্ছে না কেন? আমরা যদি তাকাই নারীর আসনের দিকে, সামনের যে নির্বাচন হবে, সেখানে নারীর আসন কত হবে, কীভাবে নিশ্চিত করা যাবে– সে ব্যাপারে নারীদের আগ্রহ থাকলেও অন্যরা তা ভাবছে না। ঐক্যবদ্ধ কমিশন হোক, রাজনৈতিক দল হোক, সরকার হোক– কারও মধ্যেই নারীর আসনের বিষয় নিয়ে ভাবনা দৃশ্যমান নয়। সে বিষয়গুলো আলোচনাও হচ্ছে না। প্রতিটি স্তরে নারীদের জায়গা, স্থান, কথা বলার জায়গা, বক্তব্য সেগুলোকেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না। আমাদের জনগোষ্ঠীর ৫১ শতাংশ নারী, সুতরাং আমরা চাই প্রতিটি বিষয়ে নারীর মতামতের গুরুত্ব যেন থাকে। নারীর মর্যাদা, অবস্থান ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। নারী যখন নিজে নিরাপদ বোধ করবে এবং সমাজ যখন তাকে স্থান দেবে, মর্যাদা দেবে তখন নারী পুরোদমে কাজ করতে পারবে। নারী এখনও কাজ করে যাচ্ছে কিন্তু মর্যাদা পাচ্ছে না। নারীর মর্যাদা, অবস্থান ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করলে সেই স্বীকৃতি পাওয়ার জায়গাটাও পোক্ত হবে। নারীর সমান অধিকার নিশ্চিত করতে হবে সর্বক্ষেত্রে– কর্মক্ষেত্র হোক, দায়িত্ব নেওয়ার জায়গা হোক কিংবা নেতৃত্বের জায়গা হোক। সম্পদেও নারীর সমান অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। আইন ব্যবস্থায়ও নারীর জন্য বিশেষ দৃষ্টি রাখা উচিত। নারীর জন্য অনুকূল অবস্থা সৃষ্টি করা উচিত। মূলত নারীরা যেন নির্ভয়ে ও নিরাপদ থাকতে পারে, সম্মানের সঙ্গে থাকতে পারে তা নিশ্চিত করতে হবে। নারীর বাকস্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে। নারীকে যেন কথা বলার সুযোগ দেওয়া হয় এবং দমিয়ে না রাখা হয়। প্রতিটি বিষয়ে নারী যেন মত প্রকাশ করতে পারে, কথা বলতে পারে, নির্দ্বিধায় চলাফেরা করতে পারে, একজন নাগরিক হিসেবে সব নাগরিকের মতো সমান অধিকার পায়– সেটি আমরা চাই। এবং যেসব জনগোষ্ঠী পিছিয়ে আছে বিশেষ করে আদিবাসী, ধর্মীয়-সামাজিক-অর্থনৈতিকভাবে যারা পিছিয়ে আছে তাদের ব্যাপারে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। সকল নারী যেন সমান কাতারে সমানভাবে এগিয়ে যেতে পারে। আসলে আমাদের এখনও অনেক ক্ষেত্রে অনেক জায়গায় অনেক কাজ ও দায়িত্ব আছে। আমাদের অনেক এগোতে হবে। এ ক্ষেত্রে বড় বাধা হলো পিতৃতন্ত্র ও পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা। পিতৃতন্ত্র যেখানে বিরাজ করে সেখানে মনন, চলাফেরা, আইন, বিধান– সবকিছুতে নারী সমান অধিকার পাবে না। সবচেয়ে বেশি আমাদের যে জায়গায় জোর দিতে হবে তা হলো মানসিকতার পরিবর্তন। নারীকে সমান মর্যাদায় দেখার মানসিকতা গুরুত্বপূর্ণ। এ অবস্থা সৃষ্টি করার জন্য যা যা গ্রহণ করা জরুরি, যেসব পদক্ষেপ নেওয়া উচিত সেগুলো নেওয়া দরকার। স্কুল-কলেজে শিক্ষা ব্যবস্থায় পদক্ষেপ নেওয়া উচিত। শুরুতে স্কুল থেকেই জোরালো পদক্ষেপ নিতে হবে। সব জায়গায় যদি এটি করা যেতে পারে তাহলে নারী-পুরুষ নিয়ে আলাদাভাবে আলাপের প্রয়োজন পড়বে না। এটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে হয়ে যাবে। যতদিন পর্যন্ত পিতৃতান্ত্রিকতা বিরাজ করবে, নারীর সমান অধিকার পাওয়ার জন্য আমাদের যুদ্ধ-সংগ্রাম-আন্দোলন চলতে থাকবে। আমাদেরও বেগ পেতে হয়। আমরা দমে যাব না, চালিয়ে যাব। তবে কত জেনারেশন লাগবে তা জানি না। যারা আমরা সকল মানুষের সর্বক্ষেত্রের সমতা বিশ্বাস করি, নারী-পুরুষের সমতাকেও বিশ্বাস করতে হবে এবং কাজ করে যেতে হবে। এ বিষয় নিয়ে যে শুধু নারীরা কাজ করবে তা নয়, নারী-পুরুষ সবাইকেই এগিয়ে আসতে হবে। যারা অর্থাৎ যেসব পুরুষ মানুষ হতে পেরেছে তারা এগিয়ে আসবে।
আমাদের পিতৃতান্ত্রিক মানসিকতা, পুরুষতান্ত্রিকতা অনেক নারীর মধ্যেও বিরাজ করছে। নারী সমাজের বাইরের কেউ নয়। অনেকে বিশ্লেষণ করে তা বুঝতে পারছেন এবং ভাঙতে চেষ্টা করছেন। কিন্তু অধিকাংশের মগজে পুরুষতান্ত্রিকতা রয়ে গেছে। নারীর স্থান, মর্যাদা, সুযোগ, স্থান অনেক কম ও দুর্বল। তারা যখন একটু জায়গা পায়, তখন তারা মনে করে অন্য কাউকে এখানে আসতে দেব না। এটা অনেক সময় বাসায় অর্থাৎ পরিবারে হয়, আবার কর্মক্ষেত্রেও হয়। আর তাই বলা হয়, নারী কখনও কখনও নারীর শত্রু হয়ে ওঠে। আসলে নারী নারীর শত্রু নয়; পিতৃতান্ত্রিক ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখতে চাইলে নারীকে ব্যবহার করা হয় অন্য নারীকে দমিয়ে রাখার জন্য। এখানে নারী নারীর শত্রু নয়। এখানে নারীর ব্রেন ওয়াশ করা হয়। যার ব্রেন ওয়াশ হয়ে গেছে সে-ই কেবল অন্য নারীকে সুযোগ দিতে চায় না। তারা নিজের জায়গাটাকে দুর্বল মনে করে এবং অন্যকে হুমকি মনে করে। জুলাই আন্দোলন হলো। এ আন্দোলনের অনেক লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ছিল। অভ্যুত্থানের পর নারীদের আরও এগোনোর কথা ছিল। যেসব মেয়ে ও নারী শিক্ষার্থী জুলাই আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেছে, তারা এখন মুখ খুলছে, কথা বলছে। তারা আন্দোলন করেছে পরিবর্তন আনার জন্য। পরিবর্তন মানে শুধু সরকারের পতন নয়, সিস্টেমের পরিবর্তন। সরকার অন্যায় করছে, মানবাধিকার লঙ্ঘন করছে, অনেক টাকা লুটপাট করছে, অন্যায় আচরণ করছে। অভ্যুত্থানের মূল লক্ষ্য হচ্ছে, এগুলো যেন না হয়। পরিবর্তন মানে একটা দল-একটা শক্তি বা একটা সরকার নয়; পুরো সিস্টেমের পরিবর্তন। কিন্তু যা ঘটেছে তা হলো, কোনো পরিবর্তনই হয়নি। যেসব নারী আন্দোলনে সম্পৃক্ত ছিল, তারা এখন মুখ খুলছে; তারা হতাশ। পরিবর্তন দরকার ছিল, পরিবর্তনের জন্য কাজ করার দরকার ছিল, অনেক জায়গা সৃষ্টি করার কথা ছিল। সেগুলো কিছুই হয়নি। আমরা চাই পুরো সিস্টেমের পরিবর্তন হোক। মর্যাদা, সমঅধিকার, সমান অংশগ্রহণ, মত প্রকাশের স্বাধীনতা সব থাকতে হবে। জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাইকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। এমন একটা সমাজ গঠন করতে হবে– যা ছিল একাত্তরের চেতনা। আমরা সামনে এগোতে চাই; পিছিয়ে যেতে চাই না। দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য অভ্যুত্থানের পর যে সুবর্ণ সুযোগ ছিল, সে সুযোগ কাজে লাগেনি। অনেকে ভীষণ হতাশ। এখনও যতদিন আছে সে সুযোগকে কাজে লাগিয়ে যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে। তবে যারা ক্ষমতায় আছেন, তারা কী করবেন, জানি না। নারীদের সব জায়গায় অংশগ্রহণের সুযোগ দিতে হবে। ঐক্যবদ্ধ কমিশনে নারীর অবস্থান নিশ্চিত করতে হবে। আলোচনা হচ্ছে নির্বাচনে নারীদের সিট নিয়ে। কিন্তু নারীর সমান মর্যাদা, সমান অধিকার নিশ্চিত করা নিয়ে কোথাও আলোচনা হচ্ছে না। জোরগলায় এসব নিয়ে আলোচনা করতে হবে। নারী কমিশন গঠন করা হয়েছে। সেখানে যে সুপারিশগুলো আছে সেগুলো নিয়ে আলোচনা করা দরকার। এর প্রভাব কী পড়বে– সেসব বিষয়ে আলোচনা দরকার।
- বিষয় :
- খুশী কবির
