ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

সেবা প্রকাশনী

জেগে ওঠা কয়েক প্রজন্মের স্মৃতি

জেগে ওঠা কয়েক প্রজন্মের স্মৃতি
×

ছবি: সংগৃহীত

দ্রোহী তারা

প্রকাশ: ১৪ মে ২০২৬ | ২১:৩২

সেবা প্রকাশনীর কার্যক্রম গতকাল বুধবার সাময়িকভাবে স্থগিতের ঘোষণার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বইপ্রেমীদের মধ্যে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। পুরোনো বইয়ের প্রচ্ছদ, বুকশেলফের ছবি ও পাঠস্মৃতি অনেকে তাদের কৈশোর ও তারুণ্যের অভিজ্ঞতা তুলে ধরছেন। কেউ তুলে আনছেন হলুদ হয়ে যাওয়া তিন গোয়েন্দা সিরিজের পুরোনো কপি, কেউ খুঁজে বের করছেন মাসুদ রানার বহুবার পড়া বই।

১৯৬৩ সালে কথাসাহিত্যিক কাজী আনোয়ার হোসেন প্রতিষ্ঠিত সেবা প্রকাশনী দীর্ঘদিন ধরে দেশের জনপ্রিয় ধারার সাহিত্য প্রকাশনার অন্যতম প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত। প্রকাশনীর জনপ্রিয় সিরিজগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘মাসুদ রানা’, ‘তিন গোয়েন্দা’, ‘কুয়াশা’, ‘ওয়েস্টার্ন’ ও ‘ভৌতিক’। আশির দশকে তরুণদের হাতে হাতে ঘুরেছে মাসুদ রানা সিরিজের ধ্বংস পাহাড়, মিশন তেল আবিব, এখনও ষড়যন্ত্র।

নব্বইয়ের দশকে স্কুলব্যাগের ভেতর জায়গা করে নিয়েছে তিন গোয়েন্দার আংটির রহস্য, প্রেত সাধনা, উল্কি রহস্য। ২০০০ সালের পরও নতুন প্রজন্ম মুগ্ধ হয়েছে সিলেটে তিন গোয়েন্দা, নিশির ডাক, পিছনে কে এবং ওয়েস্টার্ণ বইগুলোতে।

বিভিন্ন সময়ের পাঠকেরা জানান, সেবা প্রকাশনীর বই তাদের পাঠাভ্যাস ও কল্পনার জগৎ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

সত্তরের দশকের শেষদিকে কলেজে পড়ার সময় প্রথম সেবার বই হাতে নেন আব্দুল মান্নান। বর্তমানে একটি বেসরকারি ব্যাংকে কর্মরত আছেন তিনি। এক বন্ধুর কাছ থেকে পেয়েছিলেন মাসুদ রানা সিরিজের ধ্বংস পাহাড়।

তিনি জানান, কলেজে পড়ার সময় তিনি প্রথম ‘মাসুদ রানা’ সিরিজের ‘ধ্বংস পাহাড়’ পড়েন। পরে ‘অগ্নিপুরুষ’, ‘সাগর সঙ্গম’ ও ‘মিশন তেল আবিব’সহ আরও বিভিন্ন বই পড়েছেন। তার বন্ধু বলেছিলেন, একবার পড়া শুরু করলে ঘুমাতে পারবি না। সত্যিই তাই হয়েছিল। যদিও তখন এসব বই পড়ছি, সেটা অভিভাবকরা জানতে পারাটা বিপদজনক ছিল। আশির দশকে বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া তরুণদের মধ্যে সেবা প্রকাশনীর বই ছিল এক অন্য ধরনের থ্রিলিং বিষয়। আমাদের আড্ডায় রাজনীতি যেমন ছিল, তেমনি নতুন মাসুদ রানা কে আগে পড়েছে, সেটাও ছিল আলোচনার বিষয়।

অন্যদিকে নব্বইয়ের দশকে স্কুলজীবনের সবচেয়ে বড় আনন্দ ছিল নতুন তিন গোয়েন্দা সংগ্রহ করা, এমনটাই বলছিলেন শারমিন আক্তার। তিনি মোহাম্মদপুরের একটি স্কুলের শিক্ষক হিসেবে কর্মরত আছেন। তিনি বলেন, তখন বিষয়টা এমন ছিল যে, হাতের কাছে যে বইটাই পেতাম সেবার তিন গোয়েন্দা, সেটাই আগে লুকিয়ে বাসায় নিয়ে আসতাম। নয়তো অন্যকোনো বন্ধুর নিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা বেশি ছিল। 

তার মতে, তখনকার কিশোরদের কাছে কিশোর পাশা, রবিন আর মুসা শুধু চরিত্র ছিল না, তারা আমাদের শিখিয়েছিল বন্ধুত্বের আসল মানে। 

শারমিন তার পুরোনো দুই/তিনটা তিন গোয়েন্দার বই দেখিয়ে বলেন, কিশোর পাশার যুক্তি, রবিনের সাহস আর মুসার হাস্যরস-সব মিলিয়ে গল্পগুলো একেবারে জীবন্ত হয়ে উঠত। ক্লাসে বই লুকিয়ে পড়েছি, বন্ধুদের সঙ্গে বই বদল করেছি। আজও পুরোনো বইয়ের গন্ধ পেলেই সেই দিনগুলো মনে পড়ে।

শারমিন বলেন, তিন গোয়েন্দা বই পড়তে পারলেও নিষিদ্ধ বই হিসেবে স্বীকৃত ছিল মাসুদ রানা। কোনোভাবে অভিভাবকরা টের পেলেই উত্তমমধ্যম পড়তো। তবুও লুকিয়ে লুকিয়ে তখন পড়তাম বইগুলো।

চিত্রশিল্পী ও অ্যানিমেটর শাহনাজ জাহান বলেন, কিশোর বয়সে পড়া সেবা প্রকাশনীর বই তার কল্পনাশক্তি ও ভিজ্যুয়াল স্টোরিটেলিংয়ের প্রতি আগ্রহ তৈরিতে ভূমিকা রেখেছে। তিনি জানান, ‘আংটির রহস্য’, ‘টাইম মেশিন’ ও ‘ড্রাগনের অভিশাপ’-এর মতো বই তার ওপর প্রভাব ফেলেছিল। সাধারণ একটি আংটির পেছনে এত বড় রহস্য লুকিয়ে থাকতে পারে, এটা ভাবতেই আমার কিশোর মন বিস্ময়ে ভরে উঠত। সেবা প্রকাশনীর সাময়িক বন্ধের খবর দেখে তার ভেতরে ফিরে এসেছে পুরোনো স্মৃতি।

আশির দশকে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস, নব্বইয়ের স্কুলব্যাগ, দুই হাজারের বুকশেলফ-প্রতিটি সময়েই সেবা প্রকাশনী কোনো না কোনোভাবে তরুণদের পাঠাভ্যাসের অংশ ছিল। কেউ মাসুদ রানা পড়ে বড় হয়েছেন, কেউ তিন গোয়েন্দা পড়ে রহস্য ভালোবেসেছেন, কেউ ভৌতিক পড়ে রাত জেগেছেন।

গত বুধবার সন্ধ্যায় সেবা প্রকাশনীর পক্ষ থেকে প্রকাশিত এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরে বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ তদন্ত এবং অডিট কার্যক্রম পরিচালনার স্বার্থে সাময়িকভাবে সব ধরনের কার্যক্রম স্থগিত রাখা হয়েছে।

প্রকাশনীর অংশীদার কাজী শাহনূর হোসেন স্বাক্ষরিত ‘সাময়িক কার্যক্রম স্থগিত’ শিরোনামের নোটিশটি প্রতিষ্ঠানটির ফেসবুক পেইজে প্রকাশ করা হয়। পরে সেটি শেয়ার করেন সেবা প্রকাশনীর উপদেষ্টা মাসুমা মায়মুর।

নোটিশটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শেয়ার করেন প্রয়াত কথাসাহিত্যিক কাজী আনোয়ার হোসেনের ছোট ছেলে কাজী মায়মুর হোসেনের স্ত্রী এবং সেবা প্রকাশনীর উপদেষ্টা মাসুমা মায়মুর।

তবে এই সাময়িক সিদ্ধান্তে পাঠকদের উদ্বিগ্ন না হওয়ার আহ্বান জানিয়ে মাসুমা মায়মুর বলেন, সেবা প্রকাশনীর যাত্রা থেমে যাচ্ছে না। বরং অভ্যন্তরীণ বিষয়গুলো স্বচ্ছভাবে পর্যালোচনা এবং নতুন ব্যবস্থাপনা কাঠামো গড়ে তোলার পর প্রতিষ্ঠানটি নতুন ভাবনা, নতুন পরিকল্পনা এবং নতুন রূপে আবারও পাঠকের সামনে ফিরে আসবে। 

পাঠক ও সংশ্লিষ্টদের মতে, সেবা প্রকাশনী শুধু একটি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান নয়, বরং কয়েক প্রজন্মের পাঠাভ্যাস ও স্মৃতির অংশ হয়ে উঠেছিল। সে কারণেই হয়তো বুকশেলফে রাখা পুরোনো কোনো ছেঁড়া প্রচ্ছদ এখনও বহু মানুষের কাছে শুধু একটি বই নয়, কৈশোরে ফিরে যাওয়ার একটি দরজা।

আরও পড়ুন

×