রবীন্দ্রনাথকে
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
ফারজানা অনন্যা
প্রকাশ: ০৭ আগস্ট ২০২৬ | ১৬:২৭ | আপডেট: ০৮ আগস্ট ২০২৬ | ২২:১৮
শ্রাবণের সন্ধ্যার একটি নিজস্ব বিষাদ আছে। সে বিষাদ নারীর বহুদিনের চেপে রাখা দীর্ঘশ্বাসের মতো। ঘরের কোণে জমা পুরোনো কাঠের গায়ে বা ভাঙা জানালার কাচে জন্মানো শ্যাওলার মতো। সেইরকম এক সন্ধ্যায়, কলকাতার জোড়াসাঁকোর অদূরে কুমোরটুলির সরু গলিতে দাঁড়িয়ে থাকা আধপাকা টিনের চালার বাড়িটিকে দূর থেকে দেখে আমার মনে হচ্ছিল, সময় যেন তাকে ভুলে গেছে, অথচ বিস্মৃতি পারেনি। কার্নিশে বটের শেকড় ঝুলছে বৃদ্ধের শুভ্র দাড়ির মতো। দেয়ালের চুন উঠে গিয়ে তৈরি করেছে অসংখ্য অনামা মানচিত্র। যেন পৃথিবীর নয়, স্মৃতির ভূগোল।
এই বাড়িরই শেষ উত্তরাধিকারী আমি, অনুরাধা ঘোষ। বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা পড়াই। ঠাকুমা বিন্দুবাসিনীর মৃত্যুর পঁয়তাল্লিশ বছর পরে এই প্রথম আমি একা এসেছি বাড়িটিতে। বাড়িটি বিক্রি হয়ে যাবে কয়েক দিনের মধ্যেই। দালালরা বলেছে, ভাঙা বাড়ির তেমন দাম নেই, জমিটারই যা একটু দাম। মানুষও কি শেষ পর্যন্ত জমির মতোই? শরীরের দাম থাকে, স্মৃতির থাকে না? সারা বিকেল আমি পুরোনো বাক্স, আলমারি, পেতলের বাসন, বিবর্ণ ছবি গোছালাম। সন্ধ্যা নামতেই বাড়িটা যেন অন্যরকম হয়ে উঠল। অন্ধকার কখনও কখনও কেবল আলোর অনুপস্থিতি নয়। কখনও সে অতীতের উপস্থিতিও।
দোতলার কোণের ঘরে ঢুকতেই আমার চোখে পড়ল কাঠের সিন্দুকটি। পিতলের তালায় মরচে ধরেছে, কাঠে ফাটল। তবু দেখে মনে হলো কোনো বৃদ্ধা এখনও দু’হাত দিয়ে আগলে বসে আছেন নিজের শেষ গোপন কথাটি। পাশে রাখা কৌটোর চাবি ঘোরাতেই তালা খুলল। ডালা খুলতেই ভেসে এলো এক বিষণ্ন সুবাস। শুকিয়ে থাকা শিউলির সঙ্গে মিশে থাকা মানুষের অব্যক্ত কান্নার গন্ধ। ভেতরে রাখা লাল সিল্কে মোড়ানো সাতাশটি চিঠি। প্রতিটির ওপরে একই সম্বোধন, “শ্রীচরণেষু, রবীন্দ্রনাথকে।” কোনো ঠিকানা নেই, কোনো ডাকটিকিট নেই। মনে হলো, চিঠিগুলি পৃথিবীতে পাঠানোর জন্য লেখা হয়নি, বরং হৃদয়ের এমন এক দরজায় রাখা, যার চাবি কেবল সময়ের হাতে।
আমি প্রথম চিঠিটি খুললাম। কাগজে সময়ের হলুদ রং, কালি ফ্যাকাশে। অথচ অক্ষরগুলো আশ্চর্যভাবে জীবন্ত। “আজ আমার বয়স তেরো পূর্ণ হলো। আজই আমার বৈধব্যেরও প্রথম পূর্ণবর্ষ। আমার কপাল থেকে সিঁদুর মুছে দেওয়ার দিন সবাই বলেছিল, বিন্দু তোর জীবনের অনেকটাই শেষ। অথচ শেষ যদি তা-ই হয়, তবে জীবন এত দীর্ঘ কেন?”
আমি থমকে গেলাম। এইটুকু বাক্যেই যেন ঠাকুমার এক জীবনের সমস্ত ভার লুকানো। আমি ধীরে ধীরে পড়তে লাগলাম। বিন্দুবাসিনী লিখেছেন, এক পুত্রসন্তানকে বুকে চেপে বৈধব্যের বেশে বাপের বাড়িতে ফিরে এসে কীভাবে তিনি যাপন করছিলেন এক মানবেতর জীবন। এই চরম দুর্দিনে রবীন্দ্রনাথের ‘যোগাযোগ’ উপন্যাসটি হাতে পান। বইটি তাঁর নিজের ছিল না। পাশের বাড়ির বিধবা ক্ষেন্তির থেকে বইটি ধার নিয়ে তিনি রাতের পর রাত প্রদীপের আলোয় পড়েছেন।
“আপনার উপন্যাসে কুমুদিনীর দেখা পেয়ে মনে হলো, আমার ভেতরে যে মেয়েটি এতদিন কথা বলতে পারেনি, সে আসলে বোবা ছিল না। কেবল তাকে কেউ ভাষা শেখায়নি।”
আমার বুকের মধ্যে অদ্ভুত কাঁপুনি উঠল। ঘরের বাতিটিও একবার কেঁপে উঠল, যদিও জানালা বন্ধ, বাতাস নেই। নিজের মনকে বোঝালাম, পুরোনো বাড়ি, ফাঁকফোকর দিয়ে বাতাসের অবাধ চলাচলে এমন একটু আধটু হতেই পারে। তবু মনে হতে লাগল, কেউ যেন আমার সঙ্গে সঙ্গে চিঠিগুলি মন দিয়ে পড়ছে।
দ্বিতীয়, তৃতীয়, চতুর্থ চিঠি...
একেকটি চিঠি যেন একেকটা নদী, নাটকীয়তাহীন, অথচ প্রতিটি পঙ্ক্তির নিচে অদৃশ্য প্লাবন। এক জায়গায় বিন্দুবাসিনী লিখেছেন, “আপনার ‘নষ্টনীড়’ গল্পের চারুলতা চরিত্র পাঠ শেষে আমার মনে হয়েছিল, জানালার ধারে বসে যে মেয়েটি দূরের দূরবীনে পৃথিবী দেখে, সে শুধু ভূপতির বাড়িতেই ছিল না। আমাদের প্রত্যেকের ঘরেই তার একটু করে বাস ছিল, আছে কিংবা থেকে যাবে...”
আরও একটি চিঠিতে,
“‘স্ত্রীর পত্র’ গল্পে মৃণালের লেখা চিঠিতে ‘তোমাদের চরণতলাশ্রয়চ্ছিন্ন মৃণাল’ বাক্যটি পড়ে বেশ কাঁদলাম। কারণ আমি মৃণালের মতো সমাজ-সংসারের চাপিয়ে দেওয়া বোঝা ছিন্ন করতে পারিনি, মুক্তও হতে পারিনি। আমার যাওয়ার কোনো জায়গা ছিল না, সাহসও ছিল না।”
বুঝলাম, এই স্বীকারোক্তির ভেতরেই লুকিয়ে ঠাকুমার একলা লড়াই, অপয়া তকমা, ঘরের কোণে ঠাঁই পাওয়া এক মেয়ে, যার সঙ্গী কেবল ধার করা বই।
আমি দীর্ঘক্ষণ চুপ করে রইলাম। মনে হতে লাগল রবীন্দ্রনাথের নারীরা যেন হঠাৎ বইয়ের পাতা ছেড়ে এই ঘরে উঠে এসেছে। মৃণাল, অনিলা, চারুলতা, চন্দরা, কল্যাণী, নিরুপমা, কুমুদিনী, বিমলা, লাবণ্য, বিনোদিনী কিংবা চিত্রাঙ্গদা। প্রত্যেকের চোখে একই প্রশ্ন, নারীর জীবনে ঘর কোথায়? যে ঘরে সে থাকে, নাকি যে ঘরে সে নিজের ভাষা খুঁজে পায়? বিন্দুবাসিনী লিখেছেন, “আপনি কি জানেন, কবিবর, আপনার লেখা পড়ে আমরা অনেকেই বাঁচিনি। কিন্তু মরতেও পারিনি। আপনি আমাদের এমন এক আয়না দিয়েছেন, যেখানে নিজের মুখ একবার দেখে ফেললে আর আগের মতো অন্ধ থাকা যায় না।”
রাত বাড়ছিল। দূরে কোথাও ঘণ্টা বাজল। হঠাৎ আমার মনে হলো, ঘরে সে একা নেই। মুখ তুলে তাকালাম, কেউ নেই। কিন্তু দেয়ালে টাঙানো পুরোনো আয়নায় এক মুহূর্তের জন্য যেন আর একটি অবয়ব ভেসে উঠল। শুভ্র, অস্পষ্ট, মুখ দেখা যায় না।
শুধু মনে হলো, তিনি যেন জানালার বাইরে তাকিয়ে আছেন। পরমুহূর্তেই আয়নায় আবার কেবল নিজের প্রতিচ্ছবি।
সেই রাতে আর নিচে নামলাম না।
বাড়ির চারদিকে তখন এমন এক নৈঃশব্দ্য নেমে এসেছে, যেন শব্দেরও ক্লান্তি আছে। দূরে কোথাও ট্রামের ঘণ্টা বাজল। তারপর সেটিও মিলিয়ে গেল অদৃশ্য সময়ের সুড়ঙ্গে। জানালার ফাঁক গলে শ্রাবণের আর্দ্র বাতাস ঢুকছিল, কিন্তু সেই বাতাসে নদীর গন্ধ ছিল না। ছিল পুরোনো কাগজের, পুরোনো শোকের, আর বহুদিন ধরে উচ্চারিত না হওয়া কিছু নামের গন্ধ।
দ্বিতীয় গুচ্ছের চিঠিগুলো খুললাম। প্রথম চিঠির ওপর লেখা–
“১৩ বৈশাখ, ১৩৩৯”
বিন্দুবাসিনীর অক্ষর আগের মতোই শান্ত। কিন্তু শান্ত জল যেমন গভীরে স্রোত লুকিয়ে রাখে, তেমনি এই অক্ষরের নিচে ছিল অগণিত অনুচ্চারিত ঢেউ।
“কবিবর,
আজ আপনাকে পড়তে পড়তে হঠাৎ মনে হলো, আপনি নারীদের লেখেন না। আপনি তাদের নীরবতার ব্যাকরণ খুঁজে বের করেন। পুরুষেরা আমাদের মুখ দেখে, সংসার দেখে, কর্তব্য দেখে। আপনি বুঝি শুনেছিলেন আমাদের বুকের ভেতরের সেই অদৃশ্য পাখিটার ডানার শব্দ, যাকে আমরা নিজেরাও ঠিকমতো উড়তে দেইনি।”
বাক্যটি দুবার পড়লাম। “নীরবতার ব্যাকরণ।”
কী আশ্চর্য শব্দবন্ধ। নিজের খাতায় লিখে রাখলাম। তারপর আর একটি চিঠি খুলতেই চোখ আটকে গেল একটি অনুচ্ছেদে,
“মৃণালকে পড়ে মনে হয়েছিল সে একা নয়। অনিলা তার পাশে বসে আছে, বিমলা জানালার ওপারে দাঁড়িয়ে, কুমু দূরে প্রদীপ জ্বালছে। তাদের কারও জীবনের রং এক নয়, অথচ প্রত্যেকেই যেন একই নদীর ভিন্ন ভিন্ন ঘাট। একজনের জল হাসিতে নীল, আরেকজনের জল অপমানে কালো, তৃতীয়জনের জল আত্মসম্মানে দীপ্ত।”
উপলব্ধি করলাম বিন্দুবাসিনী শুধু রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যই পড়েননি। বরং চরিত্রগুলোর সঙ্গে বাসও করতেন।
কাগজের মানুষের সঙ্গ কখনও কখনও রক্তমাংসের মানুষের চেয়েও দীর্ঘজীবী হয়। কারণ তারা কেবল বেঁচে থাকে না, অন্যের জীবনকেও প্রেরণায় বাঁচিয়ে রাখে।
আমার চোখ বারবার ভিজে উঠছিল। হয়তো প্রত্যেক নারীর উত্তরাধিকারে কিছু কান্না থাকে, যা রক্তের সঙ্গে বয়ে আসে। হয়তো ভাষাও বংশানুক্রমিক, হয়তো ক্ষতও। চোখ মুছে আবার পড়তে লাগলাম। মনে হলো বিশ্ববিদ্যালয়ের নারী সহকর্মী, নারী শিক্ষার্থীদের কথা। তাদের চোখে এখনও কত অনুচ্চারিত ক্লান্তি। কেউ সংসারের বিরুদ্ধে লড়ছে, কেউ সমাজের বিরুদ্ধে, কেউ নিজের শরীরের বিরুদ্ধে, কেউ নিজের স্বপ্নের পক্ষে দাঁড়াতে গিয়ে একা হয়ে যাচ্ছে। শত বছর পেরিয়েও প্রশ্নগুলো বদলায়নি। শুধু পোশাক বদলেছে। মুঠোফোন এসেছে। সামাজিক মাধ্যম এসেছে। কিন্তু পুরুষতান্ত্রিক সমাজের অদৃশ্য খাঁচার কারিগররা যেন এখনও একই রয়ে গেছে। হঠাৎ আমার স্মরণে এলো নিজের এক ছাত্রীর কথা। মেয়েটি একদিন ক্লাস শেষে বলেছিল, “ম্যাম, আমি বাংলা সাহিত্য পড়ি। কিন্তু বাড়িতে সবাই বলে, মেয়েদের এত পড়াশোনা করে কী হবে? শেষ পর্যন্ত তো সংসারই করতে হবে।” মেয়েটিকে সেদিন নিজের মতো করে উত্তর দিয়েছিলাম। বলেছিলাম ভার্জিনিয়া উলফ আর মেরি ওলস্টোনক্রাফটের কথা।
অথচ আমার নিজের ঠাকুমাই বহু বছর আগেই খুঁজে পেয়েছিলেন নারীর অধিকার আর মনস্তত্ত্বের এক গভীর তলদেশ। এই বঙ্গদেশে কত ঘরে নিভৃতে কত ভার্জিনিয়া, কত মেরি জন্মেছে, আবার ঝরে গিয়েছে বকুল ফুলের মতো, তার হিসেব কে’ই বা রেখেছে।
আবার পড়তে শুরু করলাম। এ চিঠিতে বিন্দুবাসিনী লিখেছেন, “আজ সারাদিন ভাবলাম, আপনার ‘চণ্ডালিকা’র প্রকৃতি যদি আমার উঠোনে এসে বসত, আমরা কত কথা বলতাম! সে বলত, ‘আমাকে মানুষ বলো।’ আমি বলতাম, ‘আমাকে মানুষ হতে শেখাও।’”
তারপরই আরেকটি লাইন,
“আমরা নারীরা বুঝি জন্মাই দুইবার। একবার মায়ের গর্ভ থেকে, আর একবার নিজের অপমানের ভেতর দিয়ে।”
বাইরে বিদ্যুৎ চমকালো, কিন্তু মেঘের গর্জন শোনা গেল না। মনে হলো, আকাশও যেন কথা না বলে কেবল আলো দিয়ে স্মৃতিচারণ করছে। রাত আরও গভীর হয়ে এলো। উনিশ নম্বর চিঠিটি খুললাম।
“স্বপ্নে দেখলাম, শান্তিনিকেতনের ছাতিমতলায় সন্ধ্যা নেমেছে। অথচ সেই সন্ধ্যায় ছাত্রদের গান নেই। আছে কেবল নারীদের পায়ের শব্দ। তারা আসছে...কেউ বিধবা, কেউ পরিত্যক্তা, কেউ অবিবাহিতা। কেউবা সংসারের ভেতর থেকেও নির্বাসিতা। প্রত্যেকের হাতে একখানি সাদা পৃষ্ঠা। আশ্চর্য, কারও পাতায় কোনো শব্দ নেই। তখন আপনি বললেন, ‘শব্দ তোমাদের ছিল, ভাষাও তোমাদের ছিল শুধু কলমটি অন্যেরা ধরে রেখেছিল, তাই বলতে কিংবা লিখতে পারলে না মেয়েরা?’”
এইটুকু পড়ে আমার সমস্ত হৃদয় বিষণ্নতায় ছেয়ে গেল। চিঠির নিচে কালি ছড়িয়ে গেছে। হয়তো লেখার সময় বিন্দুবাসিনীর চোখের জল পড়েছিল।
আর ঠিক তখনই ঘরের এক কোণ থেকে ক্ষীণ শব্দ এলো। টুপ! টুপ! টুপ! কোথাও জল পড়ার শব্দ। আমি হারিকেন হাতে একটু এগিয়ে গেলাম। কোথাও জল নেই।
কিন্তু দেয়ালের ওপর আলোর রেখা এমনভাবে নড়ছিল, যেন এক সারি নারী ধীরে ধীরে হেঁটে যাচ্ছে। কেউ কারও দিকে তাকাচ্ছে না, কেউ কথা বলছে না। শুধু এগিয়ে চলছে। আলো সরতেই দেয়াল আবার ফাঁকা। আমার চোখের পাতা বুজে এলো। নিজেকে বললাম, “ক্লান্তি। এ শুধুই ক্লান্তি। কর্ণ আর দৃষ্টির ভ্রম।”
আকস্মিকভাবে আমার বুকের মধ্যে এক অদ্ভুত শান্ত শূন্যতা জন্মেছিল, যার কোনো ভাষা ছিল না।
তারপর হঠাৎ মুষলধারে বৃষ্টি নামল। টিনের চালে ফোঁটার আওয়াজে মনে হলো, শতবর্ষ ধরে না পাঠানো চিঠিগুলোর ওপর আকাশ নিজেই ডাকটিকিট এঁটে দিচ্ছে। শেষ গুচ্ছের আটটি চিঠির নিচে চাপা পড়েছিল একটি অচেনা খাম। হলুদ নয়, ফ্যাকাশে শুভ্র, যেমন বহু কান্নার পরে চোখের সাদা অংশ স্বচ্ছ হয়ে ওঠে। খামের গায়ে কোনো সম্বোধন নেই, শুধু একটি নাম– “অনুরাধা।”
আমার হাত কেঁপে উঠল। আমার চিঠিটির গায়ে আমার নিজের নাম, যা লেখা হয়েছিল আমি জন্মানোরও আগে। ধীরে খাম ছিঁড়লাম। ভেতরের অক্ষর বিন্দুবাসিনীরই, কিন্তু অনেক বেশি কম্পিত।
“আমার অনাগত নাতনি, অনুরাধা। আমি তোমার মায়ের কাছে তোমার এই নাম রেখে গেলাম। জানি না, আমাদের দেখা হবে কিনা। এও জানি না তুমি সত্যিই আসবে কিনা, বাঁচতে পারবে কিনা এই রূঢ় হিংস্র জগতে। তবু লিখে রাখছি। আমার জীবনে যা ঘটেছে, তা কাউকে বলতে পারিনি। কেবল এইটুকু জেনো, তেরো বছরে স্বামীহারা হয়ে যে মেয়েটি বাপের বাড়িতে ফিরেছিল, প্রতিটি সকালই তাকে প্রমাণ করতে হতো, সে বোঝা নয়। রাতে লুকিয়ে পড়া বই, আর কবির কাছে লেখা এই না-পাঠানো চিঠিগুলিই ছিল আমার একমাত্র স্বাধীনতা। যদি কখনও তোমার নিজের ভাষা কেউ কেড়ে নিতে চায়, মনে রেখো আমি পারিনি বলেই তোমাকে পারতে হবে। আমার নীরবতাকে তুমি তোমার উচ্চারণ বানিয়ে নিও।”
আমি কাগজ বুকে চেপে ধরলাম। এই একটুকরো কাগজ যেন আমার আর ঠাকুমার মধ্যেকার সমস্ত না-বলা কথার সেতু হয়ে দাঁড়াল, এক নারীর হাতে অন্য নারীর হাত রাখার মতো। মনে পড়ল বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই সহকর্মীর কথা, যিনি একদিন বলেছিলেন, “মেয়েরা অত সিরিয়াস সাহিত্য লিখতে পারে না। অনুভূতি আছে, নির্মাণ নেই।” সেদিন আমি প্রতিবাদ করিনি।
আজ বুঝলাম, প্রতিবাদ না করাও একধরনের ব্যর্থ উত্তরাধিকার, এক প্রতিবাদহীনতার ধারা, যা ভাঙতে না পারলে পরের প্রজন্মও একই ভার বহন করে। বিন্দুবাসিনী বুঝি তাই চিঠি লিখেছিলেন, রবীন্দ্রনাথকে নয়, বরং সময়ের দাবির কাছে।
পরের চিঠিগুলোয় বিন্দুবাসিনী আর নিজের কথা তেমন লেখেননি।
লিখেছেন তার দেখা নারীদের কথা। নারী হয়ে জন্মানোয় আজন্ম দুঃখের কথা।
প্রতিটি গল্পের শেষে বিন্দুবাসিনী লিখেছেন,
“আজ আপনাকে এদের কথা বললাম। কারণ আপনি কেবল আপনার নায়িকাদেরই নির্মাণ করেননি। বরং আমাদের কথাও লিখেছিলেন, লিখেছেন সমগ্র বঙ্গনারীর অন্তর্গত বেদনার কথা।” আমার মনে হলো বিন্দুবাসিনীর কাছে রবীন্দ্রনাথ কোনো ব্যক্তি নন। বরং একটি শ্রবণশক্তি। যেখানে নারীরা প্রথম নিজেদের কণ্ঠস্বর শুনেছিল। হয়তো সম্পূর্ণ নয়, হয়তো আংশিক। রবীন্দ্রনাথ হয়তো ‘চোখের বালি’র বিনোদিনীকে তীর্থে পাঠিয়েছিলেন ঠিকই, তবে ঊনবিংশ শতাব্দীর এক বিধবা নারীর অবস্থান আর অনুভূতিকে অবমূল্যায়ন করেননি। কিছুটা হলেও এ যে নারীর প্রথম মুক্তি, প্রথম মর্যাদার প্রতিষ্ঠা।
রাত গড়িয়ে ভোরের কাছাকাছি এলো। হঠাৎ বাড়ির ভেতর দিয়ে যেন কারও খালি পায়ে হাঁটার শব্দ এলো, সিঁড়ির দিক থেকে। হারিকেন হাতে বেরিয়ে এলাম। সিঁড়িতে কেউ নেই, তবু প্রতিটি ধাপ যেন অদৃশ্য পায়ের ভারে অল্প কেঁপে উঠছে। একতলায় নেমে থমকে দাঁড়ালাম! সিন্দুকটি খোলা, যদিও আমি নিজেই বন্ধ করেছিলাম। লাল রেশমি কাপড় মেঝেতে নেমে এসেছে, তার ওপর পড়ে আছে শুকনো টগর ফুল, যার একটি পাপড়িতে অদ্ভুত সাদা আভা, যেন সদ্য ফোটা শিশিরে স্নাত। ফুলটি হাতে তুলতেই দূর থেকে কেউ যেন ফিসফিস করে বলে গেল, “লেখো।” চারদিকে তাকিয়েও কাউকে দেখলাম না। চারপাশে কেবল ভোরের আগের গভীরতম নীরবতা জমাট বেঁধে আছে।
সাহিত্যের কাজ উত্তর দেওয়া নয়, মানুষের অন্তরে প্রশ্ন জাগিয়ে দেওয়া। হয়তো এই জন্যই রবীন্দ্রনাথের নারীচরিত্ররা আজও শেষ হয়ে যায় না। মৃণাল, চন্দরা, নিরুপমা, কল্যাণী, লাবণ্য, কুমু, বিনোদিনী, বিমলা, চিত্রাঙ্গদা। যারা নায়িকা হয়ে থেকেও আজও অসংখ্য নামহীন বাঙালি নারীর হয়ে কথা বলে যায়, তাদের সংকট, তাদের সাহস ধার দিয়ে যায়। রবীন্দ্রনাথ তাদের সৃষ্টি করেননি, তিনি কেবল তাদের ভেতরে লুকিয়ে থাকা ভাষার দরজা খুলে দিয়েছিলেন। বাকিটা তারা নিজেরাই লিখেছেন।
পূর্ব আকাশে তখন একটু একটু করে আলো ফুটতে শুরু করেছে। বর্ষার মেঘের আড়াল ভেদ করে সূর্যের প্রথম আভা উঠছে। ঠিক সেই সময়ে দূরের কোনো বাড়ি থেকে ভেসে এলো রবীন্দ্রসংগীতের ক্ষীণ সুর,
“আছে দুঃখ, আছে মৃত্যু...”
সুরটি বাতাসে ভাসতে ভাসতে যেন এই পুরোনো বাড়ির প্রতিটি দেয়াল ছুঁয়ে গেল। হঠাৎ আমার চোখজোড়া বুজে এলো। মনে হলো, মানুষ চলে যায়, কণ্ঠ থেমে যায়, প্রদীপ নিভে যায়। কিন্তু কিছু কিছু ভাষা মৃত্যুকে আপন করে নিয়ে তবেই দীর্ঘজীবী হয়।
আর ঠিক তখনই আমার মনে পড়ল, আজ ২১ শ্রাবণ।
আর কয়েক ঘণ্টা পরেই শুরু হবে ২২ শ্রাবণ।
আমি দাঁড়িয়ে আছি এমন এক সময়ে যেখানে অন্ধকার আর আলো একে অন্যের হাত ছুঁয়ে দাঁড়িয়ে থাকে, যেন বিদায় ও আগমনের মাঝখানে একটি দীর্ঘ, নীরব প্রণাম। সাতাশতম চিঠিটি এখনও পড়া বাকি। চিঠিটি হাতে নিলাম। অদ্ভুতভাবে খামটির কাগজ অন্যগুলোর তুলনায় বেশি ক্ষয়প্রাপ্ত। মনে হলো, এই একটি চিঠিই যেন সবচেয়ে বেশি সময়ের ভেতর দিয়ে হেঁটেছে।
তারিখ: ২১ শ্রাবণ, ১৩৪৮
“শ্রীচরণেষু,
রবীন্দ্রনাথকে।
গতরাতে একটি আশ্চর্য স্বপ্ন দেখেছি।
আপনি হাঁটছিলেন। কোথায়, তা বলতে পারব না। সে স্থান পৃথিবীরও নয়, স্বপ্নেরও নয়। চারদিকে কেবল সাদা কাশফুল দুলছিল, অথচ এখন তো শ্রাবণ মাস। আপনি একবারও ফিরে তাকালেন না। শুধু হেঁটে চললেন।
আমি অনেক দূর থেকে ডাকতে চাইলাম।
পারলাম না। আমার কণ্ঠ থেকে শব্দ বেরোল না। তখন আপনি নিজেই থেমে বললেন, ‘যে কথা বলা যায় না, তাকে লিখে রেখো। মানুষের শরীরের আয়ু কম। তবে ভাষার আয়ু দীর্ঘ।’ তারপর আপনি হেঁটে হেঁটে চলে গেলেন কুয়াশার ভেতর। আর আমি জেগে উঠলাম।”
চিঠির নিচে আরও লেখা ছিল, তবে স্পষ্ট বোঝা যায় না, কলম কেঁপে গেছে। অক্ষরগুলো যেন নদীর জলে ভেঙে পড়া চাঁদের প্রতিবিম্ব।
“আজ সারাদিন আমার মনে হচ্ছে, পৃথিবী যেন কাউকে বিদায় জানানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। অথচ বিদায় কি সত্যিই মানুষের? চলে যায় শরীর, থেকে যায় তার উচ্চারিত করুণা। থেকে যায় তার শেখানো সাহস আর কিছু প্রশ্ন, যাদের উত্তর দিতে দিতে পরবর্তী শতাব্দীগুলো বয়ঃপ্রাপ্ত হয়।”
আমার হাত একটু কেঁপে উঠল।
চিঠির শেষে বিন্দুবাসিনী লিখেছেন–
“আপনি যদি কাল নাও থাকেন, আপনার নারীরা থাকবে। আর যদি কোনোদিন আমার মতো কোনো নারী পৃথিবীর কোনো অন্ধকার ঘরে বসে নিজের ভাষা হারিয়ে ফেলে, তবে সে আপনার বই খুলে নিজের কণ্ঠস্বরটি আবার খুঁজে নেবে।”
আর পড়তে পারছিলাম না। মনে হলো, রবীন্দ্রনাথের সবচেয়ে বড় সৃষ্টি কোনো কবিতা নয়, কোনো উপন্যাসও নয়; হয়তো তিনি একটি আশ্রয় নির্মাণ করেছিলেন, যেখানে অপমানিত মানুষ, প্রত্যাখ্যাত মানুষ, নিঃসঙ্গ মানুষ বিশেষত নারীরা তাদের হারানো ভাষাটুকু ফিরে পেত।
চিঠিগুলি গুছিয়ে রেখে সিন্দুকের ঢাকনা বন্ধ করতে গিয়ে হঠাৎ মনে হলো, এই সিন্দুকে আসলে চিঠি রাখা ছিল না, রাখা ছিল অপেক্ষা। আজ সেই অপেক্ষার একটি অংশ আমার হাতে এসে পৌঁছেছে। মনে হলো চিঠিগুলির একটা উত্তর লেখা প্রয়োজন।
কিছু লেখা শুরু করা বড় কঠিন নয়। কঠিন হলো এমন একটি বাক্য লেখা, যার ভেতরে নিজের সঙ্গে আরও অনেক মানুষের জীবন এসে বসেছে। অনেকক্ষণ পর আমার কলমে এলো–
“ঠাকুরমা,
তোমার সাতাশটি চিঠির পরে এই প্রথম একটি উত্তর লেখা হচ্ছে। উত্তরটি তোমাকে দিচ্ছি না। কারণ তুমি তো উত্তরের প্রতীক্ষায় লেখোনি, লিখেছিলে শুধু নিজেকে, নিজের আত্মাকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য। বরং এই উত্তর রেখে যাচ্ছি সেই মেয়েদের জন্য, যারা এখনও নিজের ভেতরে একটা পরাধীন খাঁচা বহন করে চলে, যারা এখনও নিজের কথাকে অপরাধ ভেবে চেপে রাখে।
তোমাকে বলি ঠাকুরমা, মেয়েদের কথা শোনা হয়েছে, দেরিতে হলেও শোনা হয়েছে। তোমার একলা নীরবতা আজ আর একলা নেই। সে মিশে গেছে অসংখ্য মেয়ের কণ্ঠে, যারা একে একে নিজেদের সিন্দুক খুলছে, নিজেদের ভাষা ফিরে পাচ্ছে।”
বাইরে তখন সকাল পুরোপুরি নেমে এসেছে। গলির মধ্যে মানুষের চলাচল শুরু হয়েছে। কেউ বাজারে যাচ্ছে।
কেউ স্কুলে। কেউ অফিসে। কেউ জানেই না, এই ভাঙা বাড়ির একটি ঘরে আজ একশ বছরেরও বেশি সময় ধরে চলতে থাকা একটি নীরব কথোপকথনের আর একটি অধ্যায় আজ শেষ হলো। অথচ সত্যিই কি শেষ হলো? আমি খাতাটি বন্ধ করে ব্যাগে রাখলাম। সাতাশটি চিঠি সিন্দুকেই রয়ে গেল। সেগুলি আর সঙ্গে নিলাম না। কারণ কিছু উত্তরাধিকার অধিকার করে নেওয়ার জন্য নয়। সংরক্ষণ করার জন্য। দরজায় তালা লাগিয়ে গলির মুখ পর্যন্ত এসে একবারও ফিরে তাকালাম না। যে বাড়ির ভেতর মানুষ নিজের অতীতের সাথে বর্তমানকে খুঁজে পায়, তাকে দ্বিতীয়বার দেখার প্রয়োজন হয় না। সে তখন মানুষের ভেতরেই বাস করতে শুরু করে।
জোড়াসাঁকোর দিক থেকে রবীন্দ্রসংগীত ভেসে আসছে, কোথাও প্রতিকৃতিতে মালা পরানো হচ্ছে। ঠিক সেই সময়, হয়তো ঢাকা, খুলনা কিংবা সিলেটের কোনো ছোট্ট ঘরে, কোনো কিশোরী প্রথমবার খুলে বসেছে পুরোনো একটি বই। সে এখনও জানে না মৃণাল কে, অনিলা, চন্দরা কে। কিংবা জনমদুঃখিনী হৈমন্তী বা রতনের নামও কোনোদিন শোনেনি। এ বঙ্গদেশে নারী জন্মমাত্রই নিপীড়ন, যন্ত্রণার পাশাপাশি সাহস আর প্রতিবাদের চেতনার উত্তরাধিকার বহন করে। একটি প্রদীপ থেকে আর একটি প্রদীপে যেমন আগুন গিয়ে পৌঁছায়, তেমনই এক মানুষের অর্জিত ভাষা ধীরে ধীরে আর এক মানুষের কণ্ঠে জন্ম নেয়। শিখা কিন্তু একই থাকে। শুধু তার আলো নতুন মানুষের মুখ চিনে নেয়।
ফেরার ট্রেনের জানালায় মুখ রেখে ছুটে চলা দৃশ্য দেখতে দেখতে মনে হচ্ছিল ২২ শ্রাবণের সকালকে আজ নতুন করে পেলাম।
সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে আমি আরেকবার নিজের নামে লেখা বিন্দুবাসিনীর চিঠিটা হাতে নিয়ে জানালার পাশে দাঁড়িয়েছি। বাইরে সন্ধ্যার আলো নিভে আসছিল ধীরে। একদিন এক কিশোরীর জীবনের আলো এভাবে নিভে এসেছিল। অথচ তার ভাষা নেভেনি। সেই ভাষাই আজ, এতগুলো দীর্ঘ বছর পেরিয়ে, আমার হাতে অবশেষে নিজের কলম হয়ে উঠল।
- বিষয় :
- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর