ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

সাক্ষাৎকার

অনেকখানি পিছিয়ে গেছে সাংস্কৃতিক অঙ্গন

অন্তর্বর্তী সরকারের ১ বছর

অনেকখানি পিছিয়ে গেছে  সাংস্কৃতিক অঙ্গন
×

আজাদ আবুল কালাম

আজাদ আবুল কালাম

প্রকাশ: ১৬ আগস্ট ২০২৫ | ০১:২২ | আপডেট: ১৬ আগস্ট ২০২৫ | ০৯:১০

সরকারের এক বছরপূর্তি উপলক্ষে সমকাল কথা বলেছে থিয়েটার আর্টিস্টস অ্যাসোসিয়েশন অব ঢাকার প্রেসিডেন্ট ও অভিনেতা আজাদ আবুল কালামের সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন এমদাদুল হক মিলটন

সমকাল : অন্তর্বর্তী সরকারের এক বছর হয়েছে। এই সময়ে সাংস্কৃতিক অঙ্গন কেমন ছিল?

আজাদ আবুল কালাম : গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে দেশের বিরাট এক পরিবর্তন হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারকে জনগণ ক্ষমতায় বসিয়েছে। এই সময়ে নানা ধরনের বিশৃঙ্খলা চলছে। টেলিভিশন মাধ্যমে কাজ কমে গেছে। কলাকুশলীদেরও দুর্দিন যাচ্ছে। বিশেষ করে শিল্পকলা একাডেমির অবস্থা একেবারেই ভঙ্গুর ছিল। একাডেমিতে সেনাবাহিনীর একটি অস্থায়ী ক্যাম্প হয়েছে। প্রথম দিকে এখানে কেউ ঢুকতেই পারত না। এরপর ধীরে ধীরে নাটকের শো ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড শুরু হয়েছে। অনেক শিল্পকলা একাডেমি এখনও সেনাক্যাম্পের মতো আছে। অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসার পর শিল্পকলায় একজন মহাপরিচালক এলেন। কিছুদিন দায়িত্ব পালনের পর চলে গেলেন। এক বছরে ঢাকায় অনেক টালমাটাল পরিস্থিতি হয়েছে। সরকারের অনেক ইস্যুর মধ্যে সংস্কৃতি অগ্রাধিকার তালিকায় নেই। জুলাই গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সংস্কৃতি অঙ্গন অনেকখানি পিছিয়ে গেছে। এখন পেছন থেকে সামনের দিকে যাওয়া একটি বড় চ্যালেঞ্জ। তবে অভ্যুত্থান নিয়ে সরকার কিছু কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। বিভিন্ন জায়গায় তথ্যচিত্র প্রদর্শনী, থিয়েটার ফেস্টিভ্যালের মতো ভালো কিছু উদ্যোগ নিয়েছে।  

সমকাল: অনেক সংস্কৃতিকর্মী মনে করছেন শিল্পচর্চার ক্ষেত্রে এখন ভয়হীন পরিবেশ নেই। 

আজাদ আবুল কালাম: এটি আমিও মনে করি। শিল্পচর্চার জায়গায় ভয়হীন পরিবেশ যদি না থাকে তাহলে চর্চা কীভাবে হবে? অনেক সংস্কৃতিকর্মীকে ফ্যাসিবাদের দোসর বলে আখ্যা দেওয়া হয়েছে। এতে মূল ধারা থেকে তারা ছিটকে গেছেন। এ কারণে সংস্কৃতি অঙ্গনে এক ধরনের শূন্যতা তৈরি হয়েছে। কে দোসর আর কে দোসর নয়– এটা বড় বিষয় নয়। তারা তো শিল্পী, সৃজনশীল মানুষ। সে মানুষগুলো ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে যাচ্ছে। এর প্রভাব পড়েছে সর্বত্র। জুলাই অভ্যুত্থানে ফ্যাসিবাদ নিপাত হয়েছে। কিন্তু উগ্র ডানপন্থি রাজনীতি মাথাচাড়া 
দিয়ে উঠছে। এর পেছনে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রশ্রয় আছে। যখন কোনো ডানপন্থি রাজনীতি তুঙ্গে উঠে যায় তখন সংস্কৃতিকর্মীরা উৎকণ্ঠিত হয়। এই সময়ে বাউলদের ওপর অত্যাচার হয়েছে। তাদের আখড়া ভেঙে দেওয়া হয়েছে। উগ্র ডানপন্থি রাজনীতির উত্থান আমাদের সংস্কৃতি চর্চাকে বাধাগ্রস্ত করেছে।

সমকাল: বাজেটে সংস্কৃতি খাতের বরাদ্দ নিয়ে সন্তুষ্ট ছিলেন না সংস্কৃতিকর্মীরা। 

আজাদ আবুল কালাম: গত বাজেটের আগে  থিয়েটার আর্টিস্টস অ্যাসোসিয়েশন অব ঢাকার পক্ষ (টিএএডি) থেকে আমরা একটি লিখিত প্রস্তাবনা সরকারকে দিয়ে চেয়েছিলাম। তিন-চারবার চেষ্টা করেও সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের সচিবের সঙ্গে দেখাই করতে পারিনি। চিঠিটি পরে ডাকে পাঠিয়েছিলাম। এটি তারা পেয়েছেন কিনা, তার জবাবও পাইনি।  তার মানে, সচিব আমাদের সঙ্গে কথা বলার প্রয়োজনই মনে করেননি। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় যদি প্রয়োজন না মনে করে, তবে এটিই সরকারের প্রতিচ্ছবি। সংস্কৃতি খাতের জন্য আমরা বাজেটে ১ শতাংশ বরাদ্দ চেয়েছিলাম। সেটা পাইনি। কোনো সরকারই সংস্কৃতি অঙ্গনকে মূল্যায়ন করেনি। এই অন্তর্বর্তী সরকারও একই পথে হাঁটছে। 

সমকাল: একটু পেছেন ফিরতে চাই। কখন জুলাই আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েছিলেন?

আজাদ আবুল কালাম: গত বছর ১৯ জুলাই থেকে থিয়েটার কর্মীদের সঙ্গে আমিও রাস্তায় নেমেছিলাম। সবাই বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিল। রাস্তায় নেমে আমরা মানুষ হত্যার বিচার চেয়েছি। একটি বৈষম্যবিরোধী সমাজের স্বপ্ন দেখেছি।

৩ আগস্ট সংস্কৃতিকর্মীরা কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ছিলেন। সেখানে গিয়ে দেখলাম কোটাবিরোধী আন্দোলন এক দফা দাবিতে চলে গেছে। প্রবহমান আন্দোলনের সঙ্গে সংস্কৃতিকর্মীরা সংশ্লিষ্ট হয়ে গেল। সংস্কৃতিকর্মীরা নানা ইস্যুতে রাস্তায় থাকে সব সময়।

সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট, বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশানের নেতারা রাস্তায় থেকেছেন বছরের পর বছর। পরে সংগঠনগুলো দলীয় লোজুড়বৃত্তির জায়গায় চলে যাওয়ায় বড় সংগঠনগুলো আমাদের আর আশ্রয় ছিল না। আমরা বিক্ষুব্ধ থিয়েটার কর্মী, সাধারণ নাট্যকর্মী– নানা ব্যানারে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে যুক্ত ছিলাম।

সমকাল: এই সময়কে কীভাবে দেখছেন?

আজাদ আবুল কালাম: সংস্কৃতি অঙ্গন এখন কঠিন সময় পার করছে। তবে এই জটিল অবস্থার মধ্যেও আমরা কাজ করে যাচ্ছি। থিয়েটার যাতে চলমান থাকে, সে লক্ষ্যে আমরা কাজ করছি। নতুন নতুন চিন্তা-চেতনার প্রয়োগ আমরা যাতে করতে পারি, সে লক্ষ্যেই এগিয়ে যাচ্ছি। সামাজিকভাবে যে  সাংস্কৃতিক সংশ্লিষ্টতার দরকার ছিল, তা সেই অর্থে হয়ে ওঠেনি। বিশেষ করে মধ্যবিত্তের সংস্কৃতি চর্চা একটি গণ্ডিবদ্ধ জায়গায় রয়েছে। এটি পুরো সমাজকে অঙ্গীভূত করতে পারেনি। এটা আমাদের ব্যর্থতা।

সমাজচিন্তা ও রাজনীতি যারা করেন, তাদের দিক থেকে কোনো ভিশন না থাকা এবং সংস্কৃতিকর্মীদের নানা সীমাবদ্ধতার  কারণে সাংস্কৃতিক অঙ্গন সংকটাপন্ন সব সময়ই। দেশের চেহারা সংস্কৃতি নির্ধারণ করে দেয়। আমার দেশের চেহারা যদি সবাইকে দেখাতে চাই, তাহলে সাংস্কৃতিক অঙ্গনকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য রাষ্ট্রীয়, সামাজিক  কিংবা করপোরেট পৃষ্ঠপোষকতা দরকার। যদি তা না পাওয়া যায়, তাহলে ভবিষ্যৎ অন্ধকার।

সমকাল: আগামীর বাংলাদেশ কেমন দেখেত চান?

আজাদ আবুল কালাম: এ প্রশ্নটি অনেকেই এখন করেন। এর উত্তরে বলতে চাই, জুলাই আন্দোলনের সময় দেয়ালে দেয়ালে ছাত্র-জনতা লিখে লিখে তাদের আকাঙ্ক্ষার কথা প্রকাশ করেছে। এই আকাঙ্ক্ষার বাইরে সংস্কৃতিকর্মীরা কেউ নন। আমরা অবশ্যই একটি বৈষম্যহীন সমাজ চাই। আইনসংগত, ন্যায়বিচার চাই। এটি সংস্কৃতিকর্মীদেরই দাবি নয়, অনেকের দাবি।

আরও পড়ুন

×