ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

সূর্যোদয়ে পৌঁছে সূর্যাস্ত দেখে ফেরা

সূর্যোদয়ে পৌঁছে সূর্যাস্ত দেখে ফেরা
×

পটুয়াখালীর কুয়াকাটা সমুদ্রসৈকতের জিরো পয়েন্টে পর্যটকদের বিচরণ সমকাল

আসাদুজ্জামান মিরাজ, কুয়াকাটা (পটুয়াখালী)

প্রকাশ: ০৬ ডিসেম্বর ২০২৫ | ০৭:০৭

| প্রিন্ট সংস্করণ

কুয়াকাটা সমুদ্রসৈকতের বারবিকিউ পয়েন্টে বসে এক বন্ধুকে নিয়ে সূর্যাস্ত দেখছিলেন ঢাকা থেকে আসা নাহিদ প্রিন্স। কাছে গিয়ে আলাপ শুরু করলে তিনি জানালেন, তারা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের চাকরিজীবী। সপ্তাহে এক দিন ছুটি মেলে। ঘোরাঘুরি অনেক পছন্দের, তাই বারবার সাগরকন্যা কুয়াকাটায় ছুটে আসেন। নাহিদ বললেন, এখন অফিস শেষ করে রাতে বাস ধরলে ভোরে কুয়াকাটা পৌঁছানো যায়। বাস থেকে নেমেই সূর্যোদয় দেখেছি, এখন সূর্যাস্ত দেখছি। সন্ধ্যার পরে বারবিকিউ খেয়ে ফের ঢাকায় রওনা দেব। সকালে ঢুকে যাব অফিসে। তিনি বললেন, কম সময়ের হলেও ট্যুরটি পরিপূর্ণ হয়েছে। একই স্থানে বসে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের স্মৃতি সব ক্লান্তি ভুলিয়ে দিয়েছে।

মাত্র তিন বছর আগেও কোনো পর্যটকের জন্য এক দিনে কুয়াকাটা ভ্রমণ কল্পনা করাও সম্ভব ছিল না। রাজধানী থেকে সড়কপথে পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার কুয়াকাটার দূরত্ব ২৬০ কিলোমিটার। ফেরি পার হতে হতো ৯টি। ২০১৮ সালের মধ্যে পর্যায়ক্রমে ৮টি ফেরি পয়েন্টে সেতু নির্মিত হয়। সর্বশেষ পদ্মা সেতু উদ্বোধন হয় ২০২২ সালের ২৫ জুন। এর আগে শীতকালে ঢাকা থেকে কুয়াকাটা যেতে কুয়াশাসহ নানা কারণে ১৮ থেকে ২০ ঘণ্টা লাগত। এখন ঢাকা-কুয়াকাটা ৬ থেকে সাড়ে ৬ ঘণ্টার পথ! ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত এ রুটে শীতাতপ ও সাধারণ বাস চলাচল করছে। চাইলেই রাত ১১টা বা ১২টার বাসে চড়ে সূর্যোদয় দেখে আসা সম্ভব। ৯ ফেরির যুগে রাত ৯টার পর বাস পাওয়া যেত না।
দেশের মধ্যে একমাত্র কুয়াকাটা সমুদ্রসৈকত থেকেই সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত দেখা যায়। এরপরও নাজুক যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে শুধু শীতকালে অল্প কিছু পর্যটক যেতেন। এখন সারা বছরই পর্যটকে গমগম করে সৈকত এলাকা। পরিবহন, আবাসিক হোটেল, রেস্তোরাঁসহ পর্যটনকেন্দ্রিক সব ব্যবসায় নতুন দিগন্তের সূচনা হয়েছে।
ট্যুর অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব কুয়াকাটার (টোয়াক) তথ্যমতে, বর্তমানে কুয়াকাটায় পর্যটকের রাত্রিযাপনের ধারণক্ষমতা ২০ হাজার থেকে ২২ হাজার। তবে পর্যটন মৌসুমে ছুটির দিনগুলোতে পর্যটক আসেন ৫০ হাজার থেকে ৭০ হাজার। যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত হওয়ায় ভোরে এসে সন্ধ্যার পর ফিরে যান ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ পর্যটক।

কুয়াকাটা রেস্তোরাঁ মালিক সমিতির সভাপতি কলিম মাহমুদ ২০০৩ সালে এ ব্যবসা শুরু করেন। তিনি বলেন, বছর কয়েক আগেও কুয়াকাটায় রেস্তোরাঁ ছিল ৭টি আর এখন ৮০টিরও বেশি। তখন একেকটি রেস্তোরাঁয় বিক্রি হতো গড়ে ১০ হাজার থেকে ১২ হাজার টাকা। বর্তমানে এক একটি রেস্তোরাঁয় বিক্রি হয় গড়ে ৪০ হাজার থেকে ৫০ হাজার টাকা। তিনি আরও জানান, তখনকার সময়ে মৌসুমে সর্বোচ্চ পর্যটক আসতেন দিনে তিন থেকে সাড়ে তিন হাজার; যা বর্তমানে ৭০ হাজার থেকে ৮০ হাজারে পৌঁছেছে।
তিন দশক আগে পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে কুয়াকাটার পরিচিতি বাড়তে থাকলেও বছর তিনেক হলো এর দ্রুত বিকাশ ঘটছে। টোয়াক-এর যুগ্ম সম্পাদক ও গ্রিন ট্যুরিজমের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবুল হোসেন রাজু বলেন, আগে বরিশাল অঞ্চলের বাইরের পর্যটকদের কাছে কুয়াকাটায় যাওয়া ছিল অনেকটা দুঃস্বপ্নের মতো। যারা আসতেন, তারা দুর্ভোগের অভিজ্ঞতা নিয়ে দ্বিতীয়বার এ পথে আসতেন না। ফেরির জায়গায় সেতু হওয়াতে সব পাল্টে গেছে। এখন ঢাকা থেকে পর্যটকরা মধ্যরাতে যাত্রা করে শেষরাতে পৌঁছে সূর্যোদয় দেখেন। প্রায় সারাদেশ থেকে ফেরিবিহীন যাত্রায় সহজেই কুয়াকাটায় পৌঁছানো যায়। 
কুয়াকাটা হোটেল-মোটেল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি এমএ মোতালেব শরীফ জানান, পর্যটক কিংবা বিনিয়োগকারী কেউই আগে কুয়াকাটাকে ইতিবাচকভাবে নিতেন না। কয়েক বছরে পর্যটকদের আগমন কয়েকগুণ বেড়েছে। বিনিয়োগকারীও বেড়েছে দ্বিগুণ। তিন বছর আগে কুয়াকাটায় হোটেল ছিল ১২০টি। এখন আড়াইশ ছাড়িয়েছে। 

সৌদিয়া পরিবহনের বরিশাল অঞ্চল ব্যবস্থাপক ইমাম সিকদার জানান, প্রতিদিন তাদের আটটি এসি বাস কুয়াকাটা-চট্টগ্রাম রুটে চলাচল করে। চট্টগ্রাম থেকে কুয়াকাটা পর্যন্ত যাত্রীবাহী বাস চলবে এটি অকল্পনীয় ছিল বলে মন্তব্য করেন তিনি। সৌদিয়ার মতো এখন গ্রিনলাইন, সাকুরাসহ আরও অনেক কোম্পানির এসি বাস কুয়াকাটা রুটে চালু হয়েছে। ইমামের মতে, গত তিন বছরে কুয়াকাটা রুটে পরিবহন সেক্টরে সহস্রাধিক মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। সৌদিয়া পরিবহনেই কর্মসংস্থান হয়েছে আড়াইশজনের। গ্রিনলাইনের বরিশাল অঞ্চল ব্যবস্থাপক আনিচুর রহমান জানান, তাদের ছয়টি বাস প্রতিদিন ঢাকা-কুয়াকাটা যাতায়াত করে। 
সৌদিতে দীর্ঘ প্রবাসজীবন শেষে দেশে ফিরে ব্যবসা করার পরিকল্পনা করছিলেন বরিশাল নগরীর মাহমুদ হোসেন। তখন পদ্মা সেতুর কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। সেতু-পরবর্তী পরিবর্তন চিন্তা করে কুয়াকাটায় ‘বরিশাল গেট’ নামে রেস্তোরাঁ করেন। মাহমুদ বলেন, ‘সেতু হওয়ার আগে যে বিক্রি হতো, এখন সেটি পাঁচগুণ বেড়েছে। কুয়াকাটা এভাবে পাল্টে যাবে ভাবিনি।’ 

আরও পড়ুন

×