সাক্ষাৎকার : তারেক রেফাত উল্লাহ খান
ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা সবার আগে ব্যাংকের টাকা ফেরত দেন
তারেক রেফাত উল্লাহ খান
আনোয়ার ইব্রাহীম
প্রকাশ: ০৫ জুলাই ২০২৬ | ০৭:৫৬
প্রতিষ্ঠার ২৫ বছর পূর্তি উদ্যাপন করছে বেসরকারি খাতের শীর্ষস্থানীয় আর্থিক প্রতিষ্ঠান ব্র্যাক ব্যাংক। এ উপলক্ষে ব্র্যাক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা তারেক রেফাত উল্লাহ খান সম্প্রতি সমকালকে একটি সাক্ষাৎকার দিয়েছেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আনোয়ার ইব্রাহীম
সমকাল: ব্র্যাক ব্যাংক ২৫ বছর পূর্ণ করেছে। দীর্ঘ যাত্রার পেছনে মূল লক্ষ্য বা প্রেরণা কী ছিল?
তারেক রেফাত উল্লাহ খান: আমাদের ব্যাংকটি অন্য আট-দশটি ব্যাংকের মতো নয়। প্রতিষ্ঠাতা স্যার ফজলে হাসান আবেদ যখন ব্যাংকটি চালু করেন, তখন তাঁর মূল লক্ষ্য ছিল দেশের ক্ষুদ্র ও মাঝারি খাতের উদ্যোক্তাদের আর্থিক সেবার আওতায় আনা। তিনি দেখেছিলেন, প্রান্তিক পর্যায়ের ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা ব্যাংক থেকে ঋণ পেতেন না। সেই অভাব পূরণ করতেই ব্র্যাক ব্যাংকের জন্ম। ২৫ বছর পর আমরা গর্ব করে বলতে পারি, আমরা দেশের অন্যতম বিশ্বস্ত একটি ব্যাংক হতে পেরেছি।
সমকাল: শুরুতে তো চ্যালেঞ্জ অনেক ছিল। কীভাবে সেই প্রতিকূলতা মোকাবিলা করেছে ব্র্যাক ব্যাংক?
তারেক রেফাত উল্লাহ খান: শুরু সবার জন্য বেশ কঠিন হয়। আমাদের কোনো অবকাঠামো ছিল না, লোকবল তৈরি করতে হয়েছে। এমনকি শুরুর দিকে আমরা এসএমই ব্যবসায় আশানুরূপ ফল পাচ্ছিলাম না। তবে হাল ছাড়িনি। আজ আমরা দেশের এক নম্বর এসএমই ব্যাংক। গত ২৫ বছরে আমরা ২০ লাখের বেশি ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা তৈরি করেছি, যা দেশে প্রায় এক কোটিরও বেশি কর্মসংস্থান তৈরিতে সরাসরি ভূমিকা রেখেছে। শুধু তাই নয়, আজ যেকোনো বিবেচনায় দেশের সেরা বাণিজ্যিক ব্যাংকের কথা উঠলে ব্র্যাক ব্যাংকের নামটি তালিকার ওপরে থাকে।
সমকাল: এসএমই খাত সহজে ঋণ পায় না বলে একটা কথা প্রচলিত রয়েছে। ব্র্যাক ব্যাংক কীভাবে এসএমই-কে ফোকাস রেখে সফল হচ্ছে?
তারেক রেফাত উল্লাহ খান: দেখুন, এসএমই ব্যাংকিং অন্য আট-দশটি ব্যবসার মতো নয়। এটি করতে হলে উদ্যোক্তাদের খুব কাছে থাকতে হয়। আমরা আমাদের নেটওয়ার্ক সারাদেশে ছড়িয়ে দিয়েছি। আমাদের প্রায় ১৩ হাজার কর্মীর প্রায় অর্ধেক শুধু এসএমই খাতে নিয়োজিত। তারা কেবল ঋণ দেন না, বরং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের হিসাব রাখা এবং ব্যবসাকে ব্যাংকিং উপযোগী করতে পরামর্শ দিয়ে সাহায্য করেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের রিফাইন্যান্সিং ফান্ডের একটি বড় অংশ আমাদের মাধ্যমেই বিতরণ হচ্ছে। অনেকে মনে করেন এসএমই ঝুঁকিপূর্ণ। কিন্তু আমাদের অভিজ্ঞতা বলছে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা অনেক সৎ এবং তারা ব্যাংকের টাকা সবার আগে ফেরত দিতে চান। এই কারণেই এসএমই-তে খেলাপি ঋণ অনেক কম।
সমকাল: এসএমই ছাড়া অন্য সেগমেন্টে আপনাদের অগ্রগতির চিত্রটি কেমন?
তারেক রেফাত উল্লাহ খান: আমরা শুধু এসএমই-তে সীমাবদ্ধ থাকিনি। আমাদের রিটেইল পোর্টফোলিও এখন সাড়ে ৫২ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে, যেখানে ২২ লাখ গ্রাহক সেবা নিচ্ছেন। করপোরেট ও হোলসেল ব্যাংকিংয়েও আমরা এখন ‘মোস্ট প্রেফারড পার্টনার’। আমাদের ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ‘আস্থা’ অ্যাপের মাধ্যমে প্রতি মাসে প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকা এবং ‘কর্পনেট’-এর মাধ্যমে ২৩ হাজার কোটি টাকা লেনদেন হচ্ছে। এছাড়া আমাদের সাবসিডিয়ারি ‘বিকাশ’ দেশের ৮ কোটি মানুষকে সেবা দিচ্ছে।
সমকাল: ঋণের গুণগত মান বজায় রাখতে আপনারা ঝুঁকির বিষয়টিকে কীভাবে দেখেন?
তারেক রেফাত উল্লাহ খান: আমাদের সাফল্যের একটি বড় বিষয় হলো ঋণ পোর্টফোলিও বৈচিত্র্য। আমাদের ঋণের ৪৫ শতাংশ এসএমই, ৩৫ শতাংশ করপোরেট এবং ১৫ শতাংশ রিটেইল খাতে বিস্তৃত। এই ভারসাম্যের কারণে আমাদের ঝুঁকি অনেক কম। বিশেষ করে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা অনেক ভালো গ্রাহক। তাদের একটাই লক্ষ্য থাকে, ব্যাংকের টাকা ফেরত দেওয়া। যার ফলে আমাদের খেলাপি ঋণের পরিমাণ মাত্র ২ দশমিক ২৭ শতাংশ, যা পুরো ব্যাংকিং খাতে এক বিরল দৃষ্টান্ত।
সমকাল: আমানতকারীদের কাছে এখন ব্র্যাক ব্যাংক নিরাপদ ব্যাংক হিসেবে পরিচিত। সাধারণ মানুষ কেন আপনাদের ওপর ভরসা করছে?
তারেক রেফাত উল্লাহ খান: আমানতকারীদের সবচেয়ে বড় চাওয়া হলো ‘আস্থা’। আমানত রাখার পর যেকোনো সময় তা ফেরত পাওয়ার নিশ্চয়তা। এক্ষেত্রে ব্র্যাক ব্যাংক কখনোই আপস করে না। ব্যাংকের ৪৬ শতাংশ মালিকানা ব্র্যাকের হাতে। ব্র্যাক লভ্যাংশ বাবদ পাওয়া অর্থ আবার দেশের মানুষের উন্নয়নেই ব্যয় করে। আমাদের পরিচালনা পর্ষদ অত্যন্ত পেশাদার এবং সেখানে ৯৯ শতাংশ স্বাধীন পরিচালক। এছাড়া আমাদের তারল্য পরিস্থিতি অত্যন্ত মজবুত। অগ্রিম-ঋণ অনুপাত মাত্র ৬৩ শতাংশ। এর মানে হলো, গ্রাহক চাইলে আমরা যেকোনো সময় তাঁর আমানত ফেরত দিতে সক্ষম।
সমকাল: ডিজিটাল নিরাপত্তা এবং সাইবার ঝুঁকি এখন বড় ইস্যু। ব্র্যাক ব্যাংক ডিজিটাল ব্যাংকিং-এ অনেক এগিয়ে। এক্ষেত্রে ঝুঁকি মোকাবিলায় কী করছেন?
তারেক রেফাত উল্লাহ খান: ব্র্যাক ডিজিটাল নিরাপত্তার ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়। আমাদের সবক্ষেত্রে মাল্টি-ফ্যাক্টর অথেনটিকেশন এবং ডেটা এনক্রিপশন ব্যবস্থা রয়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও মেশিন লার্নিং ব্যবহার করে নিয়মিত মনিটর করি, যাতে যেকোনো অস্বাভাবিক লেনদেন দ্রুত শনাক্ত করা যায়। আমাদের নিজস্ব সাইবার ইনসিডেন্ট রেসপন্স টিমও রয়েছে; যারা যেকোনো সাইবার হুমকি মোকাবিলায় প্রস্তুত।
সমকাল: ব্র্যাক ব্যাংকের আর্থিক সূচকগুলোর বিষয়ে হালনাগাদ তথ্য জানতে চাই।
তারেক রেফাত উল্লাহ খান: আমাদের বাজার মূলধন ১ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। ২০২৫ সালে আমরা সরকারি-বেসরকারি ব্যাংকের মধ্যে সর্বোচ্চ কর-পরবর্তী ২ হাজার ২৫১ কোটি টাকা নিট মুনাফা অর্জন করেছি। আমাদের রিটার্ন অন ইকুইটি ২০ দশমিক ০৬ শতাংশ এবং শেয়ারপ্রতি আয় ৯ টাকা ১২ পয়সা। এছাড়া আমরাই বাংলাদেশের একমাত্র ব্যাংক যারা ‘এসঅ্যান্ডপি’ এবং ‘মুডিস’ থেকে আন্তর্জাতিক ক্রেডিট রেটিং পেয়েছি। ফলে শুধু দেশীয় বিনিয়োগকারী নয়, দেশের শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত যেসব কোম্পানিতে সর্বাধিক বিদেশি বিনিয়োগ রয়েছে, ব্র্যাক ব্যাংক তাদের অন্যতম।
সমকাল: ব্র্যাক ব্যাংকের সামাজিক অবদান সম্পর্কে জানতে চাই।
তারেক রেফাত উল্লাহ খান: আমরা শুধু ব্যাংকিং করি না, দেশের প্রতি আমাদের দায়বদ্ধতা আছে। গত এক বছরে আমরা সরকারকে ২ হাজার ৩৯৪ কোটি টাকা রাজস্ব দিয়েছি। এছাড়া সিএসআর কার্যক্রমের মাধ্যমে নারীশিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং শীতবস্ত্র বিতরণে ২৪ কোটি ৭০ লাখ টাকা ব্যয় করেছি। আমরা ১০০ জন নারী উদ্যোক্তাকে নিয়ে এআই স্কিল ডেভেলপমেন্ট ওয়ার্কশপও আয়োজন করেছি। আগেই বলেছি, অলাভজনক প্রতিষ্ঠান ব্র্যাক এই ব্যাংকের ৪৬ শতাংশ মালিকানায় আছে। লভ্যাংশ থেকে পাওয়া অর্থ মানুষের জীবনমান উন্নয়নে ব্যয় করে।
সমকাল: ব্যাংকিং খাতের বর্তমান অস্থির পরিস্থিতিতে সাধারণ গ্রাহকদের প্রতি আপনার পরামর্শ কী?
তারেক রেফাত উল্লাহ খান: আমি বলবো ঘাবড়ানোর কিছু নেই। টাকা বাসায় না রেখে ব্যাংকে রাখা বেশি নিরাপদ । কারণ এটি দেশের অর্থনীতিতে ভূমিকা রাখে। তবে টাকা রাখার আগে ব্যাংকের কিছু সূচক দেখে নেওয়া ভালো। যেমন–ব্যাংকের মূলধন পর্যাপ্ততার হার কত, মুনাফা হচ্ছে কিনা, বা ঋণ-আমানত অনুপাত কেমন ইত্যাদি। ভালো ব্যাংকগুলো সবসময়ই গ্রাহকের আমানত সুরক্ষা করবে।
সমকাল: ২৫ বছর পূর্তির প্রেক্ষাপটে আরও ২৫ বছর পর ব্র্যাক ব্যাংককে কোথায় দেখতে চান?
তারেক রেফাত উল্লাহ খান: আমাদের লক্ষ্য হলো বাংলাদেশের ‘মোস্ট ইমপ্যাক্টফুল ব্যাংক’ হওয়া। শুধু মুনাফা নয়, সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে বড় প্রভাব ফেলতে চাই। ভবিষ্যতে আমরা আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে দেশীয় মালিকানাধীন প্রথম ‘মাল্টিন্যাশনাল ব্যাংক’ হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করার স্বপ্ন দেখি। আমরা চাই এমন একটি ব্যাংক হতে; যা
দেশের প্রতিটি মানুষের জীবনে আর্থিক স্বাধীনতা নিয়ে আসবে।
সমকাল: ব্র্যাক ব্যাংকের এ স্বপ্ন পূরণ হোক। আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।
তারেক রেফাত উল্লাহ খান: সমকালকেও ধন্যবাদ।
- বিষয় :
- সাক্ষাৎকার
