ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

ছোট ইউনিয়নের বড় লড়াই

ছোট ইউনিয়নের বড় লড়াই
×

ছাতিরচরে ওয়েল্ডিংয়ের কৌশল দেখাচ্ছেন প্রশিক্ষক ইদ্রিস মিয়া সমকাল

মোস্তফা কামাল, কিশোরগঞ্জ

প্রকাশ: ০৬ ডিসেম্বর ২০২৫ | ০৭:০৯

| প্রিন্ট সংস্করণ

দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে প্রতিবছরই অসংখ্য তরুণ-যুবক বিদেশে যান কাজের সন্ধানে। কিন্তু প্রশিক্ষণবিহীন তথা অদক্ষ হওয়ায় তারা বিদেশ-বিভুঁইয়ে যতটা শ্রম দেন, সে অনুযায়ী পারিশ্রমিক পান না। এ ক্ষেত্রে ভিন্ন এক লড়াইয়ে ব্যাপক সাফল্য পেয়েছে একটি গ্রাম নিয়ে স্থাপিত কিশোরগঞ্জের ছোট এক ইউনিয়ন। ছাতিরচর নামের এ ইউনিয়নে গড়ে উঠেছে তিনটি কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র; যেখান থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে গত ছয় বছরে উচ্চ বেতনে বিদেশে গেছেন প্রায় ৫০০ জন। তাদের হাত ধরে পাল্টে গেছে এক সময়ে দারিদ্র্যপীড়িত ছাতিরচর গ্রাম।
কিশোরগঞ্জের হাওর উপজেলা নিকলীর ছাতিরচর ইউনিয়ন বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতো। বর্ষাকালে থাকে চারদিকে পানি দিয়ে ঘেরা। শুষ্ক মৌসুমেও খরস্রোতা ঘোড়াউত্রা নদীর কারণে থাকে উপজেলার মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন। ছাতিরচর গ্রাম তথা ইউনিয়নের অনেকেই নদীভাঙনে ভিটাহারা হয়ে অন্যত্র চলে গেছেন। অনেকে অন্যান্য জেলায় ইটভাটাসহ বিভিন্ন কায়িক শ্রমের কাজে চলে যেতেন। আজ আর সেই চিত্র নেই। নতুন দৃশ্য এঁকেছেন গ্রামেরই কিছু উদ্যমী মানুষ। 
নিকলীর ইউএনও রেহানা মজুমদার মুক্তি বলেন, একটা ছোট্ট ইউনিয়ন থেকে এত সংখ্যক প্রশিক্ষিত যুবক বিদেশে কাজ করছেন, এটি ব্যতিক্রম। স্থানীয় অর্থনীতিতে এর ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে। ইউপি চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান চৌধুরী বলেন, এই ইউনিয়নে আগে সব টিনের ঘর ছিল। ছেলেরা বিদেশ থেকে এখন প্রচুর টাকা পাঠাচ্ছে। তাদের বাড়িতে এখন আধাপাকা ঘর হয়েছে। 

যেভাবে পরিবর্তনের শুরু
নিকলী সদর থেকে প্রায় আট কিলোমিটার দূরের ছাতিরচর গ্রাম এক সময় ছিল গুরই ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ড। গ্রামটি ভাঙনকবলিত হওয়ায় ইউনিয়ন পরিষদের মাধ্যমে যে বরাদ্দ পাওয়া যেত, তা দিয়ে যথেষ্ট উন্নয়নমূলক কাজ করা সম্ভব হতো না। ফলে ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করার পর তৎকালীন স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মো. জিল্লুর রহমান (পরে রাষ্ট্রপতি) ছাতিরচর ওয়ার্ডটিকে স্বতন্ত্র ইউনিয়ন করে দেন, যেন এলাকাটি আলাদা গুরুত্ব পায়। এর পরও দারিদ্র্য গ্রামবাসীর পিছু ছাড়ছিল না। পরিবর্তনের শুরুটা ২০১৯ সালের পর থেকে।
ছাতিরচর ইউনিয়নে গিয়ে কথা হয় গ্রামের বাসিন্দা ও প্রশিক্ষক ইদ্রিছ মিয়ার সঙ্গে। তিনি ২০০৮ সালে নারায়ণগঞ্জের বোরহান উদ্দিন টেকনিক্যাল সেন্টারে ওয়েল্ডিংয়ের কাজ শিখে ২০১১ সালে পাড়ি জমান সিঙ্গাপুরে। আট বছর কাজ করেন সেখানে। ২০১৯ সালে দেশে ফিরে নিজের কারিগরি দক্ষতাকে পুঁজি করে ছাতিরচরে গড়ে তুললেন ‘পাওয়ার ওয়েল্ডিং ট্রেনিং সেন্টার’ নামের কারিগরি প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান। ইদ্রিছ মিয়া জানান, তিনি কেবল ওয়েল্ডিং বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেন। তিন মাসের কোর্স। ফি ৪০ হাজার টাকা। তিনি জানান, ছাতিরচরে সিএমটি এবং ইউনুস ট্রেনিং সেন্টার নামের আরও দুটি কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র আছে। তিনটি প্রতিষ্ঠানেই শুধু ওয়েল্ডিংয়ের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। এগুলো থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে কেবল ছাতিরচর ইউনিয়নের প্রায় ৫০০ তরুণ-যুবক সৌদি আরব, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, দুবাইসহ বিভিন্ন দেশে ভালো বেতনে কাজ করছেন। অন্যান্য এলাকারও অন্তত ৫০ জন বিভিন্ন দেশে গেছেন। জনশক্তি রপ্তানিকারক কোম্পানির প্রতিনিধিরা এসে পরীক্ষা করে লোক নিয়ে যান। কর্মীরা মাসে দুই লাখ থেকে চার লাখ টাকা পর্যন্ত বেতন পাচ্ছেন। 
পাওয়ার ওয়েল্ডিং সেন্টার থেকে এ পর্যন্ত কাজ নিয়ে বিদেশে গেছেন ২৫০ জন। ইউনুস ট্রেনিং সেন্টারের কর্ণধার ইউনুস মিয়া জানান, তাঁর প্রতিষ্ঠান থেকে কাজ শিখে এ পর্যন্ত বিদেশে গেছেন ১৫০ জন। রোমান মিয়ার সিএমটি ট্রেনিং সেন্টার থেকে গেছেন ১০০ জন। বর্তমানে এসব প্রতিষ্ঠানে ১৫০ জন প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন। এসব প্রতিষ্ঠানে কেবল ছাতিরচরের তরুণ-যুবকরাই প্রশিক্ষণ নেন না, জেলার অন্যান্য উপজেলা ছাড়াও ঢাকা, রাজশাহী, বগুড়া, রাজবাড়ী, গাজীপুর, নরসিংদী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, ময়মনসিংহ, জামালপুরসহ বিভিন্ন জেলা থেকে প্রশিক্ষণার্থীরা আসেন।
ছাতিরচর বাজারে কথা হয় কাপড় ব্যবসায়ী ৬ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা হায়দার আলী সেন্টুর সঙ্গে। তাঁর ছেলে শাওন মিয়া পাওয়ার ওয়েল্ডিং সেন্টারে কাজ শিখে ২০২৩ সালে সৌদি আরব গেছেন। তখন আত্মীয়দের কাছ থেকে টাকা ধার করে ছেলেকে পাঠিয়েছিলেন। এখন ভালো বেতন পাচ্ছেন।  
৫ নম্বর ওয়ার্ডের বাচ্চু মিয়ার ছেলে সাইফুল ইসলামও ছাতিরচর থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে এখন সৌদি আরবে আছেন। তিনি মাসে তিন লাখ টাকা বেতন পাচ্ছেন। ৯ নম্বর ওয়ার্ডের লিয়াকত আলীর ছেলে মো. দুর্জয়, আক্কাস আলীর ছেলে আরমান মিয়াও সৌদিতে থাকেন। তারা সবাই ভালো বেতনের চাকরি করেন। এখন প্রবাসীদের প্রতিটি পরিবার খুব ভালো আছে। তারা সন্তানদের টাকায় জমি কিনছেন, নতুন ঘর করেছেন, ব্যবসা করছেন কেউ কেউ। পরিবারে আর অভাব নেই। ৯ নম্বর ওয়ার্ডের ইমরান হোসেন নামে একজন আক্ষেপের সুরে বলেন, ছেলেরা বিদেশ যাচ্ছে, পরিবার উপকৃত হচ্ছে। কিন্তু এই ঝোঁকে পড়ে কিছু মেধাবী তরুণও বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছে। তারা লেখাপড়া করে হয়তো আরও ভালো কিছু করতে পারত। এই বিষয়টিও ভেবে দেখা দরকার বলে মন্তব্য করেন তিনি। 

আরও পড়ুন

×