ঢাকা বুধবার, ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

আবু জাফর শামসুদ্দীনের দিনলিপিতে সময়ের ভেতর মনীষীর জীবন

আবু জাফর শামসুদ্দীনের দিনলিপিতে সময়ের ভেতর মনীষীর জীবন
×

ছবি: সমকাল

সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ২৫ আগস্ট ২০২৬ | ০৫:২৭

একজন লেখক শুধু তাঁর প্রকাশিত বইয়ে থাকেন না; সময়, সমাজ ও নিজের সঙ্গে তাঁর নীরব কথোপকথনও কখনো কখনো হয়ে ওঠে ইতিহাসের মূল্যবান দলিল। মনীষী আবু জাফর শামসুদ্দীনের ১৯৭৬ থেকে ১৯৮২ সাল পর্যন্ত সময়ের এমনই এক ব্যক্তিগত জগৎ উঠে এসেছে নতুন প্রকাশিত ‘দিনলিপি’তে। তাঁর ৩৮তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে গ্রন্থটির প্রকাশনা ও স্মরণসভায় উঠে এসেছে তাঁর সাহিত্য, রাজনৈতিক চিন্তা এবং সমাজভাবনার নানা দিক।

আবু জাফর শামসুদ্দীন ও আয়েশা আখতার খাতুন মেমোরিয়াল ট্রাস্টের উদ্যোগে গতকাল সোমবার বিকেল ৫টায় রাজধানীর বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র মিলনায়তনে আয়োজনটি অনুষ্ঠিত হয়।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে গবেষক ও মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি মফিদুল হক বলেন, আবু জাফর শামসুদ্দীন ছিলেন একজন ‘পুরোদস্তুর পাবলিক ইন্টেলেকচুয়াল’। রাজনৈতিক বিশ্লেষণ, কলাম ও গবেষণার মধ্য দিয়ে তিনি জনপরিসরে সক্রিয় ছিলেন। কিন্তু এর পাশাপাশি তাঁর ছিল একান্ত নিজস্ব একটি জগৎ। জীবনের বিভিন্ন সময়ে তিনি কবিতা লিখেছেন, যদিও সেগুলো প্রকাশের উদ্দেশ্যে লেখা হয়নি। বরং নিজের অন্তর্গত তাগিদ এবং জীবনের সঙ্গে বোঝাপড়ার প্রয়োজন থেকেই তিনি কবিতা লিখতেন।

অনুষ্ঠানের শুরুতে তাঁর প্রতিকৃতিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করা হয়। বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর শিল্পীদের জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় মূল আয়োজন। পরে শামসুদ্দীনের স্মরণে শোক প্রস্তাব পাঠ ও এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। এরপর প্রদর্শিত হয় জাঁ নেসার ওসমান নির্মিত প্রামাণ্যচিত্র ‘ত্রিকালদর্শী’।

অনুষ্ঠানের অন্যতম প্রধান পর্ব ছিল ‘দিনলিপি (১৯৭৬–১৯৮২)’ গ্রন্থের প্রকাশনা। গ্রন্থটির মোড়ক উন্মোচন করেন মফিদুল হক, আবু জাফর শামসুদ্দীন ও আয়েশা আখতার খাতুন মেমোরিয়াল ট্রাস্টের সভাপতি অধ্যাপক সিকান্দার দারা শামসুদ্দীন এবং সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব রামেন্দু মজুমদার।

আলোচনায় আবু জাফর শামসুদ্দীনের রাজনৈতিক দর্শন নিয়েও কথা বলেন বক্তারা। ‘মনীষী আবু জাফর শামসুদ্দীনের রাজনৈতিক দর্শন’ শীর্ষক প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন আবুল খায়ের। তাঁর ভাষায়, মানুষের প্রতি গভীর ভালোবাসা থেকেই শামসুদ্দীনের চিন্তায় সামাজিক ও রাজনৈতিক মুক্তির আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছিল।

লেখক কামরুল আহসান বলেন, নতুন প্রজন্মের মধ্যে আবু জাফর শামসুদ্দীনকে নিয়ে চর্চা খুবই সীমিত। গুণীজনদের স্মৃতি সংরক্ষণ ও তাঁদের কাজ নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব রাষ্ট্র যথাযথভাবে পালন করছে না। ফলে এ ক্ষেত্রে সমাজকেই দায়িত্ব নিতে হবে।

শামসুদ্দীনের সাহিত্য ও চিন্তার পুনঃপাঠের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরে মফিদুল হক বলেন, বিশ শতকের বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস কিংবা উচ্চতর গবেষণায় আবু জাফর শামসুদ্দীনকে পাশ কাটানোর সুযোগ নেই। সাহিত্য ও মুক্তিসংগ্রামের ইতিহাসে তাঁর অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ। এখন প্রয়োজন তাঁর কাজের চর্চাকে আরও বিস্তৃত করা।

শামসুদ্দীনের স্মৃতি সংরক্ষণ ও অপ্রকাশিত কাজ প্রকাশের উদ্যোগের কথা জানান তাঁর ছেলে এবং ট্রাস্টের সভাপতি অধ্যাপক সিকান্দার দারা শামসুদ্দীন। তিনি বলেন, ২০০৩ সালে তাঁর মা আয়েশা আখতার খাতুনের মৃত্যুর পর ২০০৬ সালে ভাইবোনেরা মিলে ট্রাস্টটি প্রতিষ্ঠা করেন। এরপর থেকে প্রতিষ্ঠানটি বিভিন্ন সামাজিক ও জনকল্যাণমূলক কার্যক্রম পরিচালনা করছে। গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে একুশে ফেব্রুয়ারি উদ্যাপন, পুরস্কার ও মেধাবৃত্তি প্রদান, বিনা মূল্যে স্বাস্থ্যসেবা এবং আর্থিক সহায়তার মতো উদ্যোগও এর মধ্যে রয়েছে।

শুধু সমাজকল্যাণ নয়, শামসুদ্দীনের সাহিত্যকর্ম সংরক্ষণেও ট্রাস্ট কাজ করছে বলে জানান তিনি। তাঁর যেসব বই বর্তমানে মুদ্রণে নেই, সেগুলোসহ প্রকাশিত বইগুলো পিডিএফ সংস্করণে সংরক্ষণ করা হয়েছে। ফলে পাঠকের কাছে তাঁর রচনা সহজে পৌঁছে দেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

‘দিনলিপি’র পরবর্তী খণ্ড প্রকাশের পরিকল্পনাও তুলে ধরেন সিকান্দার দারা শামসুদ্দীন। তিনি জানান, ১৯৭৬–১৯৮২ সময়ের দিনলিপি প্রকাশের পর এবার ১৯৮৩ থেকে ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত, অর্থাৎ তাঁর মৃত্যুর সময় পর্যন্ত দিনলিপি প্রকাশের প্রস্তুতি চলছে। আগামী বছরের মধ্যে এটি প্রকাশের চেষ্টা করা হবে। পাশাপাশি তাঁর বিভিন্ন অপ্রকাশিত রচনা ও চিঠিপত্র সংগ্রহ করে প্রকাশের উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে।
রামেন্দু মজুমদারের দৃষ্টিতে আবু জাফর শামসুদ্দীনের বিশেষত্ব তাঁর সময়কে অতিক্রম করে ভাবতে পারার ক্ষমতায়।

তিনি বলেন, শামসুদ্দীন ছিলেন ‘আগামী দিনের মানুষ’। তাঁর সময়ের তুলনায় অনেক দূর এগিয়ে থাকা যে চিন্তাভাবনা তিনি করেছিলেন, সেগুলোর অনেকটাই আজও প্রাসঙ্গিক।

স্মরণসভাটিতে কথার পাশাপাশি ছিল সংগীতও। সাংস্কৃতিক পর্বে ছায়ানটের শিক্ষক জান্নাতুল ফেরদৌস লাকী পরিবেশন করেন নজরুলগীতি ‘অঞ্জলি লহ মোর সঙ্গীতে’। পরে শামসুদ্দীনের নাতনি অদ্বিতীয়া শামসুদ্দীন ও অনন্যা শীলা শামসুদ্দীন পরিবেশন করেন ‘ওগো দখিন হাওয়া, ও পথিক হাওয়া’ এবং ‘আগুনের পরশমণি ছোঁয়াও প্রাণে’।

আরও পড়ুন

×