ঢাকা বুধবার, ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সাম্যবাদী রবীন্দ্রনাথ

সাম্যবাদী রবীন্দ্রনাথ
×

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

আব্দুর রশীদ

প্রকাশ: ০৭ আগস্ট ২০২৬ | ১৫:২৯ | আপডেট: ০৭ আগস্ট ২০২৬ | ১৫:৩২

রবীন্দ্রনাথ জন্মেছিলেন একটি অসাধারণ জমিদার পরিবারে, জোড়াসাঁকো ঠাকুর বাড়িতে। তখন উনবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধ ১৮৬১ সাল, ভারতবর্ষে বৃটিশ উপনিবেশের শতবর্ষ অতিক্রম করেছে এবং ইউরোপীয় মানবমুক্তির দর্শন ভারতবর্ষে আছড়ে পড়েছে। ঠাকুর পরিবারেও এর প্রভাব পড়েছিল। একইসাথে ঠাকুর পরিবারের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল স্বাদেশিকতা এবং বাংলা ভাষার প্রতি গভীর অনুরাগ আর দ্ব্যর্থহীন আনুগত্য।

সাম্য এবং মানবমুক্তির কথা যারা চিন্তা করেছেন, তাঁদের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের চিন্তা এক হয়ে গেছে। মার্ক্স, লেনিন, মিল, রুশো,  ভলতেয়ার, লক, হবস্ প্রমুখের পাশাপাশি রবির নামও উচ্চারিত হয়।

বালক বয়সেই  রবীন্দ্রনাথের ভাবনায় মানুষে মানুষে অসাম্যের বিপরীতে সাম্যের ধারণা আসে। 
পুস্তক আকারে তাঁর প্রথম প্রকাশিত গ্রন্থ ‘কবি-কাহিনী’ প্রকাশিত হয় ১৮৭৮ সালে। রবীন্দ্রনাথের বয়স তখন মাত্র ১৭ বছর। রবীন্দ্রনাথ ‘জীবনস্মৃতি’তে লিখেছেন— ‘এই কবি-কাহিনী আমার রচনাবলীর মধ্যে প্রথম গ্রন্থ আকারে বাহির হয়। আমি তখন মেজদাদার নিকট আহমেদাবাদে ছিলাম, তখন আমার কোনো উৎসাহী বন্ধু এই বইখানা ছাপাইয়া আমার নিকট পাঠাইয়া আমাকে বিস্মিত করিয়া দেন।’
প্রথম প্রকাশিত গ্রন্থ ‘কবি-কাহিনী’তে তাঁর সাম্যবাদী চিন্তার স্ফুরন ঘটে।—

‘অযুত মানবগণ এক কণ্ঠে, দেখ,
এক গান গাইবেক স্বর্গ পূর্ণ করি!
নাইক দরিদ্র ধনী অধিপতি প্রজা-
কেহ কারো কুটিরেতে করিলে গমন 
মর্য্যাদার অপমান করিবে না মনে, 
সকলেই সকলের করিতেছে সেবা, 
কেহ কারো প্রভু নয়, নহে কারো দাস!
নাই ভিন্ন জাতি আর নাই ভিন্ন ভাষা
নাই ভিন্ন দেশ, ভিন্ন আচার ব্যাভার!
...
সে দিন  আসিবে গিরি, এখনিই যেন 
দূর ভবিষ্যৎ সেই পেতেছি দেখিতে
যেই দিন এক প্রেমে হইয়া নিবন্ধ
মিলিবেক কোটি কোটি মানবহৃদয়। 
প্রকৃতির সব কার্য্য অতি ধীরে ধীরে, 
এক এক শতাব্দীর সোপানে সোপানে -
পৃথ্বী  সে শান্তির পথে চলিতেছে ক্রমে,
পৃথিবীর সে অবস্থা আসে নি এখনো
কিন্তু এক দিন তাহা আসিবে নিশ্চয়।’

কিশোর বয়সের লেখা কাঁচা, যখন মার্ক্সবাদী সমাজতন্ত্রী ধারণার সঙ্গে সম্ভবত তখনও তাঁর পরিচয় ঘটেনি।

রবীন্দ্রনাথ তাঁর সমগ্র সাহিত্যকর্ম- কবিতা, প্রবন্ধ, নাটক, উপন্যাস, বক্তৃতা ইত্যাদির মধ্যে দিয়ে উনবিংশ শতাব্দীর শেষ দশকের মধ্যেই খ্যাতি লাভ করেন। সাহিত্যিক হিসাবে বাঙলাভাষী মানুষের মাঝে তাঁর আসন পাতা হয়ে যায়। বিংশ শতাব্দীর শুরু,  ইতোমধ্যে রবীন্দ্রনাথ বাঙালির মনে একজন বড়ো কবি এবং সাহিত্যিক বলে প্রতিষ্ঠিত। ১৯০১ সালে শিলাইদহ থেকে রবীন্দ্রনাথ শান্তি নিকেতনে থিতু হলেন বড়ো চিন্তা, বৃহৎ কর্মের চিন্তা নিয়ে এবং ব্যাপৃত হলেন মহা কর্মযজ্ঞে। লক্ষ্য-শিক্ষার মাধ্যমে বিশ্বমানবের মিলন। বিশ্বের মানুষ তার ভেদ ভুলে মিলবে বিশ্বমানবের মুক্তির পথে। তিনি বললেন, ‘আগামীদিনের বিশ্ব হবে  সর্বজাতিকের মিলনের বিশ্ব এবং শান্তিনিকেতন  বিশ্বভারতী হবে সেই মিলনক্ষেত্র।’ এভাবে কবির সাম্যের চিন্তা, বিশ্বমানবের মিলনের চিন্তা এবং এ লক্ষ্য নিয়ে কাজ অগ্রসর হতে থাকে।

১৯১০ সালে রবীন্দ্রনাথ রাজা নাটকের জন্য একটি গান লিখলেন। যে গানে মানুষে মানুষে ভেদ, রাজায় প্রজায় ভেদ বিলুপ্ত করে দিলেন। এটাই কবির অন্তরে লালিত দর্শন। সে গানে আছে -

‘আমরা  সবাই রাজা আমাদের এই রাজার রাজত্বে-
নইলে মোদের রাজার সাথে মিলব কী স্বত্বে?।
আমরা যা খুশি তাই করি, তবু তার খুশিতেই চরি,
আমরা নই বাঁধা নই দাসের রাজার ত্রাসের দাসত্বে-
নইলে মোদের রাজার সনে মিলব কী স্বত্বে?।
রাজা সবারে দেন মান, সে মান আপনি ফিরে পান,
মোদের খাটো ক’রে রাখে নি কেউ কোনো অসত্যে-
নইলে মোদের রাজার সনে মিলব কী স্বত্বে?
আমরা চলব আপন মতে, শেষে মিলব তাঁরি পথে,...’

এখানেই কবির আকাঙ্ক্ষার প্রকাশ পেয়েছে— যা ভেদের বিলোপ, সাম্য এবং বিশ্ব মানবের মিলন।

সমাজে সীমাহীন ধনবৈষম্য সভ্যতার মূল শত্রু। একথা বাল্যকালেই রবীন্দ্রনাথের অন্তরে প্রবেশ করেছিল।
একটু আগেই বলা হয়েছে যে সার্বজাতিকের, বিশ্বমানবের মিলনের আকাঙ্ক্ষা নিয়ে শান্তিনিকেতন এবং বিশ্বভারতীর সাধনা শুরু হয়েছিল। সমাজের ব্যবস্থার মধ্যে এমন গলদ যদি থাকে যাতে ধনবৈষম্য প্রকট হয়— সেখানে বিশ্বমানবের মিলন হতে পারে না,  অর্থাৎ সেখানে সাম্যের সমাজ প্রতিষ্ঠা অসম্ভব। ১৯৩১ সালের ৮ই ফেব্রুয়ারি শ্রীনিকেতনের এক অভিভাষণে রবীন্দ্রনাথ বলেন—‘যেখানে কোন সভ্যতা উৎকর্ষ লাভ করে ক্রমে ক্রমে বিলয় হয়েছে, সন্ধান করলে দেখতে পাবেন তার একটিমাত্র কারণ - যারা ক্ষমতাশালী, তারা অক্ষমদের সঙ্গে যোগ হ’তে বিচ্ছিন্ন হয়েছে। তাদের মধ্যে সামাজিক সামঞ্জস্য নষ্ট হয়েছে বলে-
যে জীবন ধারা সমস্ত সমাজ-দেহে সঞ্চালিত থাকলে শরীর সুস্থ থাকে তাতে ব্যাঘাত ঘটেছে বলে মরেছে।’

১৯২৭ সালে আন্তর্জাতিক সমবায় দিবস উৎসবে তিনি যে ভাষণ দিয়েছিলেন তাতে তিনি সাম্যের পক্ষে জোরাল অবস্থানই ব্যক্ত করেছেন। কলকাতার আলবার্ট ইনস্টিটিউট হলে ৩রা জুলাই প্রদত্ত ভাষণে তিনি বলেন— ‘আজ ইউরোপের নকলে এদেশেও বড় বড় সহরে বড় বড় কেন্দ্রে ধন কেন্দ্রীভূত হয়ে উঠছে; যন্ত্র এসে মানুষের হাত থেকে তাদের ধন কেড়ে নিয়ে পুঞ্জীভূত করছে।  এই সব বড় বড় সঙ্ঘ, প্রতিষ্ঠান ধনকুবেরদের স্বতন্ত্র জীবনধারা আছে। এদের সঙ্গে জনসাধারণের প্রাণের কোন যোগ নেই; সুতরাং সমাজের সর্বত্র অসীম দুঃখ, বিশৃঙ্খল, বৈষম্য উপস্থিত হয়েছে। আর এই সব প্রবল শক্তিশালী ব্যক্তি বা সঙ্ঘের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করবার শক্তি ব্যক্তির নাই; কেননা, যে বিশেষ জ্ঞান, বিরাট আয়োজন ও বিপুল অর্থ এঁদের পিছনে আছে,  তা কোনো ব্যক্তির পক্ষে আয়ত্ত করা সম্ভব নয়। তাই, আজ পৃথিবীতে ব্যক্তি- জনসাধারণ - যন্ত্রের পেষণে প্রবল শক্তিশালী সঙ্ঘের অত্যাচারে আর্ত্তনাদ করছে, পৃথিবীতে এত দুঃখ, কষ্ট, বৈষম্য দেখা দিয়েছে।’

সাম্যের পক্ষে এবং ধনবাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে একই কথা বলেছেন রবীন্দ্রনাথ অন্য এক অভিভাষণে। ১৯২০ সালের ২০ ডিসেম্বর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় আয়োজিত দার্শনিক মহাসভায় প্রদত্ত ভাষণে কবি বলেন –‘সভ্যতার অর্থই হইতেছে,  মানবজাতিকে পূর্ণ বিকাশ সাধনের সর্বপ্রকার সুবিধা দান করা। সেই উদ্দেশ্য নষ্ট হয়, যখন স্বার্থান্ধ প্রবৃত্তি নৈতিক আদর্শের স্থান গ্রহণ করিয়া নিজের অসুবিধার জন্য সকলের সম্পদ অবাধে লুণ্ঠন করে। এই ধন হরণের লিপ্সা এবং সৃষ্টির মূলনীতি পরস্পরবিরোধী।’

রবীন্দ্রনাথের ভ্রমণ সাহিত্য গ্রন্থ ‘রাশিয়ার চিঠি’ — যেখানে তিনি তাঁর সাম্যবাদী দৃষ্টিভঙ্গি এবং সাম্যবাদের প্রতি অবস্থান স্পষ্ট করেছেন। ‘রাশিয়ার চিঠি’তে লিখছেন— ‘অবশেষে রাশিয়ায় আসা গেল। যা দেখছি আশ্চর্য ঠেকছে। অন্য কোনো দেশের মতোই নয়। একেবারে মূলে প্রভেদ।  আগাগোড়া সকল মানুষকেই এরা সমান করে জাগিয়ে তুলছে।’

রবীন্দ্রনাথ রাশিয়া ভ্রমণ করেন ১৯৩০ সালের ১১ সেপ্টেম্বর থেকে ২৫ শে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। এই ভ্রমণকালে লিখিত চিঠিগুলিতে দুঃখী, নিপীড়িত মানুষের প্রতি তাঁর অসামান্য দরদী মনোভাব ফুটে উঠেছে। পুত্র রথীন্দ্রনাথকে লেখা প্রথম চিঠিতে কবি লিখলেন— ‘চিরকালই মানুষের সভ্যতায় একদল অখ্যাত লোক থাকে, তাদেরই সংখ্যা বেশি, তারাই বাহন; তাদের মানুষ হবার সময় নেই; দেশের সম্পদের উচ্ছিষ্টে তারা পালিত। সবচেয়ে কম খেয়ে কম পরে কম শিখে বাকি সকলের পরিচর্যা করে; সকলের চেয়ে বেশি তাদের পরিশ্রম, সকলের চেয়ে বেশি তাদের অসম্মান। কথায় কথায় তার উপোসে মরে, উপরওয়ালাদের লাথি ঝাটা খেয়ে মরে-জীবন-যাত্রার জন্য যতকিছু সুযোগ সুবিধে সবকিছুর থেকেই তারা বঞ্চিত। তারা সভ্যতার পিলসুজ, মাথায় প্রদীপ নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে- উপরে সবাই আলো পায়, তাদের গা দিয়ে তেল গড়িয়ে পড়ে।’

তৃতীয় চিঠিটি লিখেছিলেন প্রশান্তচন্দ্র মহালনবিশকে। - ‘একদিন ফরাসি -বিদ্রোহ ঘঠেছিল এই অসাম্যের তাড়নায়।  সেদিন সেখানকার পীড়িতেরা বুঝেছিল এই অসাম্যের অপমান ও দুঃখ চিরসঙ্গী। তাই সেদিনকার বিপ্লবের সাম্য ও সৌভ্রাত্র ও স্বাতন্ত্র্যের বাণী স্বদেশের গণ্ড পেড়িয়ে ধ্বনিত হয়েছিল। কিন্তু টিকল না। এদের এখানকার বিপ্লবের বাণীও বিশ্বব্যাপী। আজ পৃথিবীতে অন্তত এই একটা দেশের লোক স্বজাতীর স্বার্থের উপরেও সমস্ত মানুষের স্বার্থের কথা চিন্তা করছে। এ বাণী চিরদিন টিকবে কি না কেউ বলতে পারে না। কিন্তু স্বজাতির সমস্যা সমস্ত মানুষের সমস্যার অন্তর্গত, এই কথাটা বর্তমান যুগের অন্তর্নিহিত কথা।  একে স্বীকার করতেই হবে। ... পৃথিবীতে যেখানে সবচেয়ে বড়ো ঐতিহাসিক যজ্ঞের অনুষ্ঠান সেখানে নিমন্ত্রণ পেয়েও না যাওয়া আমার পক্ষে অমার্জনীয় হত। ...মনে মনে ভাবছিলুম,  ধনশক্তিতে দুর্জয় পাশ্চাত্য সভ্যতার প্রাঙ্গণে-দ্বারে ঐ রাশিয়া নির্ধনের শক্তি সাধনার আসন পেতেছে, সমস্ত পশ্চিম মহাদেশের ভ্রুকুটিকুটিল কটাক্ষকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে, এটা দেখবার জন্য আমি যাব না তো কে যাবে? ...আমরাতো জগতের নিঃসহায়দের দলের।’

 প্রশান্তচন্দ্র মহালনবিশকে অন্য এক চিঠিতে (৪র্থ চিঠি) রবীন্দ্রনাথ লিখলেন –‘...কিন্তু এবারে রাশিয়া থেকে ঘুরে এসে সেই সৌন্দর্যের ছবি আমার মন থেকে  মুছে গেছে। কেবলই ভাবছি আমাদের দেশ-জোড়া চাষীদের দুঃখের কথা। আমার যৌবনের আরম্ভকাল থেকেই বাংলাদেশের পল্লীগ্রামের সঙ্গে আমার নিকট পরিচয় হয়েছে। তখন চাষীদের সঙ্গে আমার প্রত্যহ ছিল  দেখাশোনা - এদের সব নালিশ উঠেছে আমার কানে। আমি জানি ওদের মত নিঃসহায় জীবন অল্পই আছে, ওরা সমাজের যে তলায় তলিয়ে সেখানে জ্ঞানের আলো অল্পই পৌঁছয়, প্রাণের হাওয়া বয় না বললেই হয়।’


১৮৯০ সালে রবীন্দ্রনাথ শিলাইদহে জমিদারির ভার গ্রহণ করে পূর্ববাংলায় এলেন। যুবক রবীন্দ্রনাথের হঠাৎ এতবড় দায়িত্ব এবং ক্ষমতার হঠাৎপ্রাপ্তি স্বভাবতই বিপদজনক ছিল। হঠাৎ ক্ষমতার তাপ মানুষের স্বভাব এবং চরিত্র কলুষিত করে দেয়। রবীন্দ্রনাথ হতে পারতেন একজন অত্যাচারী জমিদার।  কিন্তু প্রথম দিনই তিনি ঘোষণা দিলেন পূর্বতন সমস্ত প্রথা এবং সংস্কার ভেঙে সেদিন থেকে দরবারে  হিন্দু মুসলমান সকল প্রজার এক আসনের।

উল্লেখ্য যে, পুর্ব প্রথা ছিল হিন্দু প্রজারা বসবে জাজিমের উপর আর মুসলমান প্রজারা বসবে জাজিমের নিচে। এই অসাম্য কবির কাছে কদর্য ঠেকেছিল। কবির এই প্রথাবিরোধী সিদ্ধান্তে হিন্দু কর্মচারীরা বিদ্রোহী হয়ে ওঠে। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ নিজেইতো মহাদ্রোহী, তিনি কেনো অন্যায় দ্রোহের কাছে হার মানবেন? তাঁর জমিদারিতে হিন্দু মুসলমান সকল প্রজা এক আসনেই বসেছেন। জমিদারির পুরোটাকাল শিলাইদহ, সাজাদপুর, পতিসর সকল জায়গায় থেকেছেন নিঃস্ব, দরিদ্র, জীর্ণ কৃষকদের পাশে। 

ছিন্নপত্রালীর একচিঠিতে ইন্দিরা দেবীকে লিখেছেন, একবার এক কৃষক তাঁকে একটা টাকা নিতে বলেছিলেন। কবি নিতে দ্বিধা করেছিলেন, তখন কৃষক বলেছিলেন, ‘নে, আমরা না দিলে তুই খাবি কী?’। কবি সেই কথা নির্দ্বিধায় স্বীকার করে লিখেছেন, এটাতো সত্যিসত্যিই যে তারা না দিলে কবি খাবেন কী?

জমিদারি গ্রহণের ৫ বছর অতিক্রমকালে রবীন্দ্রনাথ নিজেই জমিদারি সত্ত্বার বিরুদ্ধে দাঁড়ালেন। জমিদার ও রাজাকে বললেন চোর। ১৮৯৫ সালে কবি লিখলেন ‘দুই বিঘা জমি’ কবিতা। উপেনের ভিটে গ্রাস করতে চায় ভূস্বামী জমিদার। শেষাবধি উপেনকে ভিটে ছাড়তে হয়। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ কবিতায় দাঁড়ালেন নিজের বিরুদ্ধে, ভূস্বামীর বিরুদ্ধে। প্রকারন্তরে উপেনকে দিয়ে সাধুবেশী ভূস্বামী জমিদারদের লোভের মুখোশ উন্মোচন করে দিলেন।

রবীন্দ্রনাথের সাম্যবাদী চিন্তা আরও গভীরতর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে জমিদারির প্রতি তাঁর অশ্রদ্ধা বাড়তে থাকে। ‘দুই বিঘা জমি’ লেখার প্রায় দুই দশক পর সংঘটিত হয় রুশ বিপ্লব। সাম্যবাদী চিন্তা এবং আন্দোলন ইউরোপ এবং ভারতবর্ষসহ পৃথিবীর সকল মহাদেশে এক মহা তোলপাড় সৃষ্টি করে মানুষের চিন্তা এবং ব্যবহারে। রবীন্দ্রনাথ এই সময়ে ইউরোপসহ নানাদেশ বহুবার ভ্রমণ করেন। সমস্ত পৃথিবীর নানা ঘটনা এবং চিন্তাপ্রবাহ গভীরভাব পর্যবেক্ষণ করছিলেন। এমনকি রুশ বিপ্লব সংঘটিত হবার আগেই ১৯১৬ সালে  প্রথম মহাযুদ্ধ চলাকালীন রবীন্দ্রনাথ জাপান ভ্রমণকালে টোকিওতে যে প্রবন্ধ পাঠ করলেন, তা রুশ বিপ্লব এবং মার্কসবাদী - লেনিনবাদী চিন্তারও অগ্রগামী বলে আমাদের কাছে যেন প্রতীয়মান হয়। 

টোকিওতে পঠিত প্রবন্ধটি ছিল ‘ন্যাশনালিজম ইন জাপান’। এতে রবীন্দ্রনাথ জাতীয়তাবাদ এবং ধনবাদের ধ্বংসাত্মক, অমানবিক, লোভাতুর আগ্রাসনের বিরুদ্ধে তীব্র শ্লেষ এবং ঘৃণা প্রকাশ করেন। ফলস্বরূপ জাপান ভ্রমণ শেষে তাকে অনাদরে জাপান ত্যাগ করতে হয়। কারণ, তাঁর সে বক্তৃতা তখনকার উগ্রবাদী যুদ্ধবাজ জাপান গ্রহণ করতে পারেনি। সমকালীন আরও দু’টো প্রবন্ধ ‘ন্যাশনালিজম ইন ইন্ডিয়া’ এবং ‘ন্যাশনালিজম ইন দ্যা ওয়েস্ট’। এই প্রবন্ধ গুলোর বক্তব্যও যুদ্ধবাজ জাতীয়তাবাদ, সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন এবং পুঁজিবাদের নির্মম লুণ্ঠনের বিরুদ্ধে। উপরিউক্ত তিনটি প্রবন্ধের সমন্বয়ে যে গ্রন্থ প্রকাশিত হয় সেটার শিরোনাম ‘ন্যাশনালিজম’। ন্যাশনালিজম গ্রন্থটিকে রবীন্দ্রনাথের সাম্রাজ্যবাদবিরোধী চিন্তার একটা আকর গ্রন্থ বলা হয়, যা ১৯১৬ সালে প্রকাশিত হয়, রুশ বিপ্লবের একবছর আগে। 

রবীন্দ্রনাথের সাম্যবাদী চিন্তার আলোচনা এলে আরও একটি প্রবন্ধের কথা উল্লেখযোগ্য। সেটা হলো ১৯২৬ সালে লিখিত, ‘রায়তের কথা’ প্রবন্ধ। মূলত জমিদারিত্বের সমালোচনা করে প্রমথ চৌধুরীর ‘রায়তের কথা’ প্রবন্ধের প্রতিউত্তরেই একটি লেখা। সেখানে কবি স্পষ্টত প্রজার পক্ষাবলম্বন করেছেন। সেখানে বললেন জমিদার জমির জোঁক, প্যারাসাইট। সেই পেশার প্রতি রবীন্দ্রনাথের মোটেই শ্রদ্ধা নেই। এ পেশা তিনি ছেড়ে দিতে চান। কবি বলছেন, প্রজারা তাকে যে রাজা বলে চেনে কবি তা মেনে নিতে রাজি নয়। তিনি বললেন তিনি কিসের রাজা? তিনি তো ব্রিটিশ রাজ সরকারের গোমস্তা মাত্র। এইভাবে কবির মনে সাম্যবাদী ধারণা দৃঢ় এবং স্থায়ী হতে থাকে। সাম্যবাদী চিন্তার বিকাশের একটি পর্যায়ে বিশেষ করে রাশিয়া ভ্রমণের পরে পল্লীর উন্নয়নের জন্য সমবায় নীতির একজন প্রবক্তা হয়ে দাঁড়ান রবীন্দ্রনাথ।

সমবায় নীতি সাম্যবাদী অর্থনীতির অন্যতম প্রধান নীতি। জীবন সায়াহ্নে এসে এই নীতির পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়েছিলেন বন্ধু এলমহার্স্ট কে সঙ্গে নিয়ে সুরুলে শ্রীনিকেতনে। বলতে গেলে শ্রীনিকেতই হলো রবীন্দ্রনাথের সাম্যবাদী কৃষি অর্থনীতির পরীক্ষাগার। শ্রীনিকেতনে নানা সময়ে রবীন্দ্রনাথের ভাষণে সমবায় নিয়ে স্পষ্ট ধারণা পাই। সেসব বক্তৃতায় তিনি বারবার বলেছেন পূর্ব বঙ্গে জমিদারি সময় দেখা পল্লিবাসীর নিদারুন দারিদ্র্য, অভাব, অন্নের দৈন্য, অশিক্ষার জড়তাপ্রাপ্ত তাদের সমস্ত মন। শ্রীনিকেতনে সেই সব হতভাগাদের মুক্তির জন্যই রবীন্দ্রনাথের শেষ জীবনের অন্যতম সাধনা।

১৯৪০ সালে শ্রীনিকেতনে রবীন্দ্রনাথ এক ভাষণে বললেন, আমরা যদি সেইসব হতভাগ্যদের বঞ্চিত করি তাহলে সেইখানে আমাদের ঋণই জমে না সাথে শাস্তিও জমে ওঠে। অসাম্যের বিরুদ্ধে রবীন্দ্রনাথের এই দ্রোহ বজায় ছিল আমৃত্যু।

আরও পড়ুন

×