সফল ১০ হাজার তরুণের স্বপ্নস্রষ্টা ফারুক
নিজ কারখানায় শ্রমিকদের সঙ্গে ব্যস্ত শেখ আবদুল্লাহ আল ফারুক সমকাল
এস এম কাওসার, বগুড়া
প্রকাশ: ০৪ ডিসেম্বর ২০২৫ | ০৮:৩১
| প্রিন্ট সংস্করণ
বেকারত্বের অন্ধকার ঘোচাতে কাজ করছেন বগুড়ার তরুণ উদ্যোক্তা শেখ আবদুল্লাহ আল ফারুক। তাঁর প্রতিষ্ঠিত সোর্স অব এগ্রো ও বিজয়ী ভেঞ্চারস লিমিটেড আজ দেশের হাজারো তরুণের স্বাবলম্বী হওয়ার অবলম্বন। আধুনিক কৃষিযন্ত্র উৎপাদন, প্রশিক্ষণ এবং উদ্যোক্তা তৈরি– সব মিলিয়ে তিনি হয়ে উঠেছেন তরুণদের অনুপ্রেরণার প্রতীক।
আদমদীঘির চাঁপাপুরের বাসিন্দা শেখ আবদুল্লাহ আল ফারুক পদার্থবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর শেষ করেই গড়ে তোলেন কম্পিউটার প্রশিক্ষণ কেন্দ্র। ২০১৯ সালে শুরু করেন সোর্স অব এগ্রো। আঙিনায় প্রযুক্তিনির্ভর মৎস্য চাষ দিয়ে তাঁর পথচলার সূচনা। আজ তাঁর প্রতিষ্ঠানে কর্মরত অর্ধশত নারী-পুরুষ; আর প্রশিক্ষণ নিয়ে সফল হয়েছেন ১০ হাজারেরও বেশি উদ্যোক্তা। জাতীয় যুব দিবসে এ বছর তিনি বগুড়া জেলার শ্রেষ্ঠ যুব উদ্যোক্তা নির্বাচিত হয়েছেন। সম্প্রতি চীন সফরে গিয়ে তিনি পরিদর্শন করেছেন বিভিন্ন কারখানা ও প্রযুক্তি কেন্দ্র। দেশেই এসব প্রযুক্তি উৎপাদনের স্বপ্ন দেখছেন তিনি।
সোর্স অব এগ্রোর বিসিক কারখানায় প্রতিনিয়ত উৎপাদিত হচ্ছে তিনমাথা ম্যাজিক মেশিন, ভাসমান ফিড মেশিন, ভূষি মেশিন, খড় কাটার মেশিন, সরিষার তেলের মেশিন, হান্টার মেশিন ও জুতা-স্যান্ডেল তৈরির মেশিনসহ আধুনিক নানান কৃষিযন্ত্র। তাঁর সেগ্রিগেটর মেশিনে বর্জ্য থেকে তৈরি হচ্ছে জৈবসার–এটি ব্যবহার করছে কুষ্টিয়াসহ কয়েকটি পৌরসভা। কৃষকদের মাঝে ব্যাপক সাড়া ফেলছে এখানকার নার্সারি। মৌসুমভিত্তিক ও নতুন জাতের চারা দিয়ে চলছে পরীক্ষামূলক চাষাবাদ।
কারখানার ব্যবস্থাপক আবু শ্যামা বলেন, দেশের প্রায় প্রতিটি জেলায় এসব মেশিন যাচ্ছে। বেকার যুবকরা প্রশিক্ষণ নিয়ে মেশিন বসিয়ে ব্যবসা করছেন। কৃষকরা ভিন্ন ধরনের ফসল চাষে আগ্রহী হচ্ছেন। ফলে মেশিনের চাহিদা দিন দিন বাড়ছে।
হাজারো তরুণের দিনবদলের গল্প
উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগ, বিপণনসহ সব সহায়তা নিশ্চিত করতে ফারুক গড়ে তুলেছেন বিজয়ী ভেঞ্চারস লিমিটেড। এ প্রতিষ্ঠানের অধীনে রয়েছে লিডার, ডিলার ও পার্টনার ক্যাটেগরিতে ব্যবসার সুযোগ; তরুণদের দক্ষ করতে রয়েছে বিজয়ী একাডেমি। শিশুর সৃজনশীলতা বিকাশে রয়েছে বিজয়ী একাডেমি–কিডস শাখা।
শেরপুরের বড় ব্যবসায়ী মনোয়ার হোসেন কাগজ-কলমের হিসাব ছেড়ে নিয়েছেন সোর্স অব এগ্রোর তৈরি ‘বিজ ব্রেইন এআই’ সফটওয়্যার। স্টক ম্যানেজমেন্ট, ব্যালান্স শিট, স্যালারি, স্টাফ ম্যানেজমেন্ট, সেলস রিপোর্ট–সমস্ত হিসাব রয়েছে এক সফটওয়্যারে।
ঠাকুরগাঁওয়ের হরিপুরের যুবক হীরা চন্দ্র রায় চাকরি না পেয়ে দীর্ঘদিন হতাশায় ভুগছিলেন। সামাজিক মাধ্যমে সোর্স অব এগ্রোর সঙ্গে পরিচয়। দুই বছর আগে প্রশিক্ষণ নেন এবং সংগ্রহ করেন তিনমাথা ম্যাজিক মেশিন। এক মেশিনেই পশুখাদ্য, ধান থেকে চাল, আটা ও মসলা গুঁড়া– সবই সম্ভব। বর্তমানে তিনি মাসে প্রায় ৫০ হাজার টাকা আয় করছেন।
আদমদীঘির গোবিন্দপুরের কৃষক দেলোয়ার হোসেন ধান চাষের বাইরে কিছু ভাবতেন না। সোর্স অব এগ্রোর পরামর্শে তিনি এখন বারোমাসি টমেটো, পেঁপে ও ক্যাপসিকাম চাষ করছেন। এতে তাঁর আয় ধানের চেয়ে অনেক বেশি।
দেলোয়ার বলেন, ‘সোর্স অব এগ্রো আমাকে নতুন ফসলের স্বপ্ন দেখিয়েছে।’
শেখ আবদুল্লাহ আল ফারুকের স্বপ্ন
ফারুক স্বপ্ন দেখেন এমন এক বাংলাদেশের, যেখানে উন্নত কৃষিযন্ত্র তৈরি হবে তাঁর কারখানায়। কৃষকরা বিদেশি যন্ত্রের দিকে তাকিয়ে না থেকে নিজেদের হাতে তৈরি যন্ত্র ব্যবহার করবে। একদিন ‘মেইড ইন বাংলাদেশ’ লেখা কৃষিপ্রযুক্তি বিদেশে রপ্তানি হবে–এই বিশ্বাসই তাঁকে এগিয়ে নিয়ে যায়।
ফারুক বলেন, জ্ঞান, নৈতিকতা ও দেশের প্রতি ভালোবাসা–এই তিন শক্তিকে নিয়ে এগোতে চাই। ব্যবসা আমার কাছে শুধু লাভের হিসাব নয়, এটি মানুষের জীবন বদলের মাধ্যম। আমি চাই, প্রত্যেক তরুণ এমন কিছু বানাক, যা তাঁর পরিবার, সমাজ ও দেশকে বদলে দেবে। বাংলাদেশ একদিন প্রযুক্তি উদ্ভাবনে বিশ্বের সামনে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে–এই স্বপ্নই আমার প্রতিটি উদ্যোগের চালিকাশক্তি।
যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের উপপরিচালক তোসাদ্দেক হোসেন বলেন, ফারুক নিজে যেমন উদ্যোক্তা, তেমনি অন্যকেও উদ্যোক্তা করছেন। এ বছর তিনি জেলার শ্রেষ্ঠ যুব উদ্যোক্তা হয়েছেন।
বগুড়া বিসিকের উপমহাব্যবস্থাপক এ কে এম মাহফুজুর রহমান বলেন, সোর্স অব এগ্রোর মেশিনগুলো মানসম্মত ও সাশ্রয়ী।
অনেক যুবক বেকারত্ব দূর করতে এসব মেশিন ব্যবহার করছেন।
- বিষয় :
- প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী
