বৃক্ষাশ্রমে মানবিক বাড়ি বাস্তুহারা পাখির
কৃত্রিম হ্রদের চারপাশে গাছগাছালির শোভা। বরগুনার সুরঞ্জনা ইকো ট্যুরিজম অ্যান্ড রিসোর্টে সমকাল
আবু জাফর সালেহ, বরগুনা
প্রকাশ: ০৬ ডিসেম্বর ২০২৫ | ০৭:০৬
| প্রিন্ট সংস্করণ
কয়েক বছর আগের কথা। পটুয়াখালীর সাবেক জেলা ও দায়রা জজ রোকসানা পারভীন বেঞ্জুর বরগুনার বাড়িতে নতুন ভবন নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। তখন অনিচ্ছা সত্ত্বেও কাটতে হয়েছিল তাঁর মা-বাবার হাতে রোপণ করা বড় কয়েকটি গাছ। কিছু গাছ কাটার পর তিনি জানতে পারেন, সুরঞ্জনা ইকো ট্যুরিজম অ্যান্ড রিসোর্টে বৃক্ষাশ্রম গড়ে তোলা হয়েছে। কয়েক দফায় ১১টি গাছ সেই বৃক্ষাশ্রমে দেন রোকসানা পারভীন। সবক’টি গাছই আগের মতো মমতায় বেড়ে উঠেছে। সময়ে সময়ে গিয়ে মা-বাবার স্মৃতিবিজড়িত গাছগুলো দেখে আসেন রোকসানা পারভীন।
শুরুর কথা
নির্জন প্রকৃতিপ্রেমীর জন্য যাত্রা শুরু করেছিল সুরঞ্জনা ইকো ট্যুরিজম অ্যান্ড রিসোর্ট। কূলকূল ধ্বনিতে বয়ে যাওয়া বিশখালী ও খাগদোন নদীর মোহনায় ২০২০ সালের দিকে কাজ শুরু হয় বরগুনার এই রিসোর্টের। পরের বছরই হয় উদ্বোধন। বরগুনা শহর থেকে প্রায় ৬ কিলোমিটার দূরে সদর উপজেলার ঢলুয়া ইউনিয়নে গোলবনিয়া এলাকায় গড়ে ওঠে রিসোর্টটি। এর প্রায় ৫০০ মিটার দূরেই বড়ইতলা ফেরিঘাট।
রিসোর্ট সূত্রে জানা গেছে, নগর উন্নয়ন, সড়ক সংস্কার, জমি বিক্রি, ভবন নির্মাণ কিংবা ঝড়ে ভেঙে পড়ার কারণে বহু স্মৃতিবিজড়িত গাছ কেটে ফেলতে হয়। এমন পরিস্থিতিতে বিশেষ প্রক্রিয়ায় গাছ তুলে এনে তারা সুরঞ্জনায় রোপণ করেন। সেই গাছ সুযোগ পায় নতুন করে বাঁচার। এমনকি এই বৃক্ষাশ্রমে বিপুল সুবিধা পায় ঝড়-বৃষ্টিতে ঘরভাঙা পাখিরাও। নিরাপদ আশ্রয়ের পাশাপাশি পাখিকুল পায় পেঁপে-কলার মতো ফল। শুধু পাখির জন্য উৎসর্গ করা একটি বিশেষ বাগানও আছে এখানে।
আকুতি ছিল কাঠবাদাম গাছের
এই উদ্যোগের শুরুটা সহজ ছিল না রিসোর্টের উদ্যোক্তা সোহেল হাফিজের। পেশায় তিনি আইনজীবী ও সংবাদকর্মী। তিনি জানান, ২০২০ সালের শেষ দিকে তারা রিসোর্টের কাজে হাত দেন। ২০২১ সালে কাছাকাছি এলাকার একটি মেঠোপথ চওড়া করা হচ্ছিল। সে জন্য এক্সক্যাভেটর দিয়ে তুলে ফেলা হয় বেশকিছু গাছ। মেহগনিসহ অন্যান্য গাছ নিয়ে যাওয়া হলেও একটি কাঠবাদাম গাছ শ্রমিকেরা ফেলে দেন খালে। তিনি প্রতিদিন এই পথ দিয়ে যাওয়ার সময় গাছটির দিকে তাকিয়ে থাকতেন। গাছটিও যেন তাঁর কাছে বাঁচার আকুতি জানাচ্ছিল।
সোহেল হাফিজের মাথায় তখনই গাছের আশ্রম গড়ে তোলার চিন্তা আসে। তিনি কয়েকজন শ্রমিকের সহায়তায় কাঠবাদাম গাছটি তুলে রোপণ করেন তাঁর রিসোর্টের ভেতর। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় সমকালকে তিনি বলেন, ওই গাছটি মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে। এমনকি এ গাছ থেকেই জন্ম নিয়েছে আরও ২০০টি গাছ। সব কাঠবাদাম গাছই এখন ফলদায়ী।
ফলবাগানের একটি অংশ পাখির জন্য সংরক্ষিত জানিয়ে সোহেল হাফিজ বলেন, পাখির জন্য ফল রাখা দেখে স্থানীয় লোকজন বলছিলেন, এসব পাগলামি। এখন বিপুল সংখ্যক পাখি এখানে বাসা বেঁধেছে। এলাকাবাসী সেই উদ্যোগের জন্য এখন তাঁকে বাহবা দেন।
বরগুনার প্রবীণ চিকিৎসক মনিজা জলির ভাষ্য, জমি বিক্রি ও নতুন ভবন নির্মাণের কারণে স্মৃতিবিজড়িত বহু গাছ কাটতে হয়েছিল তাদের। কিন্তু সুরঞ্জনার কর্মীরা বিশেষ কৌশলে তাঁর কাছ থেকে ১৪টি গাছ তুলে নিয়ে তাদের বৃক্ষাশ্রমে রোপণ করেছেন। এখন প্রায়ই সুরঞ্জনায় ঘুরতে যান তিনি। দেখা করেন গাছগুলোর সঙ্গে। এমন উদ্যোগকে খুবই কার্যকর ও প্রয়োজনীয় বলেও মনে করেন তিনি।
২০২৩ সালের শেষের দিকে ডা. মনিজার বাড়ি থেকে ১৫ হাত লম্বা একটি নারিকেল গাছ আনা হয়েছিল। এ তথ্য জানিয়ে সোহেল হাফিজ বলেন, তারা গাছটি রোপণ করার পর দেখতে পান, ঝড়ের সময় সেটি হেলতে পারছে না। ২০২৪ সালের ঝড়ে সেই গাছটির মাথা ভেঙে যায়। সঠিক পরিচর্যার পর সেই গাছটিও মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে।
এই উদ্যোক্তার ভাষ্য, রিসোর্টের জন্য তারা ব্যক্তি মালিকানাধীন বেশকিছু জমি ৩০ বছরের জন্য চুক্তিতে নিয়েছেন। কিছু জমি কিনেছেন। আর বনের পাশে থাকা কিছু খাসজমি সরকারের কাছে ইজারার আবেদন করেছেন।
এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগ ইতোমধ্যে দর্শনার্থীদের দৃষ্টি কেড়েছে। সুরঞ্জনা রিসোর্ট কর্তৃপক্ষ জানায়, এখানে বিলুপ্তপ্রায় ৫০ প্রজাতির এক হাজারেরও বেশি ফলদ বৃক্ষ রয়েছে। এগুলো পুরোপুরি পাখির খাবার হিসেবে রাখা হয়েছে। শত শত দেশীয় প্রজাতির পাখি যখন পাকা পেঁপে, কলা ও অন্যান্য ফল খায়, সেই দৃশ্য মুগ্ধ হয়ে দেখেন দর্শনার্থীরা। ফলে দিন দিন ভিড় বাড়ছে দর্শনার্থীর। এখানে কেউই পাখিকে বিরক্ত করে না, যে কারণে বাড়ছে পাখির সংখ্যাও।
অনুসরণীয় উদ্যোগ: প্রয়োজন জেলায় জেলায়
পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাইমেট স্মার্ট এগ্রিকালচার বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মো. আলমগীর কবীরের মতে, সুরঞ্জনার এই বৃক্ষাশ্রম বৃক্ষপ্রেমীর মাঝে নতুন চিন্তার জন্ম দিয়েছে। ঘূর্ণিঝড়প্রবণ ও নদীভাঙনকবলিত এলাকায় বৃক্ষ সংরক্ষণে উদ্যোগটি যেমন ব্যতিক্রমী, তেমনি কার্যকর। দেশের প্রতিটি জেলায় সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে এমন কেন্দ্র থাকা জরুরি। বৃক্ষাশ্রমটিতে তাল, খেজুর, গাব, কাঠবাদাম, ডেউয়া, কাউফলসহ বিলুপ্তপ্রায় অসংখ্য দেশীয় প্রজাতির গাছ রোপণ করা হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, এটি পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার পাশাপাশি পাখির নিরাপদ আশ্রয়স্থলও তৈরি করেছে। দেশের সব ইকো ট্যুরিজম কেন্দ্রের জন্য সুরঞ্জনার উদ্যোগ অনুসরণীয় হতে পারে।
বরগুনার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) অনিমেষ বিশ্বাস বলেন, প্রকৃতিনির্ভর এ ইকো ট্যুরিজম কেন্দ্রের বৃক্ষ পুনর্বাসন ও পাখির অভয়ারণ্য তৈরির সৃজনশীল কর্মসূচি দর্শনার্থীদের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। প্রতিদিনই দেশের নানা প্রান্ত থেকে মানুষ এখানে আসছেন। স্থানীয় নারী ও শিশুদের জন্যও এটি নতুন বিনোদনের সুযোগ। এর মাধ্যমে বরগুনার পর্যটনশিল্প দেশজুড়ে পরিচিতি পাচ্ছে। শুরু থেকেই জেলা প্রশাসন এ উদ্যোগে সহযোগিতা করে আসছে। ভবিষ্যতেও তা চলবে।
- বিষয় :
- প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী
