ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

আড়াইহাজারে রঙিন জীবন, বর্ণিল অর্থনীতি

আড়াইহাজারে রঙিন জীবন, বর্ণিল অর্থনীতি
×

পাখির চোখে তাকালে মনে হয়, আড়াইহাজারের বান্টি গ্রামজুড়ে যেন রঙের মেলা বসেছে সমকাল

সফুরউদ্দিন প্রভাত, আড়াইহাজার (নারায়ণগঞ্জ)

প্রকাশ: ০৬ ডিসেম্বর ২০২৫ | ০৭:১০

| প্রিন্ট সংস্করণ

আড়াইহাজার উপজেলার বান্টি গ্রাম। পাখির চোখে তাকালে মনে হয়, গ্রামজুড়ে যেন রঙের মেলা বসেছে। বাড়ির ছাদ, উঠান কিংবা খোলা মাঠ–যেদিকেই চোখ যায়, বাতাসে দোল খাচ্ছে রং-বেরঙের শাড়ি, ওড়না আর সালোয়ার-কামিজ। রোদে শুকাতে দেওয়া বাটিক করা এই কাপড়গুলো দেখে মনে হয় রং যেন ঢেউ খেলছে। 

চার দশকের বেশি সময় ধরে এভাবেই নিপুণ হাতের ছোঁয়ায় গড়ে উঠেছে আড়াইহাজারের বাটিকশিল্প। আশির দশকের প্রথমদিকে যে পথচলা শুরু হয়েছিল, ৪৪ বছরে তা আজ মহিরুহে পরিণত হয়েছে। প্রায় তিন হাজার পরিবারের জীবন-জীবিকা আর হাজারো নারীর স্বাবলম্বী হওয়ার গল্প মিশে আছে এই শিল্পের সঙ্গে। কৃষিপ্রধান আড়াইহাজার এখন বাটিকপ্রধান শিল্পাঞ্চলে রূপ নিচ্ছে।
বাটিক ব্যবসার প্রথম উদ্যোক্তা কে ছিলেন–তা নিয়ে নানা মত থাকলেও স্থানীয়দের মতে, ১৯৮১ সালের দিকে বান্টি গ্রামের নুরুল ইসলাম মোল্লা স্বল্প পরিসরে প্রথম এই কাজ শুরু করেন। সেই ছোট্ট উদ্যোগ কয়েক গ্রামজুড়ে ছড়িয়ে আজ বিশাল বাণিজ্যিক কর্মযজ্ঞে রূপ নিয়েছে। 
প্রয়াত নুরুল ইসলাম মোল্লার ছেলে বাটিক ব্যবসায়ী মাজাহারুল ইসলাম মোল্লা জানান, তাঁর বাবাই প্রথম বান্টি গ্রামে বাটিকের ব্যবসা শুরু করেন। ধীরে ধীরে তা পুরো গ্রামে এবং পরে পার্শ্ববর্তী চারতালুক, ছনপাড়া, নোয়াগাঁও, গুতুলিয়া ও পাঁচরুখী এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। বর্তমানে ছোট-বড় মিলিয়ে এ অঞ্চলে প্রায় ৪০০-৫০০ কারখানা গড়ে উঠেছে। শুধু স্থানীয়রাই নন; বরিশাল, মুন্সীগঞ্জ, কিশোরগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন জেলার মানুষও এখানে কর্মসংস্থান খুঁজে পেয়েছেন।

নারীকে দিয়েছে অর্থনৈতিক মুক্তি
বাটিক শিল্প আড়াইহাজারের নারীকে দিয়েছে অর্থনৈতিক মুক্তি। বান্টি এলাকার হালিমা খাতুন তাদেরই একজন। স্বামী ইয়াকুব মিয়া অসুস্থ ও কাজে অক্ষম হওয়ায় তিন ছেলেসহ পাঁচজনের সংসারের হাল ধরতে হয়েছে তাঁকে। হালিমা বলেন, ‘কাপড় বুটিক (বাটিক) করে প্রতিদিন গড়ে এক হাজার টাকা আয় করি। ১০ বছর ধরে বাটিকের আয়েই ছেলেদের ভরণপোষণসহ সংসার চালাচ্ছি।’
ওই এলাকারই কামরুন্নাহার। তাঁর স্বামী ওমানপ্রবাসী হলেও সংসারের খরচ চালাতে হিমশিম খাচ্ছিলেন তিনি। দুই বছর ধরে তিনি ‘পদ্ম কাপড়ে’ রিং বাটিকের কাজ করছেন। কামরুন্নাহার বলেন, ‘প্রতি কাপড়ে কাজ করে পাঁচ টাকা পাই। দিনে গড়ে ২০০ কাপড় তৈরি করে যা আয় হয় তা দিয়ে বেশ স্বাচ্ছন্দ্যে সংসার চলছে।’
বান্টি গ্রামের আরেক বাসিন্দা আয়েশা খাতুন চার বছর ধরে বাটিকের কাপড় ভাঁজ করার কাজ করছেন। তিনি বলেন, ‘মাসে ১০ হাজার টাকা আয় করি। আমার মতো হাজারো নারী বাটিকের কাজ করে স্বাবলম্বী হয়েছেন। তাদের সন্তানদের লেখাপড়া এখন আর টাকার অভাবে বন্ধ হয় না।’

বাটিকে সমৃদ্ধ জনপদ
আড়াইহাজারের একসময়ের অভাবী জনপদ এখন বাটিকের কল্যাণে সমৃদ্ধ। ছনপাড়া গ্রামের আলী হোসেন বলেন, একসময় কৃষিকাজ করে সংসার চালাতে কষ্ট হতো। এক যুগ আগে পরিবারের সবাই মিলে বাটিকের কাজ শুরু করি। এখন সচ্ছলতা ফিরেছে। বাড়িতে পাকা ঘর করেছি। নোয়াগাঁও গ্রামের আবদুল হালিম মিয়া জানান, গ্রামের ৯০ শতাংশ মানুষ এখন এই পেশায় যুক্ত, কারও ঘরেই এখন আর অভাব নেই। 
এলাকার ইসমাইল হোসেন জানান, তাঁর পরিবার একসময় কৃষিকাজের সঙ্গে জড়িত ছিল। এক যুগ ধরে তিন ভাই মিলে কাপড়ের অর্ডার নিয়ে ডাইং করে থাকেন। স্ত্রী-সন্তান কাপড় শুকানোর কাজে সহায়তা করেন। তাদের মতো এলাকার ৭০ ভাগ পরিবারই বাড়ির ভেতরে ছোট কারখানা গড়ে তুলে কয়েকজন শ্রমিক নিয়ে কাজ করে থাকেন।

বান্টি এলাকার ইকবাল হোসেন তাঁর ভাই আওলাদ হোসেনকে নিয়ে ছোট পরিসরে বাড়ির ভেতরে গড়ে তুলেন বাটিকের কারখানা। কাপড় বান্টি বাজারে তাদের নিজস্ব দোকানে তুলে বিক্রি করা হয়ে থাকে। পুরো কাজটি তারা পরিবারের সদস্যরাই করে থাকেন। বান্টি বাজারে তাদের দোকানে দিনে ৪০ হাজার টাকা থেকে কোনো কোনো সময় এক লাখ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়। 
ফয়সাল ডাইংয়ের স্বত্বাধিকারী মুজিবুর রহমান জানান, তাঁর কারখানায় ৪০ জন শ্রমিক কাজ করেন। প্রতিদিন দুইশ থেকে তিনশ বাটিক কাপড় তৈরি হয়। এই শিল্পে যুক্ত শ্রমিকরাও ভালো উপার্জন করছেন। ইউসুফ ডাইংয়ে কর্মরত খুলনার সাব্বির হোসেন মোম-বাটিকের কাজ করে মাসে ২০ হাজার টাকা বেতন পান। লিপি ডাইংয়ের ব্লক কারিগর ইমন হোসেন ও মাহবুবুল হক জানান, তারা চুক্তিতে কাজ করে মাসে ১৫ হাজার থেকে ২০ হাজার টাকা পান। ব্লক প্রিন্টার মোশারফ হোসেন মাসে ৩০ হাজার টাকা উপার্জন করেন।
হাসিব পারফেক্ট ফ্যাশন ওয়ার্ল্ডের রাকিবুল ইসলাম রাকিব জানান, বাটিককে কেন্দ্র করে তিনি আলাদা স্থানে কারখানা করেছেন। ৩৫ জন শ্রমিক কাজ করছেন। 

বান্টি বাজার: বাটিকের অঘোষিত রাজধানী
রাজধানী ঢাকা থেকে মাত্র ৩২ কিলোমিটার দূরে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের পাশে অবস্থিত বান্টি বাজার এখন ‘বাটিকের রাজধানী’ হিসেবে পরিচিত। এখানে ২০টি ছোট-বড় মার্কেটে প্রতিদিন ভোর থেকে রাত পর্যন্ত চলে বেচাকেনা। 
ভূইয়া ট্রেডার্সের পরিবেশক বাকির ভূঁইয়া জানান, এখানে ছোট-বড় মিলে প্রায় দেড় হাজার দোকান রয়েছে। গড়ে দৈনিক সর্বনিম্ন ৪০ হাজার থেকে তিন লাখ টাকা পর্যন্ত পণ্যসামগ্রী বিক্রি হয়। সেই হিসেবে প্রতিবছর প্রায় দুই হাজার কোটি টাকার বাণিজ্য হয় এই বান্টি বাজারে। 
দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বাটিকের কাপড় পৌঁছে যাচ্ছে ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে। রপ্তানিকারকরা বান্টি বাজার থেকে বাটিক সংগ্রহ করে বিভিন্ন দেশে পাঠিয়ে থাকেন।  
বান্টি বাজার ব্যবসায়ী সমিতির সাবেক সভাপতি আবদুল হাই ভূঁইয়া জানান, ঢাকা শহরের অভিজাত বিপণিবিতানের চাহিদা বান্টি বাজারের বাটিকে পূরণ হয়। বিশেষ করে এই এলাকার বাটিকের ওড়না, সালোয়ার-কামিজ, বিছানার চাদর ও বালিশের কাপড়ের খ্যাতি দেশজুড়ে। 

গড়ে উঠেছে অন্য ব্যবসা প্রতিষ্ঠানও
বাটিকসামগ্রী দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সরবরাহের জন্য বান্টি এলাকায় পাঁচটি কুরিয়ার সার্ভিসের অফিস রয়েছে। সুন্দরবন কুরিয়ার সার্ভিস বান্টি শাখার ব্যবস্থাপক তিয়াস আহমেদ ও করতোয়া কুরিয়ার সার্ভিসের ব্যবস্থাপক তরিকুল ইসলাম জানান, বাটিক কাপড় সরবরাহের জন্যই এখানে কুরিয়ার সার্ভিসের অফিস নেওয়া হয়েছে। 
বান্টি পাঁচরুখী এলাকায় ১৪টি ব্যাংক শাখা-উপশাখা স্থাপন করেছে। ঢাকা ব্যাংকের সিনিয়র প্রিন্সিপাল অফিসার দেলোয়ার হোসেন জানান, প্রতিদিন এখানকার ব্যাংকগুলোয় বাটিক পণ্যের জন্য ৮ কোটি থেকে ৯ কোটি টাকার লেনদেন হয়। শুধু ঢাকা ব্যাংকের বান্টি উপশাখায় ৬০ লাখ থেকে ৭০ লাখ টাকা লেনদেন হয়। এ ছাড়া বান্টি বাজারে ১০টি মোবাইল ব্যাংকিং সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে।   
মোবাইল ফোনে কথা হয় চট্টগ্রামের টেরিবাজারের রাজস্থান বস্ত্রালয়ের পাইকার স্বপ্না রায়ের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘আড়াইহাজারের বাটিকের মান খুব ভালো। আমি মাসে ৮-১০ লাখ টাকার পণ্য নিই।’ বাগেরহাট থেকে আসা নুরুন্নাহার বেগম জানান, তিনি সপ্তাহে কয়েক লাখ টাকার পণ্য এখান থেকে সংগ্রহ করেন। সিলেট হকার্স মার্কেটের সানিয়া ওড়না হাউস, মা বস্ত্রালয়ের মতো বড় পাইকাররা প্রতি সপ্তাহে এই বাজারে আসেন। 

আরও পড়ুন

×