লালন সাঁইয়ের তিরোধান
জীবনভর মানুষের গান গেয়েছেন যিনি
লালন সাঁই
দ্রোহী তারা
প্রকাশ: ১৭ অক্টোবর ২০২৫ | ০৮:০৮ | আপডেট: ১৭ অক্টোবর ২০২৫ | ০৯:১১
| প্রিন্ট সংস্করণ
আজ পহেলা কার্তিক। লালন সাঁইয়ের ১৩৬তম তিরোধান দিবস। আজ সারাদেশে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হবে বাংলার মাটিসংলগ্ন এ মহান দার্শনিককে, যিনি গেয়ে গেছেন মানবতার গান; তাঁর সুরে অনুরণন ঘটেছে গভীর জীবনচিন্তার। তাঁর গানের কেন্দ্রে ছিল মানুষ। সেখানে ছিল না বিভেদের পর্দা– ধর্ম, বর্ণ বা গোত্রের পরিচয়। তিনি বারবার বলেছেন, ‘মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি।’ মূলত তিনি সত্যিকারের মানুষের অন্বেষায় ছিলেন।
লালন ফকিরের জন্মস্থান, দিনক্ষণ নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। কেউ বলেন তিনি ঝিনাইদহের হারিশপুরে, কেউ বলেন কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়ায় জন্ম নিয়েছেন। তবে ছেঁউড়িয়া গ্রাম তাঁর সাধনার পীঠস্থান। অক্ষরজ্ঞানহীন হলেও অন্তর্দৃষ্টি, অভিজ্ঞতা ও আত্মজ্ঞানই তাঁকে বানিয়েছে স্বশিক্ষিত। সত্য সন্ধানে গানে গানে তিনি সৃষ্টি করেন স্বতন্ত্র দর্শন, যা ‘লালনতত্ত্ব’ নামে পরিচিত।
লালনের গানের কথা সহজ, রূপক ও ছন্দে গঠিত। কিন্তু এগুলোতে প্রতিফলন ঘটে গভীর ভাবনার। দর্শনের দিক থেকে এসব গান অসাধারণ। তাঁর রচনার মূল বিষয়– মানবজন্মের তাৎপর্য, আত্মজ্ঞান, ধর্মীয় সংকীর্ণতার প্রতিবাদ ও শোষণ-বঞ্চনার বিরুদ্ধে অসহায় মানুষের আকুতি। এগুলো একদিকে যেমন অন্তর্মুখী যাত্রার প্রেরণা, অন্যদিকে এটি সামাজিক জাগরণের ভাষাও।
লোকসাহিত্য বিশারদ আবুল আহসান চৌধুরী বলেন, ‘লালনের গানের ভেতরে একটা বাণী আছে, শিক্ষা আছে। তিনি শুধু সাধনার গান লিখে যাননি। তিনি জাতপাত, সাম্প্রদায়িকতা, বর্ণভেদের বিরুদ্ধে তাঁর গানের ভেতর দিয়ে প্রতিবাদ জানিয়েছেন। এ জন্য লালনের এ ঐতিহাসিক অবদান বাঙালি জীবনে খুব গুরুত্বপূর্ণ একটা দিক বলে আমি মনে করি। তাই লালনকে আমি আমার মত করে বলি যে, লালন ছিলেন একই সঙ্গে মরমি ও দ্রোহী।’ লালনের গান ও দর্শন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, জীবনানন্দ দাশসহ অনেক কবি ও গীতিকারকে প্রভাবিত করেছে।
লালনের মৃত্যু ১৮৯০ সালের ১৭ অক্টোবর (১ কার্তিক)। কিংবদন্তি অনুসারে, গান গাইতে গাইতে তাঁর প্রয়াণ হয়। একতারার তার ছিঁড়ে যায় ঠিক সেই মুহূর্তে। এ উপাখ্যান যতই ঐতিহাসিকভাবে অনিশ্চিত হোক, তা এক প্রতীকী আবেগের জন্ম দিয়েছে। এক সাধকের গান দিয়েই শুরু, গান দিয়েই শেষ।
প্রথমবারের মতো জাতীয়ভাবে স্মরণোৎসব
প্রতিবছর ছেঁউড়িয়ায় তাঁর আখড়াবাড়িতে আয়োজিত হয় লালন স্মরণোৎসব। এ উৎসবে দেশের নানা প্রান্ত থেকে সাধক, বাউল, গবেষক ও সাধারণ ভক্তরা মিলিত হন। গান, আলোচনা ও ভক্তিমূলক পরিবেশনায় স্মরণ করা হয় লালনকে। তারই ধারাবাহিকতায় আজ থেকে প্রথমবারের মতো জাতীয়ভাবে লালন উৎসব পালন করা হচ্ছে। কুষ্টিয়ায় চলবে ১৯ অক্টোবর পর্যন্ত।
কুষ্টিয়া ও কুমারখালী প্রতিনিধি জানান, এক দিন আগে বৃহস্পতিবার থেকে লালনভক্ত, অনুরাগী আর দর্শনার্থীরা ভিড় করতে থাকেন। কুমারখালীর আখড়াবাড়িতে পা ফেলার জায়গা নেই।
আজ বিকেল ৪টায় ছেঁউড়িয়ার লালন ধামে উদ্বোধন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী। আলোচনায় অংশ নেবেন লেখক ও গবেষক অধ্যাপক গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাক। বক্তৃতা করবেন কবি, লেখক ও চিন্তক ফরহাদ মজহার।
কঠোর নিরাপত্তা
অনুষ্ঠান ঘিরে তিন স্তরের নিরাপত্তাবলয় তৈরি করা হয়েছে। বাড়ানো হয়েছে র্যাব-পুলিশের সংখ্যাও। জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপার বলেন, অনুষ্ঠান সুন্দরভাবে শেষ করতে যাবতীয় উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সব রাজনৈতিক দল ও মতের লোকদের সহযোগিতা নেওয়া হয়েছে।
- বিষয় :
- লালন সাঁই
